ভুয়া তথ্যের জালে আমরা! যেভাবে সনাক্ত করবেন ফেইক নিউজ, ইনফোডেমিক ও মিথ্যা কন্টেন্ট

ভুয়া তথ্যের জালে আমরা! যেভাবে সনাক্ত করবেন ফেইক নিউজ, ইনফোডেমিক ও মিথ্যা কন্টেন্ট
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

একুশ শতকের তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে, তথ্যই আমাদের জীবনকে করে তুলেছে সহজতর। মাত্র কয়েকটি ক্লিকেই আমরা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে বিভিন্ন খবর, গবেষণা, ছবি, ভিডিও এমনকি লাইভ ইভেন্টও দেখতে পারি। তবে এই সুবিধার সঙ্গে আমাদের জন্য এসেছে এক বিপজ্জনক চ্যালেঞ্জও! প্রতিনিয়ত বিস্তার লাভ করছে ভুয়া তথ্য বা ফেইক নিউজ। সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে তথ্যের অগণিত প্রবাহ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, সত্য আর মিথ্যার ফারাক বেশিরভাগ সময় বোঝাই যায় না। ভুয়া তথ্য শুধু একটি সামাজিক সমস্যাই না, এটি আমাদের বোঝাপড়াকে বিভ্রান্ত করে, রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও ঝুঁকিতে ফেলে। কখনও কখনও তো মানুষের জীবনকেও বিপদে ফেলে। তাই আমাদের জানা জরুরি যে কীভাবে ঘরে বসে সহজ ও প্রযোজ্য কিছু টুল ব্যবহার করেই আমরা ফ্যাক্ট-চেকিং করতে এবং তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে পারবো।

ফেইক নিউজ হলো  মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর সংবাদ, যা কোনো নির্ভরযোগ্য উৎস ছাড়াই ছড়ানো হয়। এর উদ্দেশ্য হতে পারে রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থনৈতিক কোনো স্বার্থ, সামাজিক উত্তেজনা তৈরি বা হতে পারে শুধুমাত্র জনসাধারণের মনোযোগ আকর্ষণ। ইতিহাস দেখাচ্ছে, ফেইক নিউজ নতুন কোনো বিষয় নয়। গুটেনবার্গের মুদ্রণ যন্ত্র আবিষ্কারের পর থেকেই মুদ্রিত সংবাদপত্রে মিথ্যা বা বানোয়াট খবর ছড়ানোর চেষ্টা শুরু হয়। তবে আধুনিক ইন্টারনেটের যুগে ফেইক নিউজের বিস্তার আরও ভয়ংকরভাবে বেড়েছে । ২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচনের পর এটি বিশ্ববাসীর কাছে ব্যাপকভাবে পরিচিত হয়, যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচুর চাঞ্চল্যকর মিথ্যা সংবাদ ছড়ানো হয়।

ইনফোডেমিক অর্থাৎ তথ্যের মহামারী সাধারণ মানুষের কাছে চ্যালেঞ্জের আরও একটি মাত্রা যোগ করেছে।বর্তমান সময়ে তথ্যের প্রবাহ এতটাই বেশি যে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে পাওয়া কিছুটা কঠিনই হয়ে পড়েছে। একদিকে তথ্যের অভাব থাকটাও সমস্যা, অন্যদিকে আবার  তথ্যের অতিপ্রবাহ থাকলেও সৃষ্টি হয় বিভ্রান্তি। ২০০৩ সালে সার্স মহামারীর সময় প্রথমবারের মতো “ইনফোডেমিক” শব্দটি ব্যবহৃত হয় এবং এই সমস্যা যে কতটা প্রকট হতে পারে তা আমরা পরে করোনাভাইরাস মহামারীর সময়ও দেখেছি ।

 

ফ্যাক্ট-চেকিং বা তথ্যের সত্যতা যাচাই!

ফ্যাক্ট-চেকিং বলতে বোঝায় কোনো সংবাদ, লেখা বা বক্তব্যের উপস্থাপিত তথ্যের সঠিকতা যাচাই করা। এটি যে  সাংবাদিকদের কাজ  তা কিন্তু নয় বরং  প্রতিটি সাধারণ ব্যক্তি ঘরে বসেই এই প্রক্রিয়া করতে পারে। ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের প্রধান  উদ্দেশ্য  হলো তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা, যাতে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিস্তার রোধ করা সম্ভব হয় ।

 

প্রাথমিক দক্ষতাগুলো :

◑ উৎসের যাচাই: সংবাদ বা তথ্য যেখান থেকে এসেছে, সেই উৎসের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করতে হবে। ভালো ভাবে জানতে হবে পূর্বে এই উৎস কখনো  ভুয়া তথ্য ছড়িয়েছে কি না, কোনো নির্ভরযোগ্য নিউজ সাইট কি না, সরকারি পোর্টাল বা বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা কি না। এছাড়া একাধিক উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করলে সত্যতা যাচাই করা সহজ হয়।

◑ ক্রসচেকিং প্রসেস: একই তথ্য একাধিক উৎস থেকে যাচাই করা। উদাহরণস্বরূপ,যদি কোনো পোস্টের স্ক্রিনশট পাওয়া যায়, তবে তা মূল সোর্স বা অ্যাকাউন্টে গিয়ে তা নিশ্চিত করতে হবে । পুরনো টুইট বা ফেসবুক পোস্ট যাচাই করতে অ্যাডভান্সড সার্চ ব্যবহার করা যেতে পারে।

◑ কমেন্ট পর্যবেক্ষণ: সোশ্যাল মিডিয়ায় কমেন্টবক্স বেশিরভাগ সময়ই সহায়ক তথ্য দেয়। যেমন, ইউটিউব ভিডিও-র কমেন্টে দেখা যেতে পারে ভিডিও-টির ঘটনার প্রকৃত ব্যাখ্যা কি। 

◑ URL ও About Us যাচাই: ওয়েবসাইটের লিংক বা About Us সেকশন পড়ার মাধ্যমে যাচাই করা। অনেক সময় দুর্বৃত্তরা পরিচিত সাইটের নকল তৈরি করে । তবে URL বা ওয়েবসাইটের প্রোফাইল দেখে বোঝা যায় তথ্যটি নির্ভরযোগ্য কিনা।

◑ হেডলাইন দেখেই বিশ্বাস নয়: সাধারণত চটকদার শিরোনাম দিয়ে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করা হয়। তবে শিরোনামের সাথে নিউজের বিষয়বস্তুর মিল আছে কি না তা পুরো সংবাদ পড়া ছাড়া নিশ্চিত হওয়া যায় না।

◑ নিজের বিশ্বাস চেক করা: ফ্যাক্ট-চেকিংয়ে কনফার্মেশন বায়াস অর্থাৎ নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী তথ্য নেওয়া এড়িয়ে চলাটা খুন জরুরি ।

 

ফ্রি ফ্যাক্ট-চেকিং টুলসগুলো :

⇨ গুগল সার্চ ও কমান্ড:গুগল শুধু সার্চের জন্য নয়, তথ্য যাচাইয়ের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ এবং শক্তিশালী। বিশেষ কমান্ড ব্যবহার করে সঠিক তথ্য দ্রুত খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

⇨ গুগল ম্যাপ ও স্ট্রিটভিউ: কোনো ছবির স্থান বা ভবনের সঠিকতা যাচাই করতে রাস্তার নাম, দোকানের বোর্ড বা ল্যান্ডমার্ক দেখে গুগল ম্যাপ ও স্ট্রিটভিউ ব্যবহার করে মিলিয়ে দেখতে পারেন।

⇨ গুগল ট্রান্সলেটর:বিদেশি ভাষার লেখা অনুবাদ করতে ক্যামেরা বা লেন্স ব্যবহার করে ছবির বিদেশি লেখা অনুবাদ করে ঘটনা যাচাই করা যায়।

⇨ গুগল রিভার্স ইমেজ সার্চ ও টিনআই:ছবির সত্যতা যাচাই করতে চাইলে, একই ছবি বিভিন্ন সাইটে ভিন্ন দাবি সঙ্গে প্রকাশিত হলে ক্রসচেকের মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব। ছবি এডিট করা হয়েছে কি না, তা চিহ্নিত করতে সাহায্য করে টিনআই।

⇨ ইন-ভিড উইভেরিফাই হলো ভিডিও যাচাইয়ের জন্য ব্রাউজার এক্সটেনশন। এর মাধ্যমে ভিডিও থেকে গুরুত্বপূর্ণ ফ্রেম বের করে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা যায়।

⇨ মেটাডেটা এক্সট্রাকশন টুলস: ছবির সঙ্গে লুকিয়ে থাকা তথ্য যেমন- শাটার স্পিড, ক্যামেরা, স্থান, সময় ইত্যাদি বের করা যায়। এটি দেখলে ছবির বাস্তবতা যাচাই সহজ হয়।

⇨  ফেসবুক ও টুইটারের অ্যাডভান্সড সার্চ:নির্দিষ্ট সময়, তারিখ ও ক্রাইটেরিয়া অনুযায়ী পোস্ট খুঁজতে অ্যাডভান্সড সার্চ ব্যবহৃত হয়। আবার  টুইটডেক ব্যবহার করে একসাথে বহু টুইট দেখা যায়।

⇨  ওয়েদার আন্ডারগ্রাউন্ড: অতীতের আবহাওয়া যাচাই করতে ব্যবহৃত হয়। ছবি বা ভিডিওতে বৃষ্টির উপস্থিতি যাচাই করার জন্যও ব্যবহৃত হয় ।

⇨  ওয়েব্যাক মেশিন ও আর্কাইভ.টুডে: ওয়েবসাইটের পুরনো ভার্সন চেক করা যায়। পরে কোনো পোস্ট সরিয়ে দেওয়া হলে যাচাই করা যায়।

⇨  বিশেষায়িত ওয়েবসাইট:গাড়ির নাম্বারপ্লেট বা অস্ত্র ইত্যাদি যাচাইয়ের জন্য ব্যবহৃত হয় । যেমন, লাইসেন্স প্লেটস অব দ্য ওয়ার্ল্ড।

 

ফ্যাক্ট-চেকিং সফল করতে টুল এর পাশাপাশি প্রয়োজন সন্ধানী চোখ, বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও স্মার্টনেস। কখন কোন টুল ব্যবহার করবেন, সেটি জানতে হবে। এছাড়া তথ্য যাচাইয়ের সময় সবসময় উৎস যাচাই, ক্রসচেক, কমেন্ট পর্যবেক্ষণ, URL ও About Us পরীক্ষা করা, হেডলাইন পর্যবেক্ষণ এবং নিজের বিশ্বাসের প্রভাব চেক করা অপরিহার্য।
 

ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়া নিঃসন্দেহে আমাদের কাছে অসীম সুযোগ নিয়ে এসেছে। কিন্তু এর সঙ্গে এসেছে অসংখ্য ভুয়া তথ্য। ফেইক নিউজ, ইনফোডেমিক বা ডিপফেইক প্রযুক্তি আমাদের বোঝাপড়াকে বিভ্রান্ত করে। তবে আমাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগ, সঠিক ফ্যাক্ট-চেকিং টুলস ব্যবহার এবং সচেতনতা দিয়ে এই সমস্যা মোকাবিলা সম্ভব। একজন সচেতন ব্যবহারকারী ঘরে বসেই গুগল, স্ট্রিটভিউ, ট্রান্সলেটর, রিভার্স ইমেজ সার্চ, ভিডিও ভেরিফিকেশন ও মেটাডেটা টুল ব্যবহার করে তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারে। সুতরাং, শুধুমাত্র তথ্য গ্রহণ নয়, তথ্য যাচাই করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নিজের এবং সমাজের জন্য এটি এক অপরিহার্য দায়িত্ব। ইন্টারনেটকে ভুয়া তথ্য থেকে মুক্ত রাখা সম্ভব। শুধু প্রয়োজন সচেতনতা, সঠিক সরঞ্জাম এবং প্রখর অনুসন্ধিৎসা। এই উদ্যোগই আমাদের তথ্যভিত্তিক সমাজকে আরও শক্তিশালী, নিরাপদ এবং বস্তুনিষ্ঠ করে তুলবে।


সম্পর্কিত নিউজ