গরমে রোদে বেরোলেই মাথা ঘোরে কেন, কী খাবেন আর কখন সতর্ক হবেন

গরমে রোদে বেরোলেই মাথা ঘোরে কেন, কী খাবেন আর কখন সতর্ক হবেন
ছবির ক্যাপশান, এআই ছবি

গরমে বাইরে বেরোলেই অনেকের মাথা ঘোরা, গা গোলানো, দুর্বলতা, বমি বমি ভাব, চোখে ঝাপসা দেখা বা শরীর কাঁপা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। কেউ রোদ থেকে ফিরে ঠান্ডা ঘরে ঢুকলেই অস্বস্তি অনুভব করেন, আবার কেউ দীর্ঘক্ষণ বাইরে কাজ করলে মাথাব্যথা, পেশিতে টান বা অতিরিক্ত ক্লান্তিতে ভোগেন। চিকিৎসকদের মতে, এগুলো অনেক সময় পানিশূন্যতা, শরীরে লবণ বা ইলেক্ট্রোলাইটের ঘাটতি, রক্তচাপ কমে যাওয়া এবং শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ব্যাঘাতের লক্ষণ হতে পারে।

গরমে শরীর নিজেকে ঠান্ডা রাখতে ঘাম তৈরি করে। ঘামের সঙ্গে শরীর থেকে পানি ছাড়াও সোডিয়াম, পটাশিয়ামসহ প্রয়োজনীয় লবণ বেরিয়ে যায়। পর্যাপ্ত পানি ও ইলেক্ট্রোলাইট পূরণ না হলে রক্তের পরিমাণ কিছুটা কমে, রক্তচাপ নেমে যেতে পারে এবং মস্তিষ্কে রক্ত-অক্সিজেন সরবরাহ সাময়িকভাবে কমে মাথা ঘোরার অনুভূতি তৈরি হয়। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, তৃষ্ণা লাগা মানেই শরীর ইতিমধ্যে হালকা পানিশূন্যতার দিকে যাচ্ছে; ডিহাইড্রেশনে মাথাব্যথা, ক্লান্তি ও মাথা ঘোরা দেখা দিতে পারে।

 

রোদে গেলে মাথা ঘোরার প্রধান কারণ

প্রচণ্ড গরমে ত্বকের দিকে রক্তপ্রবাহ বেড়ে যায়, যাতে শরীর তাপ বের করে ঠান্ডা থাকতে পারে। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ রোদে থাকলে বা বেশি হাঁটাহাঁটি করলে শরীরের পানি কমে যায়। এতে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ সাময়িকভাবে কমতে পারে এবং মাথা হালকা লাগা বা ঘোরার মতো অনুভূতি তৈরি হয়। সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, গরমে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা বা হঠাৎ উঠে দাঁড়ানোর পর মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়াকে হিট সিনকোপ বলা হয়; ডিহাইড্রেশন ও গরমে অভ্যস্ত না থাকা এর ঝুঁকি বাড়ায়।

 

চড়া রোদে বেশি সময় থাকলে হিট এক্সহস্টশন বা তাপজনিত ক্লান্তিও হতে পারে। মায়ো ক্লিনিক বলছে, শরীর অতিরিক্ত পানি বা লবণ হারালে-সাধারণত অতিরিক্ত ঘাম ও ডিহাইড্রেশনের কারণে-হিট এক্সহস্টশন দেখা দিতে পারে। এর লক্ষণের মধ্যে আছে মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, অতিরিক্ত ঘাম, ক্লান্তি, তৃষ্ণা, পেশিতে টান, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব এবং দ্রুত হৃদস্পন্দন।

 

গরম থেকে ঠান্ডা ঘরে ঢুকলে অস্বস্তি কেন

অনেকে প্রচণ্ড রোদ থেকে সরাসরি এসি রুমে ঢোকার পর মাথা ঘোরা বা গা গোলানো অনুভব করেন। এর পেছনে কয়েকটি কারণ থাকতে পারে। বাইরে শরীরের রক্তনালি প্রসারিত থাকে, ঘাম হয়, রক্তচাপ কিছুটা কমে যেতে পারে। হঠাৎ ঠান্ডা পরিবেশে ঢুকলে শরীরকে দ্রুত তাপমাত্রা সামঞ্জস্য করতে হয়। আবার রোদে থাকার সময় যদি পানি কম খাওয়া হয়ে থাকে, তাহলে ঠান্ডা ঘরে এসেও মাথা ঘোরা কাটতে সময় লাগে।

 

তাই বাইরে থেকে এসে সঙ্গে সঙ্গে খুব ঠান্ডা বাতাসের সামনে বসা বা বরফঠান্ডা পানি বেশি করে পান করা ঠিক নয়। আগে ছায়ায় বা স্বাভাবিক তাপমাত্রার জায়গায় কয়েক মিনিট বসুন, ঘাম শুকাতে দিন, তারপর ধীরে ধীরে পানি বা ইলেক্ট্রোলাইটযুক্ত পানীয় পান করুন।

 

কখন বিষয়টি বিপজ্জনক

মাথা ঘোরা সব সময় গুরুতর নয়, কিন্তু কিছু লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। যদি মাথা ঘোরা সঙ্গে বিভ্রান্তি, কথা জড়িয়ে যাওয়া, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, শরীর খুব গরম হয়ে যাওয়া, ঘাম বন্ধ হয়ে যাওয়া, তীব্র বমি, শ্বাসকষ্ট, বুকব্যথা, খিঁচুনি বা এক ঘণ্টার বেশি দুর্বলতা থাকে, তাহলে এটি হিট স্ট্রোকের দিকে যেতে পারে। সিডিসি বলছে, হিট স্ট্রোক জরুরি চিকিৎসার বিষয়; এতে স্থায়ী অক্ষমতা বা মৃত্যুও হতে পারে।

 

শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, কিডনি রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, হাঁপানি বা দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের গরমে বেশি সতর্ক থাকা দরকার। মায়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, কিছু ওষুধ-যেমন ডাইইউরেটিক, বিটা ব্লকার, অ্যান্টিহিস্টামিন, ট্র্যাঙ্কুইলাইজার বা কিছু মানসিক রোগের ওষুধ-গরমে শরীরের প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।

 

কী খাবেন, কী পান করবেন

গরমে শরীর ভালো রাখতে সহজপাচ্য খাবার সবচেয়ে ভালো। অতিরিক্ত তেল-ঝাল, ভারী ভাজাপোড়া, অতিরিক্ত লবণ ও অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার কম খাওয়া উচিত। ঘরে রান্না করা ভাত, ডাল, মাছ, সবজি, শাক, পটোল, ঝিঙে, লাউ, করলা, কুমড়া, শসা, টমেটো-এ ধরনের পানি ও আঁশসমৃদ্ধ খাবার শরীরকে হালকা রাখে। দুপুরে খুব ভারী খাবার না খেয়ে পরিমিত খাবার খেলে হজমও সহজ হয়।

 

ডাবের পানি গরমে ভালো একটি পানীয়, কারণ এতে পানি ও কিছু ইলেক্ট্রোলাইট থাকে। তবে কিডনি রোগী, পটাশিয়াম নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয় এমন রোগী বা নির্দিষ্ট ওষুধ গ্রহণকারীদের নিয়মিত ডাবের পানি খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

 

লেবু পানি, ঘরে বানানো শরবত, ওআরএস, দইয়ের ঘোল, টকদই, ফলের স্মুদি, তরমুজ, বাঙ্গি, শসা, লেবু, পেয়ারা, কমলা-এসব গরমে উপকারী হতে পারে। তবে শরবতে অতিরিক্ত চিনি দেওয়া ঠিক নয়। অতিরিক্ত চিনি পেটের অস্বস্তি বাড়াতে পারে এবং ক্যালরি বাড়ায়।

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গরমে শরীর ঠান্ডা ও হাইড্রেটেড রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। বিশেষ করে শিশু, ৬০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তদের জন্য নিয়মিত পানি পান ও ঠান্ডা পরিবেশে থাকা জরুরি।

 

রোদ থেকে ফিরে কী করবেন

রোদ থেকে ফিরে প্রথমে ছায়াযুক্ত বা ঠান্ডা জায়গায় বসুন। ঢিলেঢালা পোশাক পরুন বা কাপড় আলগা করুন। মুখ, হাত-পা ধুয়ে নিন। শরীর খুব গরম লাগলে ভেজা কাপড় দিয়ে ঘাড়, বগল, কপাল ও কবজিতে ঠান্ডা সেঁক দিতে পারেন। এরপর ধীরে ধীরে পানি পান করুন। অনেক ঘাম হলে শুধু পানি নয়, ওআরএস বা হালকা লবণ-চিনির শরবতও উপকারী হতে পারে। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক জানায়, বেশি ঘাম বা বমি-ডায়রিয়ার মতো তরল ক্ষয়ের ক্ষেত্রে ইলেক্ট্রোলাইটযুক্ত পানীয় দিয়ে তরল পূরণ করা দরকার হতে পারে।

 

তবে একসঙ্গে অনেক পানি পান না করে অল্প অল্প করে পান করা ভালো। যদি বমি চলতে থাকে, অজ্ঞানভাব থাকে বা পানি খেলেও দুর্বলতা না কমে, চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

 

কোন পানীয় এড়িয়ে চলবেন

গরমে খুব বেশি চা-কফি, এনার্জি ড্রিংক, কোমল পানীয়, অতিরিক্ত চিনিযুক্ত জুস এবং অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা উচিত। এগুলো শরীরকে প্রয়োজনীয়ভাবে হাইড্রেটেড রাখে না, বরং কিছু ক্ষেত্রে ডিহাইড্রেশন বা পেটের অস্বস্তি বাড়াতে পারে। মায়ো ক্লিনিকও হিট এক্সহস্টশনে অ্যালকোহল এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়, কারণ এটি ডিহাইড্রেশন বাড়াতে পারে।

 

বাইরে বের হলে কী সতর্কতা

দুপুর ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত রোদ সবচেয়ে তীব্র থাকে। প্রয়োজন ছাড়া এই সময় বাইরে না যাওয়াই ভালো। যেতে হলে ছাতা, ক্যাপ বা টুপি ব্যবহার করুন, হালকা রঙের ঢিলেঢালা সুতি পোশাক পরুন, সঙ্গে পানির বোতল রাখুন। দীর্ঘক্ষণ হাঁটাহাঁটি বা বাইরে কাজ করতে হলে মাঝেমধ্যে ছায়ায় বিশ্রাম নিন। সিডিসি গরমে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে ঠান্ডা থাকা, পানি পান করা এবং লক্ষণ চিনে নেওয়ার পরামর্শ দেয়।

 

যারা বাইরে কাজ করেন-যেমন শ্রমিক, ডেলিভারি কর্মী, রিকশাচালক, ট্রাফিক পুলিশ, নির্মাণশ্রমিক-তাদের নিয়মিত পানি পান, বিরতি নেওয়া, ছায়ায় থাকা এবং মাথা ঢেকে রাখা জরুরি। শুধু তৃষ্ণা পেলেই পানি খাওয়ার অপেক্ষা করলে দেরি হয়ে যেতে পারে।

 

ঘরের ভেতরও সাবধান

গরমে শুধু বাইরে নয়, ঘরের ভেতরেও হিট স্ট্রেস হতে পারে-বিশেষ করে রান্নাঘর, টিনের ঘর, কম বাতাস চলাচল করে এমন ঘর বা দীর্ঘক্ষণ এসি ছাড়া ঘরে থাকলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গরমের সময় ঘর ঠান্ডা রাখা, ছায়ায় থাকা, শিশু বা প্রাণীকে পার্ক করা গাড়িতে না রাখা এবং প্রয়োজন হলে দিনের কিছু সময় শীতল স্থানে কাটানোর পরামর্শ দিয়েছে।

 

ঘরে জানালা-দরজা দিয়ে বাতাস চলাচল নিশ্চিত করুন। দিনের তীব্র রোদে পর্দা টেনে রাখুন। রাতে বাতাস ঠান্ডা হলে জানালা খুলে দিন। রান্নাঘরে দীর্ঘক্ষণ কাজ করলে মাঝেমধ্যে বিরতি নিন এবং পানি পান করুন।

 

গরমে রোদে বেরিয়ে মাথা ঘোরা সাধারণ ঘটনা মনে হলেও এটি কখনো কখনো শরীরের বিপদসংকেত। পানিশূন্যতা, লবণের ঘাটতি, রক্তচাপ কমে যাওয়া বা হিট এক্সহস্টশনের কারণে এমন হতে পারে। তাই গরমে শরীর ঠান্ডা রাখা, পর্যাপ্ত পানি ও ইলেক্ট্রোলাইট নেওয়া, সহজপাচ্য খাবার খাওয়া, তীব্র রোদ এড়িয়ে চলা এবং বিপজ্জনক লক্ষণ দেখলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

 

গরমকে অবহেলা নয়-সঠিক খাবার, পর্যাপ্ত পানি, বিশ্রাম ও সতর্কতাই পারে মাথা ঘোরা থেকে শুরু করে বড় ধরনের হিট স্ট্রেসের ঝুঁকি কমাতে।


সম্পর্কিত নিউজ