ফেসবুক গুগলের রাজত্ব শেষ! আপনি নিজেই এখন ইন্টারনেটের নতুন মালিক !

ফেসবুক গুগলের রাজত্ব শেষ! আপনি নিজেই এখন ইন্টারনেটের নতুন মালিক !
ছবির ক্যাপশান, ফেসবুক গুগলের রাজত্ব শেষ! আপনি নিজেই এখন ইন্টারনেটের নতুন মালিক !

আমরা কি এক বিশাল ডিজিটাল শপিং মলের ভেতরে বন্দী, যেখানে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে! ইন্টারনেটের দুনিয়ায় এখন এক নিঃশব্দ ও শক্তিশালী বিপ্লব দানা বাঁধছে, যার নাম 'Web3',যা কি না এমন এক উন্মুক্ত ময়দান যেখানে আপনি শুধু ব্যবহারকারীই নন, নিজের তথ্যের একচ্ছত্র মালিকও।

ইন্টারনেটের ইতিহাসকে যদি আমরা তিনটি অধ্যায়ে ভাগ করি, তবে প্রথম অধ্যায় অর্থাৎ Web 1.0 ছিল শুধু মাত্র পড়ার যুগ। সেখানে ব্যবহারকারীরা তথ্য দেখতে পারতেন,কিন্তু কিছু যোগ করার সুযোগ ছিল না। এরপর এলো Web 2.0। এটি আমাদের পড়া এবং লেখা দুটোরই সুযোগ দিল, যেমন- ফেসবুক, ইউটিউব বা এক্স (সাবেক টুইটার) এর মাধ্যমে আমরা কন্টেন্ট তৈরি করা শুরু করলাম। কিন্তু Web 2.0 এর আছে একটি বড় অন্ধকার দিক। এখানে আমাদের সমস্ত ব্যক্তিগত তথ্য গুটি কয়েক টেক জায়ান্ট বা বড় কোম্পানির সার্ভারে বন্দি। আপনি কোথায় যাচ্ছেন, কার সাথে কথা বলেছেন, সবই তাদের নিয়ন্ত্রণে। এই নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিয়ে ইন্টারনেটে ব্যক্তিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতেই জন্ম নিয়েছে Web3। এটি একটি প্রযুক্তির পাশাপাশি ইন্টারনেটের একটি নতুন দর্শনও।

Web3-এর মূল ভিত্তি: 

Web3 কীভাবে কাজ করে তা বুঝতে হলে আমাদের এর মেরুদণ্ড অর্থাৎ ব্লকচেইন প্রযুক্তি সম্পর্কে বুঝতে হবে। বর্তমান ইন্টারনেটে তথ্য একটি কেন্দ্রীয় সার্ভারে জমা থাকে, যেমন গুগল বা মেটার সার্ভার। কিন্তু Web3-তে তথ্য কোনো নির্দিষ্ট এক জায়গায় থাকে না। এটি হাজার হাজার কম্পিউটারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে  থাকে, যাকে বলা হয় ডিস্ট্রিবিউটেড লেজার।
 

এর সুবিধা:

☞  কোনো হ্যাকার যদি একটি কম্পিউটার হ্যাক করে, তবুও সে তথ্য পরিবর্তন করতে পারবে না। কারণ বাকি হাজার হাজার কম্পিউটারের ডেটার সাথে তা মিলবে না।

☞ একবার ব্লকচেইনে কোনো তথ্য নথিভুক্ত হলে তা মুছে ফেলা বা পরিবর্তন করা প্রায় অসম্ভব। এটি ইন্টারনেটে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনে।

☞ লেনদেন বা যোগাযোগের জন্য ব্যাংক বা কোনো থার্ড-পার্টি অ্যাপের প্রয়োজন হয় না।
 

কীভাবে Web3 ইন্টারনেটের প্রতিটি ক্ষেত্র বদলে দেবে?

Web3 কোনো কাল্পনিক ধারণা নয়, এটি বাস্তব জীবনে নিচের ক্ষেত্রগুলোতে বড় পরিবর্তন আনছে। 

বর্তমানে আপনি যখন কোনো সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে থাকেন, তখন আপনার প্রোফাইলটি আসলে আপনার নয়। কোম্পানি চাইলে যেকোনো সময় আপনার অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিতে পারে। কিন্তু Web3-তে আপনার একটি ডিজিটাল ওয়ালেট বা আইডি থাকবে যা আপনি এক প্লাটফর্ম থেকে অন্য প্লাটফর্মে নিয়ে যেতে পারবেন। আপনার অনুমতি ছাড়া কেউ আপনার ডেটা বিক্রি করতে পারবে না।

প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় দেশের বাইরে টাকা পাঠাতে কয়েক দিন সময় লাগে এবং অনেক ফি দিতে হয়। Web3-তে স্মার্ট কন্ট্রাক্ট নামক কোডিং সিস্টেম ব্যবহার করা হয়। এটি এমনই এক ডিজিটাল চুক্তি যা শর্ত পূরণ হওয়া মাত্রই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে। এখানে কোনো মানুষের মধ্যস্থতার প্রয়োজন নেই, ফলে লেনদেন হয় চোখের পলকে এবং নামমাত্র খরচে।

শিল্পীরা এখন তাদের কাজকে NFT (Non-Fungible Token) হিসেবে বিক্রি করতে পারছেন। আগে একজন শিল্পী ছবি আঁকলে সেটি কপি করা সহজ ছিল, কিন্তু ব্লকচেইনে সেই ছবির মালিকানা একবার সংরক্ষিত হলে তার মৌলিকত্ব আর কেউ কেড়ে নিতে পারে না। এটি ডিজিটাল আর্ট, গান এবং ভিডিওর দুনিয়ায় এক বিশাল আর্থিক বিপ্লব ঘটাচ্ছে।

Web3 এবং মেটাভার্স একে অপরের পরিপূরক। আপনি ইন্টারনেটে কেবল তথ্য দেখবেন না, বরং ইন্টারনেটের ভেতরে বাস করবেন। সেখানে আপনি ভার্চুয়াল জমি কিনতে পারবেন, যা ব্লকচেইনের মাধ্যমে আপনার নামে রেজিস্ট্রি করা থাকবে। এটি গেমিং এবং শিক্ষা ব্যবস্থাকে ত্রিমাত্রিক অভিজ্ঞতায় রূপান্তর করবে।

 

সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব:

আমরা জন্মগতভাবেই স্বাধীনতা প্রিয়। বর্তমান ইন্টারনেটে অ্যালগরিদম আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে, আমরা কী দেখব বা কী কিনব তা কোম্পানিগুলো ঠিক করে দেয়। Web3 এই অ্যালগরিদমিক দাসত্ব থেকে মুক্তি দিতে চায়। এটি ব্যবহারকারীদের হাতে ক্ষমতার ভারসাম্য ফিরিয়ে দেয়। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এটি ইন্টারনেটে এক ধরনের ডিজিটাল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে যেখানে সাধারণ ব্যবহারকারীরাই হবে নীতিনির্ধারক।

তবে এই পথের চ্যালেঞ্জও একেবারে কম নয়। ব্লকচেইন নেটওয়ার্ক চালাতে প্রচুর বিদ্যুৎ শক্তির প্রয়োজন হয়, যা পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলে। এছাড়া সাধারণ মানুষের জন্য এই জটিল প্রযুক্তি ব্যবহার করা শেখাও একটি বড় বাধা। তবে প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে এই সমস্যাগুলো সমাধানের পথে হাঁটছে বিশ্ব।

হয়তো আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আমরা যখন ইন্টারনেটে লগ-ইন করব, তখন আমাদের পরিচয় কোনো ইমেইল আইডি হবে না, বরং হবে একটি এনক্রিপটেড ডিজিটাল কি (Key)। ইন্টারনেট ধীরে ধীরে আমাদের সম্পদের ভাণ্ডারে পরিণত হতে যাচ্ছে। আর সেই ভাণ্ডারের চাবিকাঠি থাকবে আমাদেরি পকেটে।


সম্পর্কিত নিউজ