{{ news.section.title }}
রমজানের নাজাতের দশ দিন: ক্ষমা, নাজাত ও লাইলাতুল কদরের সন্ধান
রমজানের শেষ দশককে অনেক আলেম ও ইসলামি বর্ণনায় “নাজাতের দশক” বলা হয়-কারণ এই সময়টি বান্দার জন্য আত্মশুদ্ধি, গুনাহ মাফ এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির আশায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করার সময়। মাসজুড়ে ইবাদতের যে ছন্দ তৈরি হয়, শেষ দশকে এসে সেটাই আরও ঘন, আরও গভীর হয়। কারণ এ সময়েই লাইলাতুল কদরের মতো মহিমান্বিত রাত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে-যে রাতে ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম।
এই দশকে সবচেয়ে বড় লক্ষ্য একটাই-ইবাদত বাড়ানো, আল্লাহর দিকে পুরোপুরি ফিরে যাওয়া, নিজের ভুল-ত্রুটি বুঝে তওবা করা এবং জীবনের গতি বদলের জন্য বাস্তব সিদ্ধান্ত নেওয়া। নিচে শেষ দশ দিনে করণীয় আমলগুলো সহজ, পড়তে সুবিধাজনকভাবে সাজিয়ে দেওয়া হলো।
১) শেষ দশকে ইবাদতের
অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায়-রমজানের শুরুতে উদ্যম বেশি থাকে, মাঝামাঝি এসে ক্লান্তি বা ব্যস্ততায় গতি কমে যায়। কিন্তু শেষ দশক হলো উল্টোভাবে জোর বাড়ানোর সময়। এই সময়টাকে নিজের জন্য ‘স্পেশাল রুটিন’ বানিয়ে নিন-কম কথা, কম অপ্রয়োজনীয় স্ক্রল, কম আড্ডা; বেশি নামাজ, বেশি কোরআন, বেশি দোয়া, বেশি ইস্তিগফার।
একটা বাস্তব টার্গেট ঠিক করুন-শেষ দশকের প্রতিটি রাত যেন অন্তত কিছু সময় ‘ইবাদতের রাত’ হয়। পূর্ণ রাত জাগতে না পারলেও, অল্প সময় হলেও ধারাবাহিক ইবাদত রাখুন।
২) ইতিকাফ করা
শেষ দশকের সবচেয়ে শক্তিশালী আমলগুলোর একটি হলো ইতিকাফ-মসজিদে অবস্থান করে ইবাদতে মনোযোগী হওয়া। ইতিকাফ মানে শুধু মসজিদে থাকা নয়; বরং দুনিয়ার ব্যস্ততা থেকে দূরে সরে গিয়ে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন করে গড়ে তোলা।
যারা পুরো দশ দিন ইতিকাফ করতে পারবেন না, তারা সুযোগ অনুযায়ী নফল ইতিকাফও করতে পারেন-কয়েক ঘণ্টা হলেও। ইতিকাফের সময় কোরআন তিলাওয়াত, নফল নামাজ, জিকির, দোয়া-সবই বেশি করে করা যায়। সবচেয়ে বড় কথা, মনটা ‘ডিস্ট্র্যাকশন’ থেকে বের হয়ে আসে।
৩) লাইলাতুল কদর খোঁজা: বেজোড় রাতগুলোতে
শেষ দশকের সবচেয়ে আলোচিত লক্ষ্য লাইলাতুল কদর অর্জন করা। এই রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম-এ কারণে শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে (২১, ২৩, ২৫, ২৭, ২৯) ইবাদতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
- মাগরিবের পর অযু-তাওবা দিয়ে শুরু
- এশা ও তারাবির পর কিছু সময় কোরআন
- তারপর নফল নামাজ/জিকির/দোয়া
- শেষ রাতে তাহাজ্জুদে চেষ্টা
এই রাতের জন্য রাসুল (সা.) যে দোয়াটি শিখিয়েছেন, সেটি ঠিক এইভাবেই পড়বেন-
‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন, তুহিব্বুল আফওয়া, ফাফু আন্নি।’
অর্থ: হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমাকে পছন্দ করেন, তাই আমাকে ক্ষমা করুন।
এ দোয়াটা মুখস্থ করে যতবার সম্ভব পড়ুন-নামাজে, দোয়ায়, হাঁটতে-চলতেও।
৪) তাহাজ্জুদ ও কিয়ামুল লাইল: রাতের শেষ ভাগে
শেষ দশকে তাহাজ্জুদ আলাদা গুরুত্ব পায়-কারণ রাতের শেষ ভাগে মন নরম থাকে, কান্না আসে, দোয়া সহজ হয়। যারা সারা বছর নিয়মিত পারেন না, তারা অন্তত শেষ দশকে চেষ্টা করুন। ২ রাকাত হলেও নিয়মিত থাকলে বদলটা দেখা যায়।
তাহাজ্জুদের পর দোয়ায় নিজের জীবনের বড় বড় জায়গাগুলো ধরুন-
- গুনাহ থেকে বের হওয়ার শক্তি
- পরিবারে বরকত
- হেদায়াত ও তাকওয়া
- হালাল রিজিক
- অন্তরের রোগ (হিংসা, অহংকার, রিয়া) থেকে মুক্তি
৫) তওবা-ইস্তিগফার
শেষ দশক মানেই “ক্ষমা চাইবার সময়”-কিন্তু তওবা শুধু মুখের কথা হলে হয় না। তওবার ভেতর কয়েকটা বিষয় থাকা জরুরি-
- ভুলটা স্বীকার করা
- অনুতপ্ত হওয়া
- ভবিষ্যতে না করার সিদ্ধান্ত
- যাদের হক নষ্ট হয়েছে, তা ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা
ইস্তিগফারকে দৈনিক অভ্যাস বানান। ছোট ছোট গুনাহ জমে পাহাড় হয়-শেষ দশক হলো সেই পাহাড় ভাঙার সময়।
৬) কোরআন তিলাওয়াত: শুধু পড়া নয়, বোঝারও চেষ্টা
রমজান কোরআনের মাস-আর শেষ দশকে কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করা জরুরি। অনেকে পুরো কোরআন শেষ করার লক্ষ্য নেন-এটা ভালো। কিন্তু পাশাপাশি দিনে অন্তত কিছু আয়াতের অর্থ বোঝার চেষ্টা করুন-কারণ কোরআন শুধু তিলাওয়াত নয়, জীবন বদলের নির্দেশনা।
আজকের বাস্তবতায় ‘কম পড়েও নিয়মিত’ অনেক কাজে দেয়-প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় ঠিক করে দিন, যেন শেষ দশকে একদিনও বাদ না যায়।
৭) বেশি বেশি দান-সদকা
শেষ দশকে দান-সদকা বহু গুণ ফজিলতপূর্ণ। কারও ইফতার পৌঁছে দেওয়া, অসহায় পরিবারের বাজার, এতিমের সহায়তা, মসজিদ-মাদরাসায় সহযোগিতা-সবই সদকার মধ্যে পড়ে। এই সময়ে দান মানে শুধু টাকা নয়-প্রয়োজন পূরণ করা, সম্মান বাঁচিয়ে সাহায্য করা, মানুষের কষ্ট কমানো।
বিশেষ করে ফিতরা/যাকাতের বিষয়ে যথাসময়ে পরিকল্পনা করুন-যাতে ঈদের আগে প্রকৃত হকদাররা উপকার পায়।
৮) নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, পুরো উম্মাহর জন্য দোয়া করা
শেষ দশকের দোয়ায় তিনটা স্তর রাখুন-
- নিজের গুনাহ, হেদায়াত, তাকওয়া
- পরিবার-সন্তান, বাবা-মা, ঘর
- উম্মাহ-নিরাপত্তা, শান্তি, জুলুম থেকে মুক্তি
শেষ কথা
তাহাজ্জুদ ও কিয়ামুল লাইল হলো গভীর রাতে আল্লাহর দরবারে দাঁড়িয়ে ইবাদত করা এবং কান্নাকাটি করে তাঁর কাছে নিজের প্রয়োজন ও ক্ষমা প্রার্থনা করা। এই সময়ের ইবাদত আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়। তওবা ও ইস্তিগফার করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ; অর্থাৎ বিগত জীবনের গুনাহের জন্য বারবার আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতে সেসব থেকে বিরত থাকার দৃঢ় সংকল্প করা। এই বরকতময় সময়ে দান-সদকা করাও বিশেষ ফজিলতের কাজ, কারণ অভাবী মানুষদের সাহায্য করলে আল্লাহ তাআলা তার সওয়াব বহু গুণ বৃদ্ধি করে দেন। পাশাপাশি দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে নিজের, পরিবারের এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ, হেদায়েত ও শান্তির জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা অত্যন্ত উত্তম।