কম্পিউটার চলবে ব্রেনের ইশারায়! মাস্কের এই আবিষ্কার আশীর্বাদ নাকি নতুন কোনো আতঙ্ক?

কম্পিউটার চলবে ব্রেনের ইশারায়! মাস্কের এই আবিষ্কার আশীর্বাদ নাকি নতুন কোনো আতঙ্ক?
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

মানুষ একদিন শুধু ভাবনার মাধ্যমেই কম্পিউটার চালাবে, পক্ষাঘাতগ্রস্ত শরীর আবার নড়াচড়া করবে, কিংবা স্মৃতিশক্তি ও শেখার ক্ষমতা প্রযুক্তির সাহায্যে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলবে। কিছু বছর আগেও আমরা বিজ্ঞান কল্পকাহিনির মতো এসব শুনতাম । কিন্তু এখন এই প্রশ্নগুলো আর নিছক কল্পনাকাহিনী নয় বরং বাস্তব গবেষণার কেন্দ্রে অবস্থান করছে। এই বাস্তবতার নাম Neuralink।

 এটি একটি মস্তিষ্কে প্রতিস্থাপনযোগ্য চিপ, যা মানুষের স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের দাবি করছে। ইলন মাস্কের এই উদ্যোগ নিয়ে বিশ্বজুড়ে যেমন প্রবল কৌতূহল তৈরি হয়েছে, তেমনি তৈরি হয়েছে জতিল বিতর্ক। কেউ একে দেখছেন মানবজাতির জন্য নতুন যুগের সূচনা হিসেবে, কেউ আবার আশঙ্কা করছেন মানুষ ধীরে ধীরে নিজেই নিজের ওপর প্রযুক্তির কর্তৃত্ব তুলে দিচ্ছে!

Neuralink মূলত একটি ব্রেন–কম্পিউটার ইন্টারফেস বা মস্তিষ্ক-কম্পিউটার সংযোগ প্রযুক্তি। এর লক্ষ্য হলো মানুষের মস্তিষ্কের নিউরনের সঙ্গে সরাসরি ডিজিটাল যন্ত্রের যোগাযোগ স্থাপন করা। সহজভাবে বললে, এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক সংকেত পড়া ও প্রয়োজনে উদ্দীপিত করা সম্ভব হবে। এই চিপটি আকারে অত্যন্ত ছোট এবং মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশে স্থাপন করা হয়। চিপটির সঙ্গে যুক্ত থাকে সূক্ষ্ম তারের মতো ইলেকট্রোড, যা নিউরনের কার্যকলাপ শনাক্ত করতে পারে। এই সংকেতগুলো পরে কম্পিউটার ভাষায় রূপান্তরিত হয়। এর মানে মানুষের চিন্তা, ইচ্ছা বা স্নায়বিক নির্দেশনা সরাসরি প্রযুক্তির কাছে পৌঁছাতে পারে।

মানুষের মস্তিষ্ক মূলত বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে কাজ করে। আমরা যখন হাত নাড়াই, কথা বলি বা কিছু ভাবি, সবকিছুই নিউরনের মধ্যে সংকেত আদান-প্রদানের ফল। Neuralink এই সংকেতগুলো শনাক্ত করার চেষ্টা করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কেউ যদি মনে মনে হাত নাড়ানোর কথা ভাবেন, তাহলে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশে বিশেষ ধরনের স্নায়বিক সংকেত তৈরি হয়। চিপ সেই সংকেত শনাক্ত করে কম্পিউটারে পাঠাতে পারে। কম্পিউটার তখন সেই সংকেতকে একটি কমান্ড হিসেবে বুঝে কাজ করে। এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, মস্তিষ্কের জটিল সংকেতগুলোকে সঠিকভাবে বোঝা এবং নিরাপদভাবে ব্যাখ্যা করা।

Neuralink-এর সবচেয়ে বাস্তব ও গ্রহণযোগ্য প্রয়োগ ক্ষেত্র চিকিৎসাবিজ্ঞান। বিশেষ করে যেসব মানুষ স্নায়বিক সমস্যার কারণে শরীরের কোনো অংশ নাড়াতে পারেন না, তাদের জন্য এটি নতুন আশার দরজা খুলতে পারে। পক্ষাঘাতগ্রস্ত কেউ যদি শুধুমাত্র চিন্তার মাধ্যমে কম্পিউটার কার্সর চালাতে পারেন, বা কৃত্রিম অঙ্গকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তাহলে সেটি হবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি বড় অগ্রগতি।একইভাবে স্মৃতিভ্রংশ, স্নায়বিক আঘাত বা কিছু নির্দিষ্ট রোগে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ ও উদ্দীপনার মাধ্যমে উন্নতি আনার সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। এই জায়গাটিতেই Neuralink সবচেয়ে বেশি সমর্থন পাচ্ছে। কারণ এখানে লক্ষ্য ‘সুপারহিউম্যান’ নয়, বরং হারানো সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা।

‘সুপারহিউম্যান’ শব্দটি মূলত আসে Neuralink-এর দীর্ঘমেয়াদি উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে। ধারণাটি হলো একদিন মানুষ কেবল অসুস্থতা সারানোর জন্য নয়, বরং নিজের স্বাভাবিক ক্ষমতাকেও বাড়ানোর জন্য মস্তিষ্কে প্রযুক্তির সহায়তা নেবে। তাত্ত্বিকভাবে ভাবলে, যদি মস্তিষ্ক সরাসরি কম্পিউটারের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে তথ্য আদান-প্রদান হতে পারে অভাবনীয় গতিতে। শেখার গতি বাড়তে পারে, স্মৃতি সংরক্ষণ আরও কার্যকর হতে পারে, এমনকি জটিল গণনা বা বিশ্লেষণ চিন্তার মাধ্যমেই করা সম্ভব হতে পারে।
 

বর্তমান বৈজ্ঞানিক অবস্থান অনুযায়ী, Neuralink বা এ ধরনের প্রযুক্তি এখনো মানুষের বুদ্ধিমত্তা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার পর্যায়ে পৌঁছায়নি। মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালি এতটাই জটিল যে সেটিকে সম্পূর্ণভাবে ‘আপগ্রেড’ করা সহজ নয়। এখন পর্যন্ত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে-

◑ স্নায়বিক সংকেত পড়া

◑ সীমিত পরিসরে সংকেত পাঠানো

◑ নির্দিষ্ট কাজের ক্ষেত্রে সহায়তা করা

এগুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও ‘সুপারহিউম্যান’ হওয়ার জন্য যে মাত্রার নিয়ন্ত্রণ ও বোঝাপড়া দরকার, বিজ্ঞান এখনো সেখানে পৌঁছায়নি।
 

ঝুঁকি ও নৈতিক প্রশ্ন:

মস্তিষ্কে চিপ বসানোর সঙ্গে সঙ্গে উঠে আসে কিছু গুরুতর প্রশ্ন। মস্তিষ্ক হলো মানুষের ব্যক্তিত্ব, স্মৃতি ও স্বাধীন চিন্তার কেন্দ্র। সেখানে প্রযুক্তির সরাসরি হস্তক্ষেপ মানে শুধু চিকিৎসা নয়, বরং নৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জও। ডেটার নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত চিন্তার গোপনীয়তা, প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। যদি ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে সমাজে নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

Neuralink আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন ছুড়ে দেয়।  প্রযুক্তি কি কেবল মানুষের হাতিয়ার থাকবে, নাকি ধীরে ধীরে মানুষের অংশ হয়ে উঠবে? ইতিহাস বলে, প্রতিটি বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন প্রথমে ভয় তৈরি করে, পরে ধীরে ধীরে বাস্তবতার অংশ হয়ে যায়। কিন্তু মস্তিষ্কের মতো সংবেদনশীল জায়গায় প্রযুক্তির প্রবেশ সেই পরিবর্তনকে আরও গভীর ও জটিল করে তোলে।
 

Neuralink চিপ এখনই মানুষকে ‘সুপারহিউম্যান’ বানিয়ে দিচ্ছে, এমন দাবি বাস্তবসম্মত নয়। তবে এটি যে মানবজাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন ও সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। আজ এটি মূলত চিকিৎসার সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে দেখা হলেও, আগামী দশকগুলোতে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে। মানুষ সুপারহিউম্যান হবে কি না, তা ভবিষ্যতের বিষয়। কিন্তু নিশ্চিতভাবে, Neuralink মানুষের মস্তিষ্ক ও প্রযুক্তির সম্পর্ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার পথে এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।


সম্পর্কিত নিউজ