বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম এর গুরুত্ব ও ফজিলত

বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম এর গুরুত্ব ও ফজিলত
ছবির ক্যাপশান, বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম এর গুরুত্ব ও ফজিলত
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Showanur Rahman

মুসলিম জীবনে এমন কিছু ছোট ছোট আমল আছে, যেগুলো দেখলে “সাধারণ” মনে হয়; কিন্তু ভেতরে আছে ঈমানি শুদ্ধতা, আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা ও বরকতের গভীর শিক্ষা। ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম (بِسْمِ ٱللَّٰهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ)’ ঠিক তেমনই একটি বাক্য-যা কোরআনের অংশ, সুন্নাহর শিক্ষা, এবং দৈনন্দিন জীবনের এক শক্তিশালী অভ্যাস।

কোনো ভালো কাজ শুরু করার আগে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা মানে কাজের দায়িত্ব নিজে নেওয়ার অহংকার থেকে বের হয়ে আল্লাহর সাহায্য ও অনুমোদনের দরজায় দাঁড়ানো।

কোরআনে ‘বিসমিল্লাহ’-আয়াত হিসেবে তার মর্যাদা

পবিত্র কোরআনে মোট ১১৪টি সূরা রয়েছে। এর মধ্যে সূরা আত-তাওবাহ ছাড়া বাকি ১১৩টি সূরার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ লেখা রয়েছে এবং তেলাওয়াতের শুরুতে পড়া হয়। শুধু তাই নয়-‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম’ সূরা নামলের একটি পূর্ণাঙ্গ আয়াত (৩০ নম্বর)-এ নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ নেই। অর্থাৎ, ‘বিসমিল্লাহ’ কেবল একটি “শুরু করার বাক্য” নয়; এটি কোরআনেরই অংশ, আল্লাহর বাণী।

বাংলা অর্থ হিসেবে সাধারণভাবে বলা হয়-“পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে”-যার মধ্যে রহমত, দয়া এবং নির্ভরতার শিক্ষা একসঙ্গে চলে আসে।

সূরা ফাতিহায় ‘বিসমিল্লাহ’-মতভেদের জায়গা

‘বিসমিল্লাহ’ সূরা ফাতিহার অংশ কি না-এ বিষয়ে ফিকহি মাযহাবগুলোর মধ্যে আলাদা মত রয়েছে। একদল আলেমের মতে এটি সূরা ফাতিহার অংশ, আরেকদল বলেন এটি দু’টি সূরার মাঝখানে পার্থক্য করার জন্য নাজিল হওয়া স্বতন্ত্র বাক্য/আয়াত। কিন্তু যেটা সবার জন্য মূল শিক্ষা-কোরআন তেলাওয়াতের শুরুতে বিসমিল্লাহ পড়া সুন্নাহ, আর ভালো কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা নবীজি (সা.)-এর আদর্শ।

সুন্নাহর শিক্ষা: ‘বিসমিল্লাহ’ দিয়ে শুরু

ইসলামি জীবনব্যবস্থায় “কাজের শুরু”-এটা শুধু সময়ের শুরু নয়, নিয়তের শুরু। নবীজি (সা.) শিক্ষা দিয়েছেন, কাজ যেন আল্লাহর নামে শুরু হয়, যাতে বরকত থাকে, শয়তানের অংশগ্রহণ বন্ধ হয় এবং কাজটি ইবাদতে পরিণত হয়।

এ বিষয়ে যে হাদিসগুলো আপনার দেওয়া টেক্সটে রয়েছে, সেগুলোর মূল বার্তা এক-আল্লাহর নাম ছাড়া শুরু হলে কাজ বরকতশূন্য হয়ে যায়। হাদিসে এসেছে-

‘গুরুত্বপূর্ণ কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ পড়া না হলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।’ (মুসনাদে আহমাদ: ১৪/৩২৯; রওজাতুল মুহাদ্দিসিন : ৬৪৫)।

আরেক বর্ণনায় এসেছে-

আবু হুরায়রা (রা.)–এর বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক কথা বা কাজ যা আল্লাহর নাম ছাড়া শুরু করা হয়, তা লেজবিহীন বা অসম্পূর্ণ (বরকতশূন্য)।’ (মুসনাদে আহমাদ, ১৪/৩২৯)

এছাড়া খাবার-দাওয়ার ক্ষেত্রে নবীজি (সা.) বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন-

‘যে খাবারে বিসমিল্লাহ পড়া হয় না, সে খাবারে শয়তানের অংশ থাকে। সেই খাবার মানুষের সঙ্গে শয়তানও ভক্ষণ করে।’ (মুসলিম : ৫৩৭৬)।

খাওয়ার শুরুতে ভুলে গেলে কী করবেন-এ কথাও হাদিসে নির্দেশিত আছে (আপনার দেওয়া হাদিস অপরিবর্তিত রেখে)-

হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন যে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যখন তোমাদের কেউ খাওয়া শুরু করে, তখন সে যেন বিসমিল্লাহ বলে। আর যদি সে (খাওয়ার শুরুতে) বিসমিল্লাহ বলতে ভুলে যায় তবে সে যেন বলে, বিসমিল্লাহি আওয়ালাহু ওয়া আখিরাহু। (আবু দাউদ, হাদিস: ৩,৭৬৭; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৫,১০৬)

কোরআনের ইঙ্গিত: আল্লাহর নামে শুরু করার অভ্যাস

কোরআনে এমন আয়াতও আছে যা বোঝায়-কাজের শুরুতে আল্লাহর নাম নেওয়া কেবল মুখের কথা নয়, বরং ঈমানের পরিচয়। যেমন নূহ (আ.)-এর ঘটনার প্রসঙ্গে বলা হয়েছে-

‘তিনি বললেন, তোমরা এতে আরোহণ করো আল্লাহর নামে। এর চলা ও থামার নিয়ন্ত্রক একমাত্র আল্লাহ।’ (সুরা হুদ, আয়াত: ৪১)।

আর হারাম-হালাল প্রসঙ্গে সতর্ক করে বলা হয়েছে-

আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘যেসব প্রাণীর ওপর আল্লাহর নাম নেওয়া হয়নি, তোমরা সেগুলো ভক্ষণ করো না। কারণ তা গোনাহ।’ (সুরা আনআম, আয়াত: ১২১)

অর্থাৎ, আল্লাহর নাম নেওয়া-এটা মুসলিম পরিচয়ের গভীর অংশ।

কোথায় ‘বিসমিল্লাহ’ বলা উচিত তার তালিকা

  • কোরআন তিলাওয়াত শুরু করার আগে (আউযুবিল্লাহ + বিসমিল্লাহ)
  • খাওয়া-দাওয়া শুরুতে
  • পান করা, ঘরে প্রবেশ, গাড়ি/যাত্রা শুরু, পড়াশোনা, কাজ শুরু
  • গুরুত্বপূর্ণ লেখা/চিঠিপত্রের শুরুতে
  • যেকোনো নেক কাজ-দান, সহযোগিতা, ভালো সিদ্ধান্ত

কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতাও আছে, অন্যায় বা ইসলাম-অসমর্থিত কাজে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা ভয়াবহ গুনাহ ও ধৃষ্টতা-কারণ এটি আল্লাহর নামে ভুল কাজের বৈধতা দেওয়ার মতো আচরণ হয়ে যায়। তাই ‘বিসমিল্লাহ’ বলার অর্থই হলো-আমি যে কাজ করছি, তা আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে।

‘বিসমিল্লাহ’ কেন জীবন বদলে দিতে পারে

‘বিসমিল্লাহ’ শুধু বাক্য নয়; এটি মানসিকতা বদলে দেয়। মানুষ কাজ শুরু করার আগে মনে মনে বলে নেয়-আমি একা নই, আল্লাহর সাহায্য দরকার, আল্লাহর বিধান মানতে হবে। এই নিয়তটাই এক জন মুমিনের দৈনন্দিন কাজকে ইবাদতে পরিণত করে। কাজ ছোট হোক বা বড়-আল্লাহর নাম দিয়ে শুরু করা মানে আল্লাহর সামনে নিজেকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা।


সম্পর্কিত নিউজ