টেলিগ্রামের অন্ধকার জগৎ: সাইবার ব্ল্যাকমেলের ভয়ংকর ফাঁদ

টেলিগ্রামের অন্ধকার জগৎ: সাইবার ব্ল্যাকমেলের ভয়ংকর ফাঁদ
ছবির ক্যাপশান, টেলিগ্রামের অন্ধকার জগৎ: সাইবার ব্ল্যাকমেলের ভয়ংকর ফাঁদ
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Showanur Rahman

স্মার্টফোন আমাদের যোগাযোগ, কাজ, বিনোদন আর সম্পর্কের নতুন জগৎ খুলে দিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এই ডিজিটাল দুনিয়ার আড়ালে তৈরি হয়েছে এমন এক অন্ধকার নেটওয়ার্ক, যেখানে ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও কল, স্ক্রিন রেকর্ডিং এবং সামাজিক সম্পর্ক-সবকিছুই অপরাধীদের হাতে অস্ত্রে পরিণত হচ্ছে।

বাংলাদেশে বিশেষ করে টেলিগ্রামকে ঘিরে ইমেজ-বেজড সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ, সাইবার ব্ল্যাকমেল, সেক্সটরশন এবং কনসেন্ট ছাড়া ব্যক্তিগত কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদন ও বিশেষজ্ঞ মতামতে উঠে এসেছে। প্রথম আলোর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে টেলিগ্রামভিত্তিক ব্ল্যাকমেল চক্রের কৌশল তুলে ধরা হয়েছে, আর দ্য ডেইলি স্টার ও ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনগুলো বলছে, অনলাইন যৌন হয়রানি ও ডিজিটাল ব্ল্যাকমেল এখন বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে।

কীভাবে শুরু হয় ফাঁদ

এই ধরনের অপরাধ সাধারণত হঠাৎ ঘটে না। এটি ধাপে ধাপে তৈরি করা একটি ফাঁদ। প্রথমে ভুক্তভোগীকে টার্গেট করা হয়। কখনও ফেসবুক, টিকটক বা মেসেঞ্জারে পরিচয় গড়ে তোলা হয়, কখনও পাঠানো হয় সন্দেহজনক লিংক, আবার কখনও দেওয়া হয় “প্রাইভেট ভিডিও”, “ডিলিট হয়ে যাবে”, “শুধু তুমি দেখো”-এ ধরনের টোপ। সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বলছেন, এসব লিংকে ক্লিক করলেই অনেক সময় ফোনে রিমোট অ্যাকসেস ট্রোজান বা স্পাইওয়্যার ঢুকে যেতে পারে, যার মাধ্যমে স্ক্রিন, ক্যামেরা, ফাইল বা কথোপকথন নজরদারির ঝুঁকি তৈরি হয়। যদিও সব ঘটনায় একই প্রযুক্তি ব্যবহার হয় না, তবু ফোনের নিয়ন্ত্রণ হারানো বা ব্যক্তিগত কনটেন্ট ফাঁস হওয়া-দুইটাই এখন বাস্তব ঝুঁকি।

টেলিগ্রাম গ্রুপের ‘মার্কেটিং ফানেল’

প্রতিবেদনগুলোতে দেখা যাচ্ছে, অনেক অপরাধী চক্র ব্যবসায়িক মডেলের মতো কাজ করে। প্রথমে ফ্রি গ্রুপে টিজার ছড়ানো হয়-কখনও বিকৃত ছবি, কখনও ডিপফেক, কখনও কাটা ভিডিও। এরপর বলা হয়, “বাকি অংশ” দেখতে হলে আরও কয়েকজনকে গ্রুপে আনতে হবে। এতে কোনো বিজ্ঞাপন ব্যয় ছাড়াই সদস্য বাড়ে। পরে ভিআইপি, প্রিমিয়াম বা লাইফটাইম নামে টাকার বিনিময়ে কনটেন্ট দেখার অফার দেওয়া হয়। বাংলাদেশে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহার করে এমন লেনদেন হওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে। কিন্তু আসল বিপদ শুরু হয় তখন, যখন কেউ গ্রুপে ঢুকে পড়ে, অথবা নিজের ছবি/ভিডিও সরানোর অনুরোধ জানায়। তখন তাকে ভয় দেখিয়ে আরও টাকা আদায়ের চেষ্টা করা হয়। এই পদ্ধতিই সাইবার সেক্সটরশনের ক্লাসিক ধরণগুলোর একটি বলে বিভিন্ন আইনি ও মানবাধিকার বিশ্লেষণে উল্লেখ আছে।

ভুক্তভোগীরা কারা

ভুক্তভোগীদের গল্পগুলো প্রায়ই একই ধরনের। প্রবাসী স্বামীর সঙ্গে ব্যক্তিগত ভিডিও কলে থাকা নববধূ, দূরে থাকা দম্পতির পারস্পরিক ব্যক্তিগত ছবি বিনিময়, সাবেক সম্পর্কের সময়ের সংরক্ষিত ছবি, এমনকি একদম সাধারণ সেলফিও-সবকিছুই অপব্যবহারের শিকার হতে পারে। পুরোনো টেলিগ্রাম ব্ল্যাকমেল চক্র নিয়ে প্রথম আলোর আরেক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সাবেক প্রেমিকের দেওয়া কনটেন্টও এসব গ্রুপে ছড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ সব ঘটনাই “হ্যাকিং” দিয়ে শুরু হয় না, অনেক ক্ষেত্রে বিশ্বাসভঙ্গ, ব্যক্তিগত প্রতিশোধ, ফেক অ্যাকাউন্ট, ডিপফেক বা সামাজিক অপমানের ভয়কে ব্যবহার করা হয়।

আইন কী বলছে

বাংলাদেশে ২০২৫ সালের সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে সাইবার যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং, রিভেঞ্জ পর্ন, এবং নারীদের ও শিশুদের ক্ষতিকর ডিজিটাল কনটেন্টের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের অধীন “Laws of Bangladesh” সাইটে প্রকাশিত অধ্যাদেশের ২৫ নম্বর ধারায় যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং বা অশ্লীল বিষয়বস্তু প্রকাশসংক্রান্ত অপরাধ ও দণ্ডের বিধান রয়েছে। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন অধ্যাদেশে সেক্সটরশন, রিভেঞ্জ পর্ন এবং শিশু যৌন নির্যাতনঘন ডিজিটাল কনটেন্টকে স্পষ্টভাবে অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। ফলে টেলিগ্রাম বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে কারও ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে ভয় দেখানো, টাকা দাবি করা, বা ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া-এখন আরও পরিষ্কারভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধের আওতায় পড়ে।

ভুক্তভোগীর প্রথম করণীয় কী

সাইবার ব্ল্যাকমেলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভুল হলো আতঙ্কে পড়ে সঙ্গে সঙ্গে টাকা পাঠানো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে ব্ল্যাকমেল থামে না, বরং অপরাধীরা ধরে নেয় ভুক্তভোগী চাপে আছে, তাই আরও বেশি আদায় করা সম্ভব। এর বদলে প্রথমেই সংরক্ষণ করতে হবে সব প্রমাণ-চ্যাট হিস্ট্রি, স্ক্রিনশট, ইউজারনেম, গ্রুপ লিংক, লেনদেনের নম্বর, ভয়েস মেসেজ, প্রোফাইল লিংক, এমনকি সময়-তারিখও। এরপর দ্রুত থানায় জিডি, সাইবার ক্রাইম ইউনিটে অভিযোগ বা আইনজীবীর সহায়তা নেওয়া জরুরি। অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনাগুলোতেও জোর দেওয়া হয়েছে প্রমাণ সংরক্ষণ এবং দ্রুত রিপোর্টিংয়ের ওপর।

প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা

প্রযুক্তিগত সচেতনতা এখন আত্মরক্ষার অংশ। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো-টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু রাখা, অচেনা লিংকে ক্লিক না করা, তৃতীয় পক্ষের অ্যাপ ডাউনলোড না করা, ফোনের অ্যাপ পারমিশন নিয়মিত পরীক্ষা করা, ক্লাউড ব্যাকআপ ও ডিভাইস সিকিউরিটি রিভিউ করা, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, কোনো সংবেদনশীল কনটেন্ট ডিজিটালে পাঠানোর আগে ঝুঁকি বিবেচনা করা। কারণ ইন্টারনেটে কিছু পাঠানো মানেই সেটি চিরস্থায়ীভাবে নিরাপদ থাকবে-এমন নিশ্চয়তা নেই।

সবশেষে সবচেয়ে জরুরি কথাটি হলো-এই ধরনের ঘটনায় ভুক্তভোগী অপরাধী নন। সামাজিক লজ্জা, ভয় বা চাপে চুপ থাকলে শুধু অপরাধীরাই লাভবান হয়। তাই এ ধরনের সাইবার নির্যাতনকে ব্যক্তিগত লজ্জা নয়, ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে দেখা এবং আইনগতভাবে মোকাবিলা করাই এখন সবচেয়ে জরুরি পথ। ডিজিটাল দুনিয়ায় নিরাপত্তা আর কেবল প্রযুক্তির বিষয় নয়, এটি এখন সামাজিক মর্যাদা, গোপনীয়তা এবং মানবিক মর্যাদা রক্ষার লড়াইও।


সম্পর্কিত নিউজ