শবে কদরের রাতের গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলো জেনে নিন

শবে কদরের রাতের গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলো জেনে নিন
ছবির ক্যাপশান, শবে কদরের রাতের গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলো জেনে নিন
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Showanur Rahman

শবে কদর রাতটি অত্যন্ত পুণ্যময় ও মহিমান্বিত, যা হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। এটি রোজার শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোর মধ্যে (২১, ২৩, ২৫, ২৭ , ২৯) যেকোনো এক রাতে হতে পারে। এই রাতের গুরুত্বের কারণে রমজান মাসের মাহাত্ম্য ও বরকত অনেক গুণ বৃদ্ধি পায়। শবে কদরের রাতেই মহান আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে জিবরাইল আলাইহিস সালাম নবীজির ওপর কুরআন নাজিল করেছেন।

কোরআনে এই রাতের ফজিলতের কথা দুটি স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে। সুরা দুখানের শুরুতে আল্লাহ বলেছেন, শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের। নিশ্চয় আমি এটি নাজিল করেছি বরকতময় রাতে; নিশ্চয় আমি সতর্ককারী। সে রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয় আমার নির্দেশে। নিশ্চয় আমি রাসূল প্রেরণকারী। তোমার রবের কাছ থেকে রহমত হিসেবে; নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। (সুরা দুখান: ২-৬)

সুরা কদরে আল্লাহ বলেছেন, নিশ্চয়ই আমি এটি নাযিল করেছি ‘লাইলাতুল কদরে।’ তোমাকে কিসে জানাবে ‘লাইলাতুল কদর’ কী? ‘লাইলাতুল কদর’ হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। সে রাতে ফেরেশতারা ও রূহ (জিবরাইল) তাদের রবের অনুমতিক্রমে সকল সিদ্ধান্ত নিয়ে অবতরণ করে। শান্তিময় সেই রাত, ফজরের সূচনা পর্যন্ত। (সুরা কাদর: ১-৫)
শবে কদর কী?
‘শবে কদর’ ফারসি শব্দ। এখানে ‘শব’ অর্থ রাত এবং ‘কদর’ অর্থ সম্মান বা মর্যাদা। আরবি ভাষায় এই রাতকে লাইলাতুল কদর বলা হয়। আরবিতে ‘লাইলাতুন’ অর্থ রাত, আর ‘কদর’ অর্থ সম্মান, মর্যাদা, এছাড়াও ভাগ্য, পরিমাণ বা  তাকদির নির্ধারণ বোঝায়। রমজান মাসের শেষ দশকের যেকোনো বেজোড় রাতে এই মহিমান্বিত রাতটি আসে।

কোন দিনে শবে কদর পালন করা হয়?
রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে কদরের তল্লাশ করতে বলেছেন। তাই রমজানের শেষ দশকের যেকোনো বেজোড় রাতে শবে কদর অনুসন্ধান করা যায়। অর্থাৎ, ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ রমজান দিবাগত রাতগুলোতে এটি পালন করা হয়। এই পাঁচটি রাতে বিশেষভাবে কদরের তল্লাশ করা হয়।

হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত,

রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে লাইলাতুল কদরের সন্ধান করো। (বুখারি, হাদিস: ২০১৭; মুসলিম, হাদিস: ১১৬৯)

শবে কদরের ফজিলত
শবে কদরের ফজিলত কুরআন ও হাদিসের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত। এই রাতে ইবাদত করা এমন সৌভাগ্যের বিষয়, যা হাজার মাসের ইবাদতের চেয়ে অনেক উত্তম। হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কদরের রাতে ঈমান ও সওয়াবের আশায় নামাজে দাঁড়ায় তার পূর্বের সব পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। (বুখারি, হাদিস: ২০১৪; মুসলিম, হাদিস: ৭৬০)

শবে কদরের রাতে নফল নামাজ পড়া, কুরআন তেলাওয়াত করা, জিকির করা এবং মহান আল্লাহর কাছে বেশি বেশি তাওবা করা।

শবে কদরের রাতে যে ৫টি আমল করতে পারেন
১) সারা রাত জেগে ইবাদত করা

বছরের অন্য কোনো সময়ে নবীজি (সা.) পুরো রাত জেগে ইবাদত করতেন না; তিনি কিছুক্ষণ ইবাদত করতেন এবং কিছুক্ষণ ঘুমাতেন। তবে রমজানের শেষ দশকে তিনি সারা রাত জেগে ইবাদত করতেন এবং পরিবারের অন্যদেরও রাতে ইবাদত করতে উৎসাহ দিতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, রমজানের শেষ দশক যখন আসতো, তখন নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সারা রাত জেগে ইবাদত করতেন। নিজের পরিবারকেও জাগাতেন। (সহিহ বুখারি: ২০২৪, সহিহ মুসলিম: ১১৭৪)

২) ইতেকাফ করা
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানের শেষ দশ দিন ইতেকাফ করতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) মৃত্যু পর্যন্ত প্রতি রমজানের শেষ দশকে ইতেকাফ করেছেন। তাঁর ওফাতের পর তাঁর স্ত্রীরাও ইতেকাফ করেছেন। (সহিহ বুখারি: ২০২৬, সহিহ মুসলিম: ১০৭২)

অন্য বর্ণনায় এসেছে, হজরত আবু হোরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, নবীজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রত্যেক রমজান মাসের শেষ দশ দিন ইতেকাফ করতেন। যে বছরে তিনি মারা যান, সে বছর বিশ দিন ইতেকাফ করেছিলেন। (সহিহ বুখারি: ২০৪৪)

৩) কোরআন তিলাওয়াত করা
রমজানের বিশেষ একটি আমল কোরআন তিলাওয়াত, শেষ দশকেরও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল এটি। শেষ দশকেরই কোনো এক রাতে আল্লাহ তাআলা কোরআন নাজিল করেছিলেন।

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেছেন, জিবরাইল (রা.) রমাজানের প্রতি রাতে নবীজির (সা.) সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। তখন আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাকে কোরআন পাঠ করে শোনাতেন। (সহিহ বুখারি: ৩২২০)

৪) কিয়ামুল লাইল আদায় করা
রমজানের শেষ দশকের রাতগুলো, বিশেষ করে শবে কদর, কিয়ামুল লাইল বা দীর্ঘসময় ধরে নফল নামাজ আদায়ের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাত।

আবু হোরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, যে ব্যক্তি ইমানদার অবস্থায় একনিষ্ঠতার সঙ্গে লাইলাতুল কদরে ইবাদত করে, আল্লাহ তায়ালা তার অতীতের গুনাহ ক্ষমা করে দেন। (সহিহ বুখারি: ১৯০১)

৫) বেশি বেশি দোয়া করা 
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শেষ দশকের রাতগুলোতে আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করতেন। দোয়াও শবে কদরের বিশেষ ইবাদত।


আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত রয়েছে, আল্লাহর রাসুলকে (সা.) তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আমি যদি কদরের রাত পেয়ে যাই তবে কী দোয়া পড়বো? আল্লাহর রাসুল উত্তর দিয়েছিলেন, তুমি বলবে

اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুওউন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নি

অর্থ: হে আল্লাহ! তুমি ক্ষমাকারী, তুমি ক্ষমা করতেই ভালোবাসো। অতএব তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও। (সুনানে তিরমিজি: ৩৫১৩)


এছাড়া আরো কিছু আমল আছে

রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর লাভের আশায় নিচের আমলগুলো করা যেতে পারে-

১. বেশি বেশি নফল নামাজ আদায় করা।
২. মসজিদে প্রবেশ করার পর দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ নামাজ পড়া।
৩. মাগরিবের পর দুই রাকাত করে আওয়াবিন নামাজ আদায় করা।
৪. রাতে তারাবির নামাজ পড়া।
৫. শেষ রাতে উঠে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করা।
৬. সম্ভব হলে সালাতুত তাসবিহ নামাজ পড়া।
৭. তাওবার নামাজ আদায় করা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
৮. সালাতুল হাজাত নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে প্রয়োজন পূরণের দোয়া করা।
৯. বিভিন্ন ধরনের নফল নামাজ বেশি বেশি পড়া।
১০. পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করা।
১১. বেশি বেশি দরুদ শরিফ পাঠ করা।
১২. তাওবা ও ইস্তিগফার করা এবং জিকির-আজকারে সময় কাটানো।
১৩. নিজের জন্য, পরিবার-পরিজন, বাবা-মা এবং মৃত মুসলিমদের জন্য দোয়া করা।
১৪. বেশি বেশি দান-সদকা করা।


সম্পর্কিত নিউজ