ফিতরা কাকে দেবেন, কাকে দিলে হবে না? জেনে নিন ইসলামী নিয়ম

ফিতরা কাকে দেবেন, কাকে দিলে হবে না? জেনে নিন ইসলামী নিয়ম
ছবির ক্যাপশান, ফিতরা কাকে দেবেন, কাকে দিলে হবে না | ছবি : সংগৃহীত

পবিত্র রমজান মাসের শেষভাগে এসে মুসলমানদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো সাদাকাতুল ফিতর আদায় করা। ঈদুল ফিতরের নামাজের আগে এটি আদায় করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে-ফিতরা কাকে দিতে হয়, আর কাকে দেওয়া যায় না।

ইসলামী শরিয়তের আলোকে, সাদাকাতুল ফিতর মূলত দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত মানুষের জন্য নির্ধারিত একটি আর্থিক ইবাদত। এর উদ্দেশ্য হলো, ঈদের আনন্দে সমাজের অসচ্ছল মানুষদেরও অংশীদার করা এবং রোজাদারের অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি-বিচ্যুতির কিছুটা পরিশুদ্ধি অর্জন করা।

আলেমদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যারা প্রকৃতপক্ষে গরিব, মিসকিন বা অভাবগ্রস্ত, তাদের ফিতরা দেওয়া যায়। অর্থাৎ যাদের নিত্যপ্রয়োজন মেটানো কঠিন, ঈদের দিন খাদ্য বা ন্যূনতম প্রয়োজনীয় ব্যয়ের সামর্থ্য নেই, তারা ফিতরার উপযুক্ত হকদার হতে পারেন।

এছাড়া সমাজে এমন মানুষও আছেন যারা বাহ্যিকভাবে স্বাভাবিক জীবনযাপন করলেও বাস্তবে ঋণ, আয়-সংকট বা জীবিকার অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। শরিয়তের দৃষ্টিতে, যদি কেউ নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক না হন এবং আর্থিক কষ্টে থাকেন, তবে তিনিও সাদাকাতুল ফিতর পাওয়ার উপযুক্ত হতে পারেন।

তবে ইসলামী বিধান অনুযায়ী, ধনী ব্যক্তিকে ফিতরা দেওয়া যায় না। যিনি নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক, অথবা নিজ পরিবারের প্রয়োজনের বাইরে পর্যাপ্ত সম্পদ রাখেন, তিনি ফিতরার হকদার নন। কারণ ফিতরা মূলত অভাবীদের জন্য।

একইভাবে, সাধারণভাবে নিজের বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি এবং সন্তান-সন্ততি-যাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিজের ওপর বর্তায়-তাদের ফিতরা দেওয়া যায় না। কারণ শরিয়তে যাদের ব্যয়ভার নিজ দায়িত্বে বহন করতে হয়, তাদের কাছে ফিতরা দিলে তা আলাদা দান হিসেবে গণ্য হয় না।

এছাড়া স্বামী তার স্ত্রীকে ফিতরা দিতে পারেন না। কারণ স্ত্রীর ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বামীর ওপর রয়েছে। একই যুক্তিতে, কোনো ব্যক্তি নিজের অধীনস্থ এমন কাউকে ফিতরা দিতে পারবেন না, যার ব্যয়ভার তিনি নিয়মিত বহন করেন।

তবে আত্মীয়স্বজনের মধ্যে যারা গরিব এবং যাদের ভরণপোষণ নিজের দায়িত্বে পড়ে না, তাদের ফিতরা দেওয়া উত্তম বলে অনেকে মনে করেন। যেমন-গরিব ভাই, বোন, চাচা, ফুফু, খালা, মামা বা অন্য আত্মীয়, যদি তারা সত্যিই অভাবগ্রস্ত হন, তাহলে তাদের ফিতরা দেওয়া যেতে পারে। এতে একদিকে দান আদায় হয়, অন্যদিকে আত্মীয়তার বন্ধনও রক্ষা হয়।

ইসলামী শিক্ষায় আরও বলা হয়েছে, ফিতরা এমনভাবে আদায় করা উচিত যাতে অভাবী ব্যক্তি ঈদের দিন সম্মানের সঙ্গে প্রয়োজন মেটাতে পারেন। সে কারণে অনেক আলেম ঈদের আগেই ফিতরা পৌঁছে দেওয়ার পরামর্শ দেন, যাতে উপকারভোগী ব্যক্তি ঈদের প্রস্তুতি নিতে পারেন।

ফিতরা আদায়ের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিয়ত। এটি সাধারণ দান নয়; বরং একটি নির্দিষ্ট ইবাদত। তাই সঠিক ব্যক্তির কাছে, সঠিক উদ্দেশ্যে এবং যথাসময়ে এটি পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

তবে এখানে একটি বিষয় উল্লেখযোগ্য-ফিতরার খাতে কারা অন্তর্ভুক্ত হবেন, সে বিষয়ে বিভিন্ন মাজহাব ও ফিকহি ব্যাখ্যায় কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য দেখা যায়। তাই নির্দিষ্ট কোনো জটিল পারিবারিক বা আর্থিক পরিস্থিতিতে স্থানীয় নির্ভরযোগ্য আলেম বা মুফতির পরামর্শ নেওয়া উত্তম।

রমজানের শেষ সময়ে এসে সাদাকাতুল ফিতর নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। ধর্মীয় বিশ্লেষকদের মতে, ফিতরার মূল চেতনা হলো সমাজে সাম্য, সহমর্মিতা ও ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করা। তাই ফিতরা আদায়ের আগে কারা প্রকৃত হকদার, তা জেনে নেওয়া জরুরি।

ঈদ সামনে রেখে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের প্রতি আহ্বান হচ্ছে-সঠিক নিয়মে, সঠিক ব্যক্তির হাতে এবং সময়মতো সাদাকাতুল ফিতর পৌঁছে দেওয়া। এতে ইবাদতের উদ্দেশ্যও পূরণ হবে, আর সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষও ঈদের আনন্দে শরিক হতে পারবেন।


সম্পর্কিত নিউজ