{{ news.section.title }}
ডিম সংরক্ষণে কোনটি ভালো, ফ্রিজ নাকি স্বাভাবিক তাপমাত্রা?
ডিম প্রতিদিনের খাবারের অন্যতম সহজলভ্য ও পুষ্টিকর উৎস। সকালের নাশতা থেকে শুরু করে দুপুর-রাতের রান্না, বেকারি, মিষ্টান্ন কিংবা শিশুর খাবার-সব জায়গাতেই ডিমের ব্যবহার রয়েছে। এতে প্রোটিন, ভিটামিন ডি, ভিটামিন বি১২, কোলিন, সেলেনিয়ামসহ নানা পুষ্টি উপাদান থাকে। কিন্তু পুষ্টিগুণে ভরপুর হলেও ভুলভাবে সংরক্ষণ করলে ডিম দ্রুত স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে।
ব্যস্ততার কারণে অনেক সময় বাজার থেকে আনা ডিম ফ্রিজে রাখা হয় না, কিংবা ফ্রিজ থেকে বের করার পর দীর্ঘ সময় বাইরে পড়ে থাকে। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে-ডিমগুলো কি এখনো খাওয়া যাবে? খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়া ঠিক নয়। কারণ ডিমের সঙ্গে সালমোনেলা সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে, যা খাদ্যবিষক্রিয়ার অন্যতম বড় কারণ।
যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন বা এফডিএ জানিয়েছে, ব্যাকটেরিয়াজনিত অসুস্থতা ঠেকাতে ডিম ফ্রিজে রাখতে হবে, কুসুম শক্ত হওয়া পর্যন্ত রান্না করতে হবে এবং ডিম দিয়ে তৈরি খাবার ভালোভাবে রান্না করতে হবে। বিশেষ করে যেসব খাবারে কাঁচা বা আধাসেদ্ধ ডিম থাকে, সেগুলোর ক্ষেত্রে পাস্তুরিত ডিম ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কতক্ষণ বাইরে থাকলে ডিম ঝুঁকিপূর্ণ
খাদ্য নিরাপত্তার সাধারণ নিয়ম হলো, ডিমসহ নষ্ট হয়ে যেতে পারে এমন খাবার ঘরের তাপমাত্রায় দুই ঘণ্টার বেশি রাখা নিরাপদ নয়। আর তাপমাত্রা যদি ৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা প্রায় ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হয়, তাহলে এক ঘণ্টার বেশি বাইরে রাখা উচিত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের ফুড সেফটি অ্যান্ড ইনস্পেকশন সার্ভিসও জানিয়েছে, পচনশীল খাবার ঘরের তাপমাত্রায় দুই ঘণ্টার বেশি, আর ৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি তাপমাত্রায় এক ঘণ্টার বেশি থাকলে ফেলে দেওয়া উচিত।
বাংলাদেশের মতো গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার দেশে এই সতর্কতা আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। তাই বাজার থেকে ডিম আনার পর যত দ্রুত সম্ভব ঠান্ডা ও নিরাপদ জায়গায় রাখা ভালো। ফ্রিজ থাকলে ডিম ফ্রিজে রাখা সবচেয়ে নিরাপদ।
সালমোনেলা ঝুঁকি কেন গুরুত্বপূর্ণ
ডিমের সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির নাম সালমোনেলা। এটি এমন একটি ব্যাকটেরিয়া, যা ডিমের খোসায় বা কখনো ডিমের ভেতরেও থাকতে পারে। দূষিত ডিম কাঁচা, আধাসেদ্ধ বা ঠিকমতো রান্না না করে খেলে খাদ্যবিষক্রিয়া হতে পারে। লক্ষণ হিসেবে দেখা দিতে পারে পেটব্যথা, ডায়রিয়া, জ্বর, বমিভাব, বমি বা দুর্বলতা।
সিডিসি জানিয়েছে, কাঁচা বা কম রান্না করা ডিমে সালমোনেলা থাকতে পারে। সংক্রমণ ঠেকাতে খাবার যথেষ্ট তাপে রান্না করা এবং পচনশীল খাবার দুই ঘণ্টার মধ্যে ফ্রিজে রাখা জরুরি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও ডিমের সঙ্গে সম্পর্কিত সালমোনেলা সংক্রমণ নিয়ে সিডিসি একাধিক সতর্কতা দিয়েছে।
শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাদের ক্ষেত্রে সালমোনেলা সংক্রমণ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই এসব পরিবারের জন্য ডিম সংরক্ষণ ও রান্নার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হওয়া দরকার।
ফ্রিজে রাখা ডিম বাইরে আনলে কেন দ্রুত নষ্ট হতে পারে
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-যে ডিম আগে থেকেই ফ্রিজে রাখা হয়েছে, সেটি বাইরে এনে দীর্ঘ সময় রাখা আরও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। ঠান্ডা ডিম ঘরের উষ্ণ পরিবেশে এলে খোসার ওপর ঘাম বা আর্দ্রতা জমতে পারে। এই আর্দ্রতা ব্যাকটেরিয়াকে খোসার ছিদ্রপথ দিয়ে ভেতরে ঢোকার সুযোগ দিতে পারে। এ কারণেই অনেক খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ বলেন, ফ্রিজে রাখা ডিম বাইরে বের করলে যত দ্রুত সম্ভব ব্যবহার করা উচিত। রান্নার প্রয়োজনে ঘরের তাপমাত্রায় আনতে হলে দুই ঘণ্টার সীমা মাথায় রাখতে হবে।
কেন কিছু দেশে ডিম ফ্রিজে রাখা হয় না
অনেকেই প্রশ্ন করেন, ইউরোপ বা কিছু দেশে তো ডিম দোকানে ফ্রিজ ছাড়াই রাখা হয়, তাহলে বাংলাদেশে কেন ফ্রিজে রাখতে হবে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে ডিম প্রক্রিয়াজাতকরণের পদ্ধতিতে।
ডিমের খোসার ওপর স্বাভাবিকভাবে একটি পাতলা সুরক্ষাস্তর থাকে, যাকে কিউটিকল বা ব্লুম বলা হয়। এই স্তর ডিমকে জীবাণুর আক্রমণ থেকে কিছুটা সুরক্ষা দেয়। কিছু দেশে ডিম বাজারজাত করার আগে ধোয়া হয় না, ফলে এই প্রাকৃতিক স্তর কিছুটা অক্ষত থাকে। আবার যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশে ডিম ধোয়া ও জীবাণুমুক্ত করার প্রক্রিয়ায় এই স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তাই সেখানে ডিম ঠান্ডা রাখার নিয়ম কঠোর।
বাংলাদেশে বাজারের ডিম কীভাবে সংগ্রহ, ধোয়া, পরিবহন ও সংরক্ষণ হয়েছে-তা ক্রেতা সাধারণত নিশ্চিতভাবে জানেন না। গরম আবহাওয়া ও দীর্ঘ পরিবহন সময়ের কারণে নিরাপদ পদ্ধতি হলো ডিম দ্রুত ফ্রিজে রাখা।
ডিম ফ্রিজে রাখার সঠিক নিয়ম
ডিম ফ্রিজে রাখার সময় দরজার র্যাকে না রেখে ভেতরের তাক বা শেলফে রাখা ভালো। কারণ ফ্রিজের দরজা বারবার খোলা-বন্ধ হয়, ফলে সেখানে তাপমাত্রা ওঠানামা করে। ডিমের কার্টনের ভেতরে রাখলে আর্দ্রতা ও গন্ধ থেকে কিছুটা সুরক্ষা পাওয়া যায় এবং ভাঙার ঝুঁকিও কমে।
এফডিএর নির্দেশনায় কাঁচা খোসাসহ ডিম সংরক্ষণ ও পরিবেশনের সময় ঠান্ডা রাখা এবং নিরাপদ তাপমাত্রা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। খুচরা বা খাদ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে যেসব কাঁচা খোসাসহ ডিম পাস্তুরিত নয়, সেগুলো ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৪৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটের নিচে রাখতে বলা হয়েছে।
ফ্রিজে ডিম রাখার আগে ধুয়ে নেওয়া উচিত নয়। ধোয়ার ফলে খোসার সুরক্ষামূলক স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং পানি বা জীবাণু ভেতরে ঢোকার ঝুঁকি বাড়তে পারে। ডিমে ময়লা থাকলে রান্নার ঠিক আগে শুকনো কাপড় বা প্রয়োজন হলে অল্প পানি দিয়ে পরিষ্কার করে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহার করা ভালো।
ডিম ভালো আছে কি না বোঝার উপায়
ডিম নষ্ট কি না বোঝার জন্য পানিতে ভাসানোর পরীক্ষা অনেকেই করেন। সাধারণত তাজা ডিম পানিতে ডুবে যায়, পুরোনো ডিম ওপরে উঠতে পারে। কারণ সময়ের সঙ্গে ডিমের ভেতরের বায়ুথলি বড় হয়। তবে এই পরীক্ষা ডিমের বয়স সম্পর্কে ধারণা দিলেও সালমোনেলা আছে কি না, তা বোঝায় না। অর্থাৎ ডিম পানিতে ডুবে গেলেও সেটি জীবাণুমুক্ত-এমন নিশ্চয়তা নেই।
ডিম ভাঙার পর যদি দুর্গন্ধ আসে, রং অস্বাভাবিক লাগে, সাদা অংশ অস্বাভাবিকভাবে পাতলা বা পিচ্ছিল দেখায়, কুসুম ছড়িয়ে যায় বা খোসায় ফাটল থাকে-তাহলে সেই ডিম না খাওয়াই নিরাপদ। ফাটল ধরা ডিম জীবাণু প্রবেশের বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
রান্নার সময় কী সতর্কতা দরকার
ডিম ভালোভাবে রান্না করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আধাসেদ্ধ ডিম, কাঁচা ডিমের শরবত, কাঁচা ডিম মেশানো ঘরোয়া মেয়োনেজ, কেক ব্যাটার বা কাঁচা ডো খাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এফডিএ ডিম রান্নার ক্ষেত্রে কুসুম ও সাদা অংশ শক্ত হওয়া পর্যন্ত রান্না করার পরামর্শ দিয়েছে। ডিম দিয়ে তৈরি খাবারও ভালোভাবে রান্না করা উচিত।
মাইক্রোওয়েভে ডিম বা ডিমযুক্ত খাবার গরম করলে তাপ সব জায়গায় সমানভাবে পৌঁছায় না। এফডিএর খাদ্যসেবা নির্দেশনায় ডিমযুক্ত খাবার মাইক্রোওয়েভে রান্না করলে ঢেকে রাখা, মাঝপথে নেড়ে দেওয়া বা ঘোরানো এবং খাবারের সব অংশ অন্তত ৭৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ১৬৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটে পৌঁছানো নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
রান্না করা ডিম কতক্ষণ রাখা যায়
কাঁচা ডিমের মতো রান্না করা ডিমও দীর্ঘ সময় বাইরে রাখা উচিত নয়। সেদ্ধ ডিম, অমলেট, ডিম ভাজি বা ডিম দিয়ে তৈরি খাবার ঘরের তাপমাত্রায় দুই ঘণ্টার বেশি থাকলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। গরম আবহাওয়ায় এই সময় আরও কমে যায়। এফডিএ জানিয়েছে, রান্না করা ডিমের খাবার ফ্রিজে রেখে ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে খাওয়া উচিত।
কখন ডিম ফেলে দেওয়া উচিত
ডিম যদি ফ্রিজের বাইরে দুই ঘণ্টার বেশি থাকে এবং আবহাওয়া গরম হয়, বিশেষ করে তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি থাকে, তাহলে তা না খাওয়াই নিরাপদ। ডিম যদি আগে ফ্রিজে ছিল, পরে রাতভর বাইরে পড়ে থাকে, সেটিও ঝুঁকিপূর্ণ। ফাটল ধরা, দুর্গন্ধযুক্ত, অস্বাভাবিক রঙের বা সন্দেহজনক ডিম ফেলে দিতে হবে।
ফ্রিজ নষ্ট হলে ডিমসহ পচনশীল খাবার কতক্ষণ নিরাপদ থাকবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এফডিএ জানিয়েছে, ডিম, দুধ, মাছ, মাংস বা রান্না করা খাবার যদি ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি তাপমাত্রায় চার ঘণ্টা বা তার বেশি সময় থাকে, তাহলে তা ফেলে দেওয়া উচিত।
বাংলাদেশে কীভাবে সতর্ক থাকবেন
বাংলাদেশে অনেক দোকানে ডিম খোলা অবস্থায় রাখা হয়, অনেক সময় রোদ, গরম বা ধুলাবালুর সংস্পর্শেও থাকে। তাই ডিম কেনার সময় খোসা পরিষ্কার, অক্ষত ও ফাটলমুক্ত কি না দেখতে হবে। খুব বেশি ময়লা, ভাঙা বা ভেজা ডিম না কেনাই ভালো। দোকানে ডিম দীর্ঘ সময় গরমে পড়ে ছিল কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখা উচিত।
বাড়িতে এনে ডিম যত দ্রুত সম্ভব ফ্রিজে রাখা ভালো। ফ্রিজ না থাকলে ঠান্ডা, শুকনো ও বাতাস চলাচল করে এমন জায়গায় রাখতে হবে এবং দ্রুত ব্যবহার করতে হবে। তবে গরম মৌসুমে ফ্রিজ ছাড়া দীর্ঘদিন ডিম সংরক্ষণ করা নিরাপদ নয়।