যাকাত ও ফিতরা কি এক জিনিস? জেনে নিন পার্থক্যগুলো

যাকাত ও ফিতরা কি এক জিনিস? জেনে নিন পার্থক্যগুলো
ছবির ক্যাপশান, যাকাত ও ফিতরা কি এক জিনিস?

রমজান এলেই যাকাত ও ফিতরা নিয়ে আলোচনা বাড়ে। তবে বাস্তবে অনেক মানুষই এই দুই বিষয়কে এক করে ফেলেন। অথচ ইসলামী বিধান অনুযায়ী যাকাত ও ফিতরা আলাদা দুটি আর্থিক ইবাদত, যার উদ্দেশ্য, সময়, পরিমাণ এবং প্রযোজ্যতার ক্ষেত্রও ভিন্ন।

যাকাত হলো ইসলামের অন্যতম ফরজ ইবাদত। নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিক মুসলমানদের ওপর এটি আদায় করা বাধ্যতামূলক। অন্যদিকে ফিতরা, বা সদকাতুল ফিতর, রমজান মাসের শেষে ঈদুল ফিতরের আগে আদায় করতে হয়, যাতে দরিদ্র মানুষও ঈদের আনন্দে অংশ নিতে পারেন।

ধর্মীয় আলেমরা বলছেন, যাকাত মূলত সম্পদের পবিত্রতা ও সমাজে সম্পদের সুষম বণ্টনের জন্য নির্ধারিত। একজন মুসলমানের কাছে যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদ এক বছর পূর্ণ থাকে, তাহলে তাকে সেই সম্পদের নির্দিষ্ট অংশ যাকাত হিসেবে দিতে হয়। সাধারণভাবে এটি মোট সঞ্চিত সম্পদের ২.৫ শতাংশ।

অন্যদিকে ফিতরা সম্পদের বার্ষিক হিসাবের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এটি রমজানের সমাপ্তির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি দান। পরিবারের যিনি ভরণপোষণের দায়িত্বে থাকেন, তিনি নিজের পাশাপাশি অধীনস্থ সদস্যদের পক্ষ থেকেও ফিতরা আদায় করেন। অর্থাৎ যাকাত যেমন সব সামর্থ্যবান মানুষের ওপর নির্দিষ্ট শর্তে ফরজ হয়, ফিতরা তেমনি ঈদের আগে নির্দিষ্ট সামর্থ্য থাকা মুসলমানদের জন্য ওয়াজিব হিসেবে বিবেচিত।

দুই ইবাদতের উদ্দেশ্যেও পার্থক্য রয়েছে। যাকাতের মূল লক্ষ্য হলো সম্পদকে পবিত্র করা এবং সমাজে দরিদ্র-অসহায় মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা। ফিতরার উদ্দেশ্য হলো রোজাদারের অনিচ্ছাকৃত ভুলত্রুটি বা অপূর্ণতার জন্য এক ধরনের পরিশুদ্ধি এবং দরিদ্রদের জন্য ঈদের খাবারের ব্যবস্থা করা।

সময়ের দিক থেকেও পার্থক্য স্পষ্ট। যাকাত বছরের যেকোনো সময় হিসাবমতো আদায় করা গেলেও ফিতরা দিতে হয় রমজান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, ঈদের নামাজের আগেই। অনেক আলেমের মতে, ঈদের নামাজের আগে ফিতরা পৌঁছে দেওয়া উত্তম, যাতে অসচ্ছল মানুষ আগেভাগেই উপকৃত হতে পারেন।

পরিমাণ নির্ধারণেও দুটি বিষয় ভিন্ন। যাকাত নির্ভর করে কারও জমাকৃত অর্থ, স্বর্ণ-রূপা, ব্যবসায়িক সম্পদ ও অন্যান্য যাকাতযোগ্য সম্পদের ওপর। অন্যদিকে ফিতরার পরিমাণ নির্ধারিত হয় খাদ্যদ্রব্যের নির্দিষ্ট মাপে বা তার বাজারমূল্যে। দেশে সাধারণত গম, যব, খেজুর, কিশমিশ বা সমজাতীয় খাদ্যের মূল্যের ভিত্তিতে ফিতরার হার নির্ধারণ করা হয়।

কারা পাবেন, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যাকাতের অর্থ কোরআনে বর্ণিত নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় করতে হয়, যেমন দরিদ্র, অভাবগ্রস্ত, ঋণগ্রস্ত, মুসাফিরসহ নির্ধারিত শ্রেণির মানুষের জন্য। ফিতরাও মূলত দরিদ্র ও অভাবী মানুষের কাছেই পৌঁছে দেওয়া হয়, যাতে তারা ঈদের দিনে কষ্টে না থাকেন। তবে ফিতরার ক্ষেত্রে ঈদ উপলক্ষে তাৎক্ষণিক সহায়তার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পায়।

বাংলাদেশে রমজান ও ঈদ সামনে এলেই যাকাত ও ফিতরা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা যায়। বিশেষ করে অনেকে মনে করেন, ফিতরা দিলেই যাকাতের দায় শেষ হয়ে যায়, বা যাকাত দিলেই আলাদা করে ফিতরা দেওয়ার দরকার নেই। ধর্মীয় বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারণা ভুল। কারণ দুটি ভিন্ন ইবাদত; একটির মাধ্যমে অন্যটির বিকল্প পূরণ হয় না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মুসলমানদের উচিত যাকাতের হিসাব ঠিকভাবে শেখা এবং ফিতরা নিয়ে প্রচলিত বিভ্রান্তি দূর করা। সঠিক জ্ঞান থাকলে ব্যক্তি তার ধর্মীয় দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারবেন, পাশাপাশি সমাজের দরিদ্র জনগোষ্ঠীও প্রকৃত উপকার পাবে।

রমজানের শিক্ষা শুধু আত্মসংযম নয়, বরং সামাজিক দায়বদ্ধতাও। সেই জায়গা থেকে যাকাত ও ফিতরা-দুটি ইবাদতই গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোনটি কখন, কীভাবে এবং কার জন্য-এই পার্থক্য জানা থাকাই সচেতন আমলের প্রথম ধাপ।


সম্পর্কিত নিউজ