শাওয়াল মাসের ৬ রোজা রাখার নিয়ম ও ফজিলত

শাওয়াল মাসের ৬ রোজা রাখার নিয়ম ও ফজিলত
ছবির ক্যাপশান, শাওয়াল মাসের ৬ রোজা রাখার নিয়ম ও ফজিলত
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Showanur Rahman

রমজান শেষে মুসলিম উম্মাহর সামনে যে বিশেষ আমলগুলোর দরজা খুলে যায়, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ আমলগুলোর একটি হলো শাওয়াল মাসের ৬ রোজা। আরবি হিজরি ক্যালেন্ডারে রমজানের পরের মাস শাওয়াল। এই মাসে ফিতরা প্রদান, ঈদুল ফিতর উদযাপন এবং নফল ইবাদতের ধারাবাহিকতা রক্ষা করার মাধ্যমে একজন মুমিন তার আমলনামাকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারেন।

বিশেষ করে শাওয়ালের ৬ রোজা এমন এক নফল আমল, যার ফজিলত বিশুদ্ধ হাদিসে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। এ কারণেই যুগে যুগে আলেমরা এই রোজার গুরুত্ব, বিধান, সময়, কাজা রোজার সঙ্গে এর সম্পর্ক এবং এর সওয়াবের ব্যাখ্যা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

শাওয়ালের ৬ রোজা কী এবং এর মর্যাদা কোথায়

অধিকাংশ ওলামায়ে কেরামের মতে, শাওয়াল মাসের ৬টি রোজা রাখা মোস্তাহাব। অর্থাৎ এটি ফরজ বা ওয়াজিব নয়, তবে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি নফল আমল। রমজানের পরপরই এই আমল ইবাদতের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে এবং বান্দাকে ফরজের পর নফলের দিকে অগ্রসর করে। আলেমরা বলেন, রমজান শেষ মানেই ইবাদতের গতি থেমে যাওয়া নয়; বরং একজন মুত্তাকির জন্য এটি নতুন ধারাবাহিকতার শুরু।

হজরত ইবনে মোবারক (র.) বলেন, প্রতি মাসের ৩ দিন রোজা রাখার মতো শাওয়ালের ৬ দিন রোজা রাখাও ভালো আমল। এই মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়, ইসলামের ইবাদত-জীবনে শাওয়ালের রোজা একটি স্বীকৃত ও প্রশংসিত আমল।

হাদিসে শাওয়ালের ৬ রোজার ফজিলত

শাওয়ালের ৬ রোজার ফজিলত সম্পর্কে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হাদিস হলো:

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল অতঃপর শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন সারা বছরই রোজা রাখল’। (মুসলিম: ১১৬৪; আবু দাউদ: ২৪৩৩)

আরেক বর্ণনায় এসেছে:

আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, যে ব্যক্তি রমজান মাসের ফরজ রোজাগুলো রাখল, অতঃপর শাওয়াল মাসে আরো ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন সারাবছর ধরেই রোজা রাখল। (সহিহ মুসলিম: ১১৬৪)

আরও এসেছে:

অন্য হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি রমজানের রোজা শেষ করে ৬ দিন রোজা রাখবে, সেটা তার জন্য পুরোবছর রোজা রাখার সমতুল্য। (আহমদ: ২৮০, দারেমি: ১৭৫৫)

এ ছাড়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিসে শাওয়ালের ৬ রোজাকে বছরব্যাপী রোজার সওয়াবের সঙ্গে যুক্ত করে স্পষ্ট উৎসাহ দেওয়া হয়েছে:

হজরত উবাইদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি কি সারা বছর রোজা রাখতে পারব? তখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন-তোমার ওপর তোমার পরিবারের হক রয়েছে, কাজেই তুমি সারা বছর রোজা না রেখে রমজানের রোজা রাখো এবং রমজানের পরবর্তী মাস শাওয়ালের ৬ রোজা রাখো, তাহলেই তুমি সারা বছর রোজা রাখার সওয়াব পাবে। (তিরমিজি: ১/১৫৩৪)

কেন এই ৬ রোজা সারা বছরের রোজার সমান

শাওয়ালের ৬ রোজা নিয়ে মানুষের সবচেয়ে বেশি আগ্রহের জায়গা হলো-কীভাবে এটি সারা বছরের রোজার সমান সওয়াব দেয়। এ বিষয়ে হাদিস ও কোরআনের আলোকে আলেমরা যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা খুবই সুন্দর এবং সহজ।

ইসলামি শরিয়তে প্রতিটি নেক আমলের সওয়াব ১০ গুণ বৃদ্ধি করা হয়। এই হিসাব অনুযায়ী:
রমজানের ৩০ রোজা: ৩০ × ১০ = ৩০০ দিনের সওয়াব।
শাওয়ালের ৬ রোজা: ৬ × ১০ = ৬০ দিনের সওয়াব।
মোট সওয়াব: ৩৬০ দিন বা একটি চান্দ্র বছরের সমপরিমাণ সওয়াব।

এই হিসাবের ভিত্তি কোরআনের সেই আয়াত, যেখানে বলা হয়েছে:

কেউ কোনো নেক আমল করলে, তাকে তার ১০ গুণ সওয়াব প্রদান করা হবে। (সূরা: আনআম, আয়াত: ১৬০)

অন্য এক বর্ণনাতেও এই অর্থ স্পষ্ট হয়েছে:

ছাওবান রা. বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, রমজান মাসে রোজা রাখা দশ মাস রোজা রাখার সমান এবং শাওয়ালে ছয় দিন রোজা রাখা দুই মাস রোজা রাখার সমান। সুতরাং রমজান ও ছয় রোজা মিলে এক বছরের রোজার সমান। (সুনানে কুবরা, নাসাঈ : ২৮৭৩, সহীহ ইবনে খুযায়মা : ২১১৫, মুসনাদে আহমাদ : ২২৪১২, সুনানে কুবরা, বায়হাকি : ৪/২৯৩)

আরেক বর্ণনায় এসেছে:

আল্লাহ তাআলা এক নেকিকে দশ নেকির সমান করেছেন। সুতরাং (রমজানের) এক মাস (রোজা রাখা) দশ মাসের সমান। আর সাথে ঈদুল ফিতরের পরে ছয় দিন রোজা রাখা সারা বছর রোজা রাখার সমান। (সুনানে নাসাঈ : ২৮৭৪)

অতএব, ৩০ দিনের রমজান + ৬ দিনের শাওয়াল = ৩৬ দিন; আর এর দশগুণ সওয়াব = ৩৬০ দিন, যা একটি চান্দ্র বছরের সমান।

কখন এই ৬ রোজা রাখতে হবে

ফিকহবিদদের অভিমত হলো-ঈদের দিনটি বাদ দিয়ে শাওয়াল মাসের যেকোনো ছয়দিনে রোজা রাখলেই হবে। অর্থাৎ ১ শাওয়াল, যেদিন ঈদুল ফিতর, সেদিন রোজা রাখা হারাম। তাই শুরু হবে ২ শাওয়াল থেকে।

সময়সীমা: ঈদুল ফিতরের পরের দিন (২রা শাওয়াল) থেকে শুরু করে শাওয়াল মাসের শেষ দিন পর্যন্ত যেকোনো সময় এই রোজা রাখা যায়।
ধারাবাহিকতা: রোজাগুলো একটানা ৬ দিন রাখা উত্তম, তবে এটি বাধ্যতামূলক নয়। পুরো মাসের মধ্যে সুবিধামতো বিরতি দিয়েও ৬টি রোজা পূর্ণ করা যায়।
নিষিদ্ধ দিন: ঈদের দিন (১লা শাওয়াল) রোজা রাখা হারাম, তাই এই দিন বাদ দিয়ে শুরু করতে হবে।

হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাওয়াল মাসের প্রথমদিকে, মধ্যভাগে বা শেষাংশে নির্দিষ্ট করে রোজা রাখার কথা বলেননি। আবার রোজা ছয়টি লাগাতার রাখার নির্দেশনাও হাদিসে পাওয়া যায় না। তাই শাওয়াল মাসের যেকোনো সময় এই রোজা রাখা বৈধ। তবে যত দ্রুত আদায় করা যায়, তত ভালো।

এ প্রসঙ্গে কোরআনে এসেছে:

‘তারাই দ্রুত সম্পাদন করে কল্যাণকর কাজ এবং তারা তাতে অগ্রগামী হয়’। (সূরা: মুমিনুন, আয়াত: ২৮)

আরো ইরশাদ হয়েছে:

‘তোমরা তোমাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা এবং এমন জান্নাতের দিকে দ্রুত ধাবিত হও, যার প্রশস্ততা হবে আকাশসমূহ ও জমিনসম। তা মুত্তাকিদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে’। (সূরা: আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৩)

একটানা রাখা ভালো, নাকি ভেঙে ভেঙে

এখানে শরিয়তের বিধান সহজ। রোজাগুলো একটানা রাখা যেতে পারে, আবার বিরতি দিয়েও রাখা যেতে পারে। কেউ ঈদের পরদিন থেকে টানা ৬ দিন রাখতে পারেন, আবার কেউ সারা মাসে ছড়িয়ে রাখতে পারেন। ফজিলত উভয় ক্ষেত্রেই পাওয়া যাবে, যদি শাওয়াল মাসের মধ্যে ৬টি রোজা পূর্ণ হয়।

কাজা রোজা আগে, নাকি শাওয়ালের ৬ রোজা আগে

এটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত মাসআলা। যাদের রমজানের রোজা পূর্ণ হয়নি-অসুস্থতা, সফর, নারীদের হায়েজ-নেফাস বা অন্য শরিয়তসম্মত ওজরের কারণে-তাদের জন্য কী করণীয়, এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে দু’ধরনের মত পাওয়া যায়।

প্রথম মত অনুযায়ী, আগে কাজা, পরে শাওয়ালের ৬ রোজা। এ মত অধিকাংশ আলেমের কাছে শক্তিশালী। তাদের বক্তব্য হলো:

‘শাওয়াল মাসে তাদের ভাংতি রোজাগুলো আগে পূর্ণ করে নেবে। তারপর তারা শাওয়ালের ৬ রোজা পালন করবে।

কেননা ‘..যার ওপর কাজা রয়ে গেছে সে রোজা পুর্ণ করেছে বলে গণ্য হবে না যতক্ষণ ঐ রোজাগুলোর কাজা আদায় না করে’। (আল মুগনি: ৪৪০)

এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আগে রমজানের রোজা পূর্ণ করতে হবে, তারপর শাওয়ালের ৬ রোজা রাখলে তবেই “সারা বছর রোজার” হিসাব পূর্ণতা পাবে। কারণ হাদিসে বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল”-অর্থাৎ রমজানের ফরজ অংশ পূর্ণ করা এখানে মূল শর্ত।

দ্বিতীয় মত অনুযায়ী, যদি কাজা রোজা অনেক বেশি হয় এবং আশঙ্কা থাকে যে শাওয়াল শেষ হয়ে যাবে, তাহলে আগে শাওয়ালের ৬ রোজা রাখা যেতে পারে। কারণ কাজা সারা বছর আদায় করা সম্ভব, কিন্তু শাওয়ালের ৬ রোজার বিশেষ ফজিলত শাওয়াল মাসের সঙ্গেই নির্দিষ্ট।

এ সম্পর্কেও আলোচনায় এসেছে:

তবে, আরেকদল আলেমের মতে, কাজা রোজার সংখ্যা বেশি হয়ে গেলে আগে শাওয়ালের ৬ রোজা রাখা উত্তম। কেননা শাওয়াল শেষ হয়ে গেলে অন্যমাসে এই ৬ রোজার ফজিলত নেই। কিন্তু কাজা রোজা বছরের যেকোনো সময় রাখলেই আদায় হয়ে যায়।

বিশেষ পরিস্থিতিতে বিলম্ব হলে

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব মাসআলাও আছে। যেমন, নেফাসগ্রস্ত নারী পুরো রমজানে রোজা রাখতে না পারলে তাঁর কাজা আদায় করতেই পুরো শাওয়াল মাস চলে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে আলেমদের একটি ফতোয়া অনুযায়ী, তিনি পরে জিলকদ মাসে শাওয়ালের ৬ রোজা রাখতে পারবেন এবং ওজরের কারণে বিলম্ব হওয়ায় বিশেষ ফজিলতেরও আশা রাখতে পারবেন।

এ বিষয়ে এসেছে:

তাদেরকে পুরো শাওয়াল মাসে কাজা রোজা রাখতে হবে। তারা জিলকদ মাসে শাওয়ালের ৬ রোজা রাখতে পারবে এবং শাওয়ালের বিশেষ ফজিলতও পাবে। কেননা সে শরিয়তসম্মত ওজরের কারণে বাধ্য হয়ে এই বিলম্ব করেছে। (ফতোয়া সমগ্র ১৯/২০, ফতোয়া নং-৪০৮২ ও ৭৮৬৩)

একই নিয়তে কাজা ও শাওয়ালের রোজা হবে কি

না, হবে না-এটাই আলেমদের সুস্পষ্ট বক্তব্য। ফরজ কাজা রোজা এবং শাওয়ালের ৬ নফল রোজা একসঙ্গে এক নিয়তে আদায় করা যাবে না। উভয়টির জন্য আলাদা নিয়ত ও আলাদা আমল প্রয়োজন।

নিয়ত করার নিয়ম

শাওয়ালের ৬ রোজা যেহেতু নফল, তাই এর নিয়ত সুবহে সাদিকের আগে করা উত্তম। তবে নফল রোজার ক্ষেত্রে দ্বিপ্রহরের আগেও নিয়ত করা যায়-যদি ফজর থেকে কিছু খাওয়া-দাওয়া না করা হয়ে থাকে। তবে উত্তম হলো আগের রাতেই নিয়ত ঠিক করে রাখা।

শাওয়ালের ৬ রোজার উপকারিতা 

এই রোজার গুরুত্ব শুধু সংখ্যাগত সওয়াবে সীমাবদ্ধ নয়। এর আরও কিছু আধ্যাত্মিক অর্থও আছে।

প্রথমত, এটি রমজানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে।
দ্বিতীয়ত, এটি রমজানের ত্রুটি-বিচ্যুতি পূরণে সহায়ক নফল আমল।
তৃতীয়ত, ভালো কাজের পর আরেকটি ভালো কাজের সুযোগ পাওয়া আল্লাহর দরবারে আমল কবুল হওয়ার একটি নিদর্শন হিসেবে ধরা হয়।
চতুর্থত, এটি বান্দাকে নফল ইবাদতের স্বাদে অভ্যস্ত করে তোলে।

নফল ইবাদতের গুরুত্ব বোঝাতে কোরআনে বলা হয়েছে:

‘যখন তুমি (ফরজ) দায়িত্ব সম্পন্ন করবে তখন উঠে দাঁড়াবে এবং তুমি (নফলের মাধ্যমে) তোমার রবের প্রতি অনুরাগী হবে’। (সূরা: ইনশিরাহ, আয়াত: ৭-৮)

শেষকথা

শাওয়ালের ৬ রোজা এমন একটি মোস্তাহাব আমল, যা অল্প দিনের হলেও তার সওয়াব এক বছরের রোজার সমান। তবে এই ফজিলত সেই ব্যক্তির জন্য পূর্ণভাবে প্রযোজ্য হবে, যিনি রমজানের ফরজ রোজা আদায় করেছেন, এরপর শাওয়ালের ৬টি রোজা রেখেছেন। যাদের কাজা আছে, তাদের জন্য উত্তম হলো আগে কাজা আদায় করা, তারপর শাওয়ালের রোজা রাখা। তবে শরিয়তসম্মত ওজরের ক্ষেত্রে আলেমরা কিছু প্রশস্ততাও রেখেছেন।

সারকথা হলো, শাওয়ালের ৬ রোজা কোনো সাধারণ নফল আমল নয়; এটি রমজানের আলোকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করার এক বিশেষ সুযোগ। যে ব্যক্তি রমজানের পরও ইবাদতের এই ধারা ধরে রাখে, তার জন্য এটি নেকি, ক্ষমা, আধ্যাত্মিক উন্নতি এবং বছরজুড়ে রোজার সওয়াবের এক মহান দুয়ার।


সম্পর্কিত নিউজ