ঈদুল ফিতরের নামাজ: নিয়ম, নিয়ত ও দোয়া

ঈদুল ফিতরের নামাজ: নিয়ম, নিয়ত ও দোয়া
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Showanur Rahman

দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর শেষ হলো পবিত্র রমজান মাস। দেশের আকাশে শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা যাওয়ায় আগামী সোমবার উদ্‌যাপিত হবে মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল ফিতর।ঈদুল ফিতরের দিন রাজধানীসহ সারা দেশের ঈদগাহ ও বিভিন্ন মসজিদে মুসল্লিরা একত্রিত হয়ে দুই রাকাত ওয়াজিব ঈদের নামাজ আদায় করবেন।

ঈদের নামাজ মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। তবে অনেকেই ঈদের নামাজের নিয়ত, আদায়ের নিয়ম এবং অতিরিক্ত তাকবির সম্পর্কে মাঝে মাঝে ভুলে যান।

মুসলমানরা প্রতি বছর দুটি ঈদ-ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা-উদ্‌যাপন করে থাকে। এর মধ্যে ঈদুল ফিতর আসে পবিত্র রমজানের এক মাস রোজা পালনের পর, যা আনন্দ, কৃতজ্ঞতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের এক মহা মিলনমেলা হিসেবে পালিত হয়।

ঈদের নামাজের বিধান

ঈদুল ফিতরের দুই রাকাত নামাজ আদায় করা ওয়াজিব। এই নামাজ খোলা মাঠে (ঈদগাহে) বা মসজিদে পড়া যায়, তবে খোলা জায়গায় আদায় করা উত্তম। ঈদের নামাজ অবশ্যই জামাতের সঙ্গে আদায় করতে হয়; জামাত ছাড়া একাকী এ নামাজ পড়া যায় না।

এই নামাজের জন্য আজান ও ইকামতের প্রয়োজন হয় না। জুমার নামাজের মতোই এতে ইমাম উচ্চস্বরে কোরআন তেলাওয়াত করেন। ঈদের নামাজ শেষে ইমাম খুতবা প্রদান করেন। তবে জুমার নামাজের ক্ষেত্রে খুতবা নামাজের আগে পড়া হলেও ঈদের নামাজে খুতবা নামাজের পর পড়া হয়।


ঈদের দিন যথাযথভাবে ঈদের নামাজ আদায় করার জন্য নিচে নিয়ত, নামাজের নিয়ম এবং অতিরিক্ত তাকবিরের পদ্ধতি তুলে ধরা হলো -

ঈদের নামাজের নিয়ত

নামাজের নিয়ত মূলত অন্তরের ইচ্ছা ও সংকল্প। যখন কেউ নামাজ আদায়ের জন্য জায়নামাজে দাঁড়ায়, তখন তার মনে থাকে সে কোন ওয়াক্তের বা কোন নামাজ আদায় করতে যাচ্ছে-এটাই নিয়ত হিসেবে গণ্য হয়।

ঈদুল ফিতরের নামাজে দাঁড়ানোর সময়ও মনে রাখতে হবে যে, আমরা ঈদুল ফিতরের দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় করছি এবং এতে অতিরিক্ত ছয়টি তাকবির রয়েছে-এই ধারণাটিই মূলত নিয়ত।

এভাবে নিয়ত করা যেতে পারে-
“আমি কেবলামুখী হয়ে ঈদুল ফিতরের দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ ছয় তাকবিরের সঙ্গে আদায় করার নিয়ত করছি।”

এরপর “আল্লাহু আকবার” বলে নামাজ শুরু করতে হবে। কেউ চাইলে আরবিতেও নিয়ত করতে পারেন, তবে আরবিতে নিয়ত করা বাধ্যতামূলক নয়, অন্তরের ইচ্ছাই নিয়তের জন্য যথেষ্ট।

আরবি নিয়তটি হলো -

نَوَيْتُ أنْ أصَلِّي للهِ تَعَالىَ رَكْعَتَيْنِ صَلَاةِ الْعِيْدِ الْفِطْرِ مَعَ سِتِّ التَكْبِيْرَاتِ وَاجِبُ اللهِ تَعَالَى اِقْتَضَيْتُ بِهَذَا الْاِمَامِ مُتَوَجِّهًا اِلَى جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِيْفَةِ اللهُ اَكْبَرْ

উচ্চারণ : নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহি তাআলা রাকাআতাইন সালাতিল ইদিল ফিতরি মাআ সিত্তাতিত তাকবিরাতি ওয়াঝিবুল্লাহি তাআলা ইকতাদাইতু বিহাজাল ইমামি মুতাওয়াঝঝিহান ইলা ঝিহাতিল কাবাতিশ শারিফাতি 'আল্লাহু আকবার।

অর্থ : আমি ঈদুল ফিতরের দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ অতিরিক্ত ৬ তাকবিরের সঙ্গে এই ইমামের পেছনে কেবলামুখী হয়ে আল্লাহর জন্য আদায় করছি- 'আল্লাহু আকবার'।

ঈদের নামাজের নিয়ম

ঈদুল ফিতরের নামাজ দুই রাকাত। এতে অতিরিক্ত তাকবির রয়েছে। নিচে ধাপে ধাপে প্রথম ও দ্বিতীয় রাকাতের নিয়ম তুলে ধরা হলো-

প্রথম রাকাত

১. প্রথমে ঈদের নামাজের নিয়ত করে তাকবিরে তাহরিমা বলে (আল্লাহু আকবার) হাত বেঁধে নেবেন।
২. এরপর সানা পড়বেন-
“সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা, ওয়া তাবারাকাসমুকা, ওয়া তা‘আলা জাদ্দুকা, ওয়া লা ইলাহা গাইরুকা।”
৩. এরপর অতিরিক্ত তিনটি তাকবির দেবেন। প্রতিটি তাকবিরের মাঝে তিন তাসবিহ পরিমাণ বিরতি থাকবে। প্রথম ও দ্বিতীয় তাকবিরে হাত কাঁধ পর্যন্ত উঠিয়ে ছেড়ে দেবেন। তৃতীয় তাকবিরের পর হাত বেঁধে নেবেন।
৪. এরপর আউযুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ পড়বেন।
৫. তারপর সূরা ফাতিহা তেলাওয়াত করে কোরআনের অন্য একটি সূরা মিলাবেন।
৬. এরপর স্বাভাবিক নিয়মে রুকু ও সিজদা আদায় করে প্রথম রাকাত শেষ করবেন।

দ্বিতীয় রাকাত

১. দ্বিতীয় রাকাতে প্রথমে বিসমিল্লাহ পড়ে সূরা ফাতিহা তেলাওয়াত করবেন।
২. এরপর কোরআনের অন্য একটি সূরা পড়বেন।
৩. সূরা পড়া শেষ হলে অতিরিক্ত তিনটি তাকবির দেবেন। প্রথম রাকাতের মতো প্রথম দুই তাকবিরে হাত উঠিয়ে ছেড়ে দেবেন।
৪. তৃতীয় তাকবিরের পর হাত বেঁধে নিয়ে রুকুর তাকবির বলে রুকুতে যাবেন।
৫. এরপর সিজদা আদায় করবেন।
৬. তারপর তাশাহহুদ, দরুদ শরিফ ও দোয়া মাসুরা পড়ে উভয় দিকে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করবেন।

নামাজের সালাম ফেরানোর পর তাকবির পড়া-

اَللهُ اَكْبَر اَللهُ اَكْبَر لَا اِلَهَ اِلَّا اللهُ وَاللهُ اَكْبَر اَللهُ اَكْبَروَلِلهِ الْحَمْد

উচ্চারণ : ‘আল্লাহু আকবর, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবর ওয়া লিল্লাহিল হামদ।’


ঈদের নামাজের পর খুতবা প্রদান করা সুন্নত। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ঈদের নামাজ আদায় করার পর মুসল্লিদের উদ্দেশে খুতবা দিতেন।

হজরত আবদুল্লাহ বিন সায়েব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি ঈদের দিনে নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে উপস্থিত ছিলাম। তিনি আমাদের নিয়ে নামাজ আদায় করালেন। নামাজ শেষ করে তিনি বললেন, আমরা নামাজ শেষ করেছি। যার ইচ্ছা সে খুতবা শোনার জন্য বসে থাকবে, আর যে চলে যেতে চায়, সে চলে যেতে পারে।” (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১২৯৩)।

সুতরাং ঈদের নামাজ শেষ হওয়ার পর ইমাম খুতবা প্রদান করেন এবং মুসল্লিদের উচিত মনোযোগ সহকারে সেই খুতবা শোনা। এটিই ঈদের প্রথম কাজ। আল্লাহ তাআলা কোরআনুল কারিমেও তাকবির পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন এভাবে,

وَلِتُكْمِلُواْ الْعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُواْ اللّهَ عَلَى مَا هَدَاكُمْ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ


আর তোমাদের আল্লাহ তাআলার মহত্ত্ব বর্ণনা কর, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর।( সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৫)


সম্পর্কিত নিউজ