{{ news.section.title }}
ইংলিশ লিগের আয় একাই ইউরোপের চার শীর্ষ লিগের সম্মিলিত আয়ের প্রায় সমান!
ইউরোপের ক্লাব ফুটবলের অর্থনীতিতে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের প্রভাব যে কতটা বড়-তা আবারও উঠে এসেছে উয়েফার সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদনে। উয়েফার “ইউরোপিয়ান ক্লাব ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ল্যান্ডস্কেপ” রিপোর্ট বলছে, ২০১৪ থেকে ২০২৪-এক দশকে প্রিমিয়ার লিগ ক্লাবগুলোর টিভি (ব্রডকাস্ট) আয় বেড়েছে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ইউরো, যা ইউরোপের বাকি ৫৩টি দেশের শীর্ষ লিগগুলোর সম্মিলিত টিভি আয়ের বৃদ্ধির (১.৬ বিলিয়ন ইউরো) প্রায় সমান। অর্থাৎ, ইংল্যান্ডের একটি লিগের টিভি-আয় বৃদ্ধিই প্রায় পুরো ইউরোপের (ইংল্যান্ড বাদে) বৃদ্ধির কাছাকাছি।
উয়েফার এই তথ্যকে কেন্দ্র করে ইউরোপের ফুটবলের “অর্থনৈতিক বৈষম্য” আবার আলোচনায় এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়-অর্থনীতির দিক থেকেও প্রিমিয়ার লিগ এখন ইউরোপের অন্য লিগগুলোর ওপর বড় ধরনের এগিয়ে।
প্রিমিয়ার লিগের টিভি আয়
প্রিমিয়ার লিগের আয় বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চালিকা শক্তি হলো-বিশ্বব্যাপী সম্প্রচারের চাহিদা এবং বড় অঙ্কের মিডিয়া রাইটস চুক্তি। ইংলিশ ফুটবলের “গ্লোবাল প্রোডাক্ট” তৈরি হয়েছে এমনভাবে, যেখানে ম্যাচের সময়সূচি, সম্প্রচার মান, তারকা খেলোয়াড়, লিগের প্রতিযোগিতা এবং বিপণন কৌশল একসঙ্গে কাজ করে।
উয়েফার রিপোর্টের বাইরে, প্রিমিয়ার লিগ নিজেও জানিয়েছে যে তারা ২০২৫/২৬ থেকে শুরু হওয়া নতুন চার বছরের যুক্তরাজ্যভিত্তিক সম্প্রচার চুক্তি করেছে, যা দেশটির ইতিহাসে বড় স্পোর্টস মিডিয়া ডিলগুলোর একটি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রিমিয়ার লিগের “ইন্টারন্যাশনাল রাইটস” বাজার আরও বড় কারণ-কারণ ইংল্যান্ডের ম্যাচগুলো ইউরোপ, এশিয়া, আমেরিকা, আফ্রিকা-সব অঞ্চলেই নিয়মিত জনপ্রিয় কনটেন্ট। ডেলয়েটও তাদের বিশ্লেষণে জানিয়েছে, প্রিমিয়ার লিগের আন্তর্জাতিক মিডিয়া রাইটস ২০২৫/২৬ মৌসুম থেকে আরও উঁচুতে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
২০১৪–২০২৪: শুধু টিভি নয়, মোট আয়ের ব্যবধানও বড়
উয়েফার রিপোর্ট বলছে, ২০১৪–২০২৪ সময়ে প্রিমিয়ার লিগ ক্লাবগুলোর মোট আয় বেড়েছে প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ইউরো। একই সময়ে ইউরোপের “বিগ ফোর” (স্পেনের লা লিগা, জার্মানির বুন্দেসলিগা, ইতালির সেরি আ, ফ্রান্সের লিগ আঁ)-এই চার লিগের ৭৬টি ক্লাবের সম্মিলিত আয় বেড়েছে ৫.৯ বিলিয়ন ইউরো। পরিমাণে তারা বেশি বাড়ালেও, একটি লিগ হিসেবে প্রিমিয়ার লিগের একক বৃদ্ধিই দেখাচ্ছে-ইংল্যান্ড কতটা দ্রুত এগিয়েছে।
এখানেই উয়েফা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরে-ইউরোপজুড়ে আয়ের বৃদ্ধিতে বৈষম্য। রিপোর্ট অনুযায়ী, শীর্ষ কয়েকটি লিগ/ক্লাব দ্রুত বাড়লেও “মাঝারি ও ছোট” লিগগুলো তুলনামূলকভাবে অনেক কম হারে বাড়ছে-যা প্রতিযোগিতামূলক ভারসাম্য, খেলোয়াড় বাজার এবং ইউরোপীয় প্রতিযোগিতার শক্তির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
ইউরোপের অন্য লিগগুলোর “ব্রডকাস্ট বাস্তবতা” ২০১৪–২০২৪
২০১৪–২০২৪ দশকে ইউরোপের বড় লিগগুলোও টিভি আয়ে বেড়েছে, তবে তাদের পথটা ছিল আলাদা চ্যালেঞ্জে ভরা।
ফ্রান্স (লিগ আঁ): ২০২০-এর পর থেকে ফরাসি লিগের ব্রডকাস্ট মার্কেট বড় ধাক্কা খেয়েছে-মিডিয়া পার্টনার/ডিল কাঠামো নিয়ে অস্থিরতা ছিল, ফলে আয়ের ধারাবাহিকতা প্রিমিয়ার লিগের মতো হয়নি (উয়েফার রিপোর্টও ফ্রান্সকে “কম স্থিতিশীল” বাজার হিসেবে উল্লেখ করে)।
ইতালি (সেরি আ): সেরি আ’র সম্প্রচার আয় আছে, কিন্তু লিগের বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ ও গ্লোবাল মার্কেটিং প্রিমিয়ার লিগের তুলনায় ধীর-এ কারণে ব্যবধান কমানো কঠিন হয়েছে। (বিভিন্ন গবেষণা-সংকলনে সেরি আ’র সম্প্রচার চুক্তির ভ্যালু প্রিমিয়ার লিগের নিচে থাকার চিত্র পাওয়া যায়)।
স্পেন (লা লিগা): বড় ক্লাবগুলোর বাজার আছে, কিন্তু লিগের সামগ্রিক আন্তর্জাতিক সম্প্রচার আকর্ষণ প্রিমিয়ার লিগের মতো সমানভাবে বিস্তৃত হয়নি-বিশেষ করে “মিড-টিয়ার” ক্লাবগুলোকে বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ড বানানোর ক্ষেত্রে।
জার্মানি (বুন্দেসলিগা): দর্শক উপস্থিতি শক্তিশালী হলেও সম্প্রচার চুক্তি কাঠামো ও বাজারমূল্যে প্রিমিয়ার লিগকে টপকানো সম্ভব হয়নি।
এই চার লিগের সম্মিলিত বাজার বড় হলেও উয়েফার রিপোর্টের সারকথা-ইংল্যান্ডের টিভি আয়ের বৃদ্ধি ইউরোপে সবচেয়ে প্রভাবশালী।
হরমোনের মতো বাড়ছে আয়-কিন্তু খরচও বাড়ছে (UEFA-এর সতর্কতা)
তবে উয়েফা শুধু আয়ের সাফল্য দেখিয়ে থেমে নেই। তাদের রিপোর্টে ইউরোপীয় ক্লাবগুলোর আয়ের পাশাপাশি ব্যয় বৃদ্ধির কথাও আছে-বিশেষ করে বেতন, ট্রান্সফার খরচ, অপারেটিং কস্ট। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের একটি রিপোর্টেও বলা হয়েছে, ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর সম্মিলিত রাজস্ব রেকর্ড ছুঁলেও বড় অঙ্কের লোকসানও রয়েছে-অর্থাৎ “রেভিনিউ বাড়ছে, কিন্তু লাভ বাড়ছে না” এমন ঝুঁকি টিকে আছে।
এ কারণেই উয়েফা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্লাবগুলোর ব্যয়-নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক নিয়ম (financial sustainability rules) জোরদার করছে-যাতে আয়ের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যয় না বাড়ে এবং ক্লাবগুলো দীর্ঘমেয়াদে টেকসই থাকে।
ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় প্রভাব: ‘অর্থনীতি’ বনাম ‘পারফরম্যান্স’
প্রিমিয়ার লিগের আয় বৃদ্ধি মাঠের পারফরম্যান্সে সুবিধা দেয়-কারণ বেশি আয় মানে বেশি বেতন কাঠামো, বড় স্কোয়াড, গভীরতা, ট্রান্সফার সক্ষমতা এবং উন্নত অবকাঠামো। তবে ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় কারা এগিয়ে থাকবে-তা শুধু অর্থনীতির ওপর নির্ভর করে না; কোচিং, পরিকল্পনা, ইনজুরি, ফর্ম-সবকিছুই ভূমিকা রাখে।
উয়েফা বলছে, ইউরোপজুড়ে ক্লাব ফুটবলের মোট রাজস্ব বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে সম্প্রচার, বাণিজ্যিক চুক্তি ও ম্যাচডে আয়ের কারণে-এবং ২০১৯–২০২৪ সময়ে আয়ের নতুন উৎস হিসেবে কমার্শিয়াল ও গেট রেভিনিউ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।