শিশুর ফিতরা কি বাবা-মাকেই দিতে হবে? শরিয়তের ব্যাখ্যা

শিশুর ফিতরা কি বাবা-মাকেই দিতে হবে? শরিয়তের ব্যাখ্যা
ছবির ক্যাপশান, শিশুর ফিতরা কি বাবা-মাকেই দিতে হবে?

ঈদুল ফিতর সামনে এলেই অনেক পরিবারে একটি সাধারণ প্রশ্ন ওঠে-শিশুর পক্ষ থেকে ফিতরা কে দেবে? শরিয়তের সাধারণ ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের ফিতরা আদায়ের দায়িত্ব মূলত বাবা বা আইনগত অভিভাবকের ওপর বর্তায়, বিশেষ করে যখন শিশু নিজের কোনো সম্পদের মালিক নয়।

ফিকহি সূত্রগুলো বলছে, যাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব একজন অভিভাবকের ওপর, তাদের পক্ষ থেকেও তিনি ফিতরা আদায় করবেন। এ কারণে স্ত্রী, শিশু সন্তান এবং নির্ভরশীল সদস্যদের ফিতরা পরিবারপ্রধান একসঙ্গে আদায় করেন-এটি বহু আলেমের ব্যাখ্যায় স্বীকৃত।

শিশুর ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হয়-সে কি নিজে সম্পদের মালিক, নাকি সম্পূর্ণ অভিভাবকের ওপর নির্ভরশীল? একটি বহুল উদ্ধৃত ফিকহি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, যদি শিশুর নিজের কোনো সম্পদ না থাকে, তাহলে তার ফিতরা বাবাকেই দিতে হবে; আর যদি তার নিজস্ব সম্পদ থাকে, তাহলে সেই সম্পদ থেকেই তার ফিতরা আদায় হতে পারে।

অপ্রাপ্তবয়স্ক বা নাবালক সন্তানের বিষয়ে অভিভাবকের দায়িত্ব আরও বেশি স্পষ্ট। হানাফি ব্যাখ্যাসহ একাধিক ফিকহি আলোচনায় বলা হয়েছে, গৃহপ্রধান নন-ম্যাচিউর বা বালেগ হয়নি-এমন সন্তানের পক্ষ থেকে সদকাতুল ফিতর আদায় করবেন।

এখানে অভিভাবক বলতে সাধারণত বাবা বোঝানো হলেও, বাবা না থাকলে বা দায়িত্ব পালন করতে অসমর্থ হলে আইনগত অভিভাবক বা যিনি বাস্তবে শিশুর ভরণপোষণ বহন করছেন, তিনি এই দায়িত্ব পালন করতে পারেন-এমন ইঙ্গিতও বিভিন্ন ফিকহি উত্তরে পাওয়া যায়। এতিম শিশুর ক্ষেত্রেও অভিভাবক তার নিয়ন্ত্রণাধীন সম্পদ থেকে ফিতরা আদায় করবেন বলে মালিকি ফিকহি সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

তবে শিশুর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিধানে কিছু পার্থক্য আসে। ফিকহি ব্যাখ্যায় দেখা যায়, সন্তান বালেগ বা প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে গেলে তার ফিতরার দায় মূলত তার নিজের ওপর বর্তায়। যদিও যৌথ পরিবারে অনেক সময় বাবা সন্তানের পক্ষ থেকে তা পরিশোধ করলে সেটি আদায় হয়ে যায়-এমন নমনীয় ব্যাখ্যাও রয়েছে, বিশেষ করে পারিবারিক প্রচলন বা সম্মতি থাকলে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সময়। ফিতরা ঈদের নামাজের আগেই আদায় করা উত্তম, যাতে দরিদ্ররা ঈদের দিন প্রয়োজন মেটাতে পারেন। তাই শিশুর পক্ষ থেকে ফিতরা দেওয়ার দায়িত্ব থাকলে অভিভাবকের উচিত শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা না করে সময়মতো তা পৌঁছে দেওয়া।

অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে-শিশু যদি মায়ের কাছে থাকে, তবু কি বাবার দায়িত্ব থাকবে? এ ধরনের এক ফিকহি উত্তরে বলা হয়েছে, সন্তান মুসলিম হলে এবং তার ওপর বাবার দায় থেকে গেলে, বাবা সন্তানের পক্ষ থেকে ফিতরা দেবেন, এমনকি সন্তান সাময়িকভাবে তার কাছে না থাকলেও।

ধর্মীয় বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তব জীবনে সবচেয়ে নিরাপদ বোঝাপড়া হলো-অপ্রাপ্তবয়স্ক, নির্ভরশীল শিশুর ফিতরা তার অভিভাবকই দেবেন। আর শিশু যদি এমন সম্পদের মালিক হয়, যা শরিয়তসম্মতভাবে তার নিজস্ব বলে গণ্য হয়, তবে সেখান থেকেও আদায় হতে পারে। তবে পরিবারভেদে সম্পদ, অভিভাবকত্ব ও দায়িত্বের অবস্থা আলাদা হতে পারে।

সব মিলিয়ে শরিয়তের আলোকে বলা যায়, শিশুর পক্ষ থেকে ফিতরা দেওয়া অভিভাবকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বিশেষ করে নাবালক ও নির্ভরশীল সন্তানের ক্ষেত্রে এটি অবহেলার বিষয় নয়। পরিবারের প্রধান বা আইনগত অভিভাবকের উচিত সময়মতো শিশুর পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করা, যাতে ইবাদতের হকও আদায় হয় এবং দরিদ্ররাও ঈদের আনন্দে শরিক হতে পারেন।


সম্পর্কিত নিউজ