ঈদুল আজহার নামাজের নিয়ম ও নিয়ত

ঈদুল আজহার নামাজের নিয়ম ও নিয়ত
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Showanur Rahman

ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের জন্য বছরে দুটি বড় ধর্মীয় উৎসব রয়েছে। এর মধ্যে দ্বিতীয়টি হলো ঈদুল আজহা। এই ঈদকে অনেক সময় কোরবানির ঈদ বা ঈদুজ্জোহা বলেও উল্লেখ করা হয়। ঈদুল আজহা মূলত একটি আরবি শব্দগুচ্ছ, যার অর্থ ‘ত্যাগের উৎসব’। মুসলিম সমাজে এই দিনটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি দেওয়া এবং বিশেষ ইবাদতের মাধ্যমে উদযাপন করা হয়।

ঈদের দিন সকালে মুসলমানরা ফজরের নামাজ আদায়ের পর ঈদগাহ বা খোলা মাঠে সমবেত হয়ে দুই রাকাত ঈদের নামাজ আদায় করেন। এরপর খুতবা শোনা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোরবানি দেওয়া এই দিনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,
‘অতএব তোমার রবের উদ্দেশেই নামাজ পড়ো এবং নহর করো।’ (সুরা আল কাউছার, আয়াত: ২)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নামাজ আদায় করা এবং কোরবানি দেওয়া ঈদুল আজহার অন্যতম প্রধান শিক্ষা।

ঈদের নামাজের বৈশিষ্ট্য

ঈদের নামাজ সাধারণ নামাজের মতো নয়। এটি একটি বিশেষ পদ্ধতিতে আদায় করা হয় এবং ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী ঈদের নামাজ আদায় করা ওয়াজিব।

ঈদের নামাজ খোলা মাঠ বা ছাদবিহীন স্থানে আদায় করা সুন্নত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাধারণত খোলা জায়গায় ঈদের নামাজ আদায় করতেন। তবে যদি খোলা জায়গার ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে মসজিদেও ঈদের নামাজ পড়া যেতে পারে।

বছরে মাত্র দুইবার এই নামাজ আদায় করা হয় বলে অনেক সময় মুসল্লিরা এর নিয়ম ভুলে যান। তাই ঈদের নামাজের পদ্ধতি জানা গুরুত্বপূর্ণ।

ঈদের নামাজের নিয়ত

নিয়ত আরবি ভাষায় পড়া যায়। নিয়তটি হলো-

نَوَيْتُ أنْ أصَلِّي للهِ تَعَالىَ رَكْعَتَيْنِ صَلَاةِ الْعِيْدِ الْفِطْرِ مَعَ سِتِّ التَكْبِيْرَاتِ وَاجِبُ اللهِ تَعَالَى اِقْتَضَيْتُ بِهَذَا الْاِمَامِ مُتَوَجِّهًا اِلَى جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِيْفَةِ اللهُ اَكْبَرْ

বাংলা উচ্চারণ:
নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহি তাআলা রাকাআতাইন সালাতিল ইদিল ফিতরি মাআ সিত্তাতিত তাকবিরাতি ওয়াঝিবুল্লাহি তাআলা ইকতাদাইতু বিহাজাল ইমামি মুতাওয়াঝঝিহান ইলা ঝিহাতিল কাবাতিশ শারিফাতি আল্লাহু আকবার।

অর্থ:
আমি ঈদুল ফিতরের দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ অতিরিক্ত ৬ তাকবিরের সঙ্গে এই ইমামের পেছনে কেবলামুখী হয়ে আল্লাহর জন্য আদায় করছি-‘আল্লাহু আকবার’।

ঈদের নামাজ পড়ার নিয়ম

ঈদের নামাজ ইমামের সঙ্গে জামাতে আদায় করা হয়।

প্রথমে ইমামের সঙ্গে তাকবিরে তাহরিমা বলে উভয় হাত বেঁধে নামাজ শুরু করতে হয়। এরপর ছানা পড়া হয়-

‘সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা ওয়া তাবারাকাসমুকা ওয়াতাআলা জাদ্দুকা ওয়া লা ইলাহা গাইরুকা।’

ছানা পড়ার পর অতিরিক্ত তিনটি তাকবির দেওয়া হয়। প্রতিটি তাকবিরের মধ্যে তিন তাসবিহ পরিমাণ সময় বিরতি রাখা হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় তাকবিরে হাত উঠিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং তৃতীয় তাকবিরে হাত বেঁধে নেওয়া হয়।

এরপর আউজুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ পড়ে সুরা ফাতিহা এবং অন্য একটি সুরা পাঠ করা হয়। এরপর স্বাভাবিক নিয়মে রুকু ও সিজদা আদায়ের মাধ্যমে প্রথম রাকাত সম্পন্ন করা হয়।

দ্বিতীয় রাকাতে আবার বিসমিল্লাহ পড়ে সুরা ফাতিহা এবং অন্য একটি সুরা পড়া হয়। এরপর আবার তিনটি অতিরিক্ত তাকবির দেওয়া হয়। প্রথম দুই তাকবিরে হাত উঠিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং তৃতীয় তাকবিরের পর রুকুতে যাওয়া হয়।

এরপর রুকু ও সিজদা সম্পন্ন করে বৈঠকে বসা হয়। তাশাহহুদ, দরুদ শরিফ ও দোয়া মাসুরা পাঠ করার পর সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করা হয়।

ঈদের তাকবির

ঈদের দিন বিশেষ একটি তাকবির পড়া হয়। তা হলো-

اَللهُ اَكْبَر اَللهُ اَكْبَر لَا اِلَهَ اِلَّا اللهُ وَاللهُ اَكْبَر اَللهُ اَكْبَروَلِلهِ الْحَمْد

বাংলা উচ্চারণ:
আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবর ওয়া লিল্লাহিল হামদ।

ঈদের নামাজের পর খুতবা

ঈদের নামাজ শেষ হওয়ার পর ইমাম দুটি খুতবা দেন। মুসল্লিদের উচিত মনোযোগ দিয়ে সেই খুতবা শোনা। খুতবার মাধ্যমে ঈদের শিক্ষা, ইসলামের বিভিন্ন বিষয় এবং মুসলমানদের করণীয় সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়।

ঈদের দিনের সুন্নত ও মোস্তাহাব আমল

ঈদের দিন কিছু সুন্নত ও মোস্তাহাব আমল রয়েছে, যেগুলো পালন করা উত্তম।

১. মিসওয়াক করা সুন্নত।
২. গোসল করা সুন্নত।
৩. সুগন্ধি ব্যবহার করা সুন্নত।
৪. ঈদুল আজহায় কিছু না খেয়ে এবং ঈদুল ফিতরে কিছু খেয়ে ঈদগাহে যাওয়া সুন্নত।
৫. ঈদগাহে হেঁটে যাওয়া উত্তম এবং এক রাস্তা দিয়ে গিয়ে অন্য রাস্তা দিয়ে ফিরে আসা মোস্তাহাব।
৬. ঈদগাহে যাওয়ার পথে নিচুস্বরে তাকবির পড়া সুন্নত।
৭. সাধ্যমতো সুন্দর পোশাক পরিধান করা মোস্তাহাব।
৮. ঈদুল ফিতরের ক্ষেত্রে ঈদের নামাজের আগে সদকায়ে ফিতর আদায় করা সুন্নত।
৯. ঈদের দিনে মুখে হাসি রাখা এবং সবার সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করা মোস্তাহাব।
১০. পরস্পরের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করা উত্তম।

(ফতোয়ায়ে শামি : ১/৫৫৬, ৫৫৭, ৫৫৮, হেদায়া: ২/৭১, বুখারি: ১/১৩০, ইবনে মাজাহ: ৯২)

কোলাকুলি সম্পর্কে নির্দেশনা

পরিচিত কারো সঙ্গে দীর্ঘদিন পর দেখা হলে ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে একবার কোলাকুলি করা যেতে পারে এবং বলা যায়-

‘আল্লাহুম্মা জিদ মহাব্বাতি লিল্লাহি ওয়া রাসুলিহ’

তবে ঈদের দিন কোলাকুলিকে বাধ্যতামূলক বা বিশেষ আমল মনে করা ঠিক নয়। তা করলে বিদআত হয়ে যেতে পারে। তবে সাধারণভাবে ভালোবাসা প্রকাশের উদ্দেশ্যে কোলাকুলি করা জায়েজ।

(তিরমিজি: ২/১০২, মাহমুদিয়া: ২৮/২১১, ইসলাহি খুতুবাত: ১/১৮৬-১৮৭)


সম্পর্কিত নিউজ