একটি টেস্ট, একটি ভ্যাকসিনেই জরায়ু ক্যানসার মুক্ত থাকুক প্রতিটি জীবন!

একটি টেস্ট, একটি ভ্যাকসিনেই জরায়ু ক্যানসার মুক্ত থাকুক প্রতিটি জীবন!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

জরায়ুর মুখের ক্যানসার এমন একটি রোগ, যা সময়মতো শনাক্ত হলে প্রায় পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য ও নিরাময়যোগ্য হলেও সচেতনতার অভাবে এখনো বহু নারী এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে দেরিতে ধরা পড়ায় ঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে।বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর ১৯ থেকে ২৫ জানুয়ারী, সময়টি জরায়ুর মুখের ক্যানসার নিয়ে সচেতনতা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচিত হয়। এই কয়েকটি দিন কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়,বরং লাখো নারীর জীবন রক্ষার সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত একটি বার্তাও বটে।

জরায়ুর মুখের ক্যানসার আসলে কী?

জরায়ুর মুখের ক্যানসার মূলত জরায়ুর নিচের অংশে, অর্থাৎ যেখান দিয়ে জরায়ু যোনির সঙ্গে যুক্ত সেই অংশে অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধির ফলে সৃষ্টি হয়। এই ক্যানসার ধীরে ধীরে বিকশিত হয়। প্রথম দিকে এটি কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই শরীরে বাসা বাঁধে, যা একে আরও বিপজ্জনক করে তোলে। অনেক নারী বছরের পর বছর বুঝতেই পারেন না যে শরীরে একটি গুরুতর পরিবর্তন ঘটছে।

কেন এই ক্যানসারকে নীরব ঘাতক বলা হয়?

জরায়ুর মুখের ক্যানসারের প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত তেমন কোনো ব্যথা বা দৃশ্যমান সমস্যা দেখা যায় না। এর ফলে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করালে এটি সহজে ধরা পড়ে না। যখন উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে, তখন অনেক ক্ষেত্রেই রোগটি তুলনামূলকভাবে অগ্রসর পর্যায়ে পৌঁছে যায়। এই নীরবতাই এই ক্যানসারকে ভয়ংকর করে তুলেছে।

প্রধান কারণ কি?

চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী, জরায়ুর মুখের ক্যানসারের প্রধান কারণ হলো হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) সংক্রমণ। এই ভাইরাসটি অত্যন্ত সাধারণ এবং এটি যৌনসম্পর্কের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শরীরের প্রতিরোধক্ষমতা নিজে থেকেই এই ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণে এনে ফেলে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে ভাইরাসটি দীর্ঘদিন শরীরে থেকে গিয়ে কোষে পরিবর্তন ঘটায়, যা ধীরে ধীরে ক্যানসারে রূপ নিতে পারে।

ঝুঁকি বাড়ায় যেসব বিষয়:

সব নারীই এই ক্যানসারের ঝুঁকিতে থাকলেও কিছু কিছু বিষয় ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দেয়। অল্প বয়সে বিয়ে ও সন্তান ধারণ, একাধিকবার গর্ভধারণ, দীর্ঘদিন ধরে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি ব্যবহার, ধূমপান, দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করা  বিষয়গুলো জরায়ুর মুখের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এছাড়া স্বাস্থ্য সম্পর্কে সামাজিক সংকোচ ও ভুল ধারণাও বড় একটি কারণ।

উপসর্গ যেগুলো অবহেলা করা উচিত নয়:

যদিও প্রাথমিক পর্যায়ে উপসর্গ থাকে না, তবে কিছু লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। অস্বাভাবিক যোনিপথে রক্তপাত, মাসিকের বাইরে বা সহবাসের পর রক্তপাত, দীর্ঘদিন ধরে সাদা স্রাবের পরিমাণ ও গন্ধের পরিবর্তন, তলপেটে ব্যথা বা অস্বস্তি এসব লক্ষণ কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়। এসব উপসর্গ মানেই যে ক্যানসারতা নয় ঠিকই, তবে পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিত হওয়াও প্রায় অসম্ভব।

কেন নিয়মিত স্ক্রিনিং গুরুত্বপূর্ণ?

জরায়ুর মুখের ক্যানসারের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো এটি আগেই শনাক্ত করা সম্ভব। নিয়মিত স্ক্রিনিং পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যানসার হওয়ার আগের অস্বাভাবিক কোষ পরিবর্তন ধরা পড়ে। তখনই চিকিৎসা শুরু করলে ক্যানসার হওয়ার আগেই ঝুঁকি দূর করা যায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটিই এই রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচিত।

ভবিষ্যৎ সুরক্ষার শক্তিশালী হাতিয়ার:

এইচপিভি সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য বর্তমানে টিকা ব্যবহৃত হচ্ছে, যা জরায়ুর মুখের ক্যানসার প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে যৌনজীবন শুরু হওয়ার আগেই এই টিকা নেওয়া সবচেয়ে বেশি উপকারি বলে বিবেচিত হয়। তবে নির্দিষ্ট বয়সের পরেও টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে জরায়ুর মুখের ক্যানসার নারীদের মধ্যে অন্যতম সাধারণ ক্যানসারগুলোর একটি। তবে দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, এ বিষয়ে সচেতনতার মাত্রা এখনো পর্যাপ্ত নয়। অনেক নারী সামাজিক সংকোচ, ভয় বা ভুল ধারণার কারণে পরীক্ষা করাতে আগ্রহী হন না। গ্রামাঞ্চলে এই সমস্যাটি আরও অধিক প্রকট, যেখানে স্বাস্থ্যসেবা ও তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ সীমিত।

১৯-২৫ জানুয়ারির এই সময়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

১৯ থেকে ২৫ জানুয়ারি সময়টি জরায়ুর মুখের ক্যানসার নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই সময় বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা নারীদের জানাতে চেষ্টা করে এই ক্যানসার প্রতিরোধযোগ্য, এটি লজ্জার বিষয় নয়, বরং সচেতনতার বিষয়। নিয়মিত পরীক্ষা ও সঠিক তথ্যই পারে এই রোগের ভয় কমাতে। এই সচেতনতা সপ্তাহের মূল লক্ষ্য হলো ভয় দূর করা, ভুল ধারণা দূর করা এবং নারীদের নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন হতে উৎসাহিত করা। কারণ নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার প্রত্যেক নারীরই রয়েছে।

পরিবার ও সমাজের ভূমিকা:

জরায়ুর মুখের ক্যানসার প্রতিরোধ শুধু একজন নারীর একার দায়িত্ব নয়। পরিবার, স্বামী ও সমাজের সমর্থন এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নারীরা যেন পরীক্ষা করাতে ভয় না পান, লজ্জা না বোধ করেন সেই পরিবেশ তৈরি করাটাও জরুরি। স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এই রোগ প্রতিরোধের একটি বড় হাতিয়ার।

কর্মজীবী নারীদের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ:

কর্মজীবী নারীরা সময়ের অভাবে অনেক সময় নিজের স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিতে পারেন না। কিন্তু গবেষণা বলছে, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা দীর্ঘমেয়াদে কর্মক্ষমতা ও জীবনমান উন্নত করে। তাই ব্যস্ততার মাঝেও নিজের জন্য সময় বের করা জরুরি।

ক্যানসার মানেই মৃত্যু,এই ধারণা ভুল!

জরায়ুর মুখের ক্যানসার নিয়ে সবচেয়ে ক্ষতিকর ধারণা হলো, ক্যানসার মানেই মৃত্যু। বাস্তবতা কিন্তু  ভিন্ন কিছু বলে। এই ক্যানসার যদি প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়ে, তাহলে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ জীবনযাপন সম্ভব। সমস্যাটি মূলত দেরিতে শনাক্ত হওয়া নিয়ে, রোগটির নিরাময়ের অযোগ্যতা নিয়ে নয়।

সচেতনতা কেন এখন আরও জরুরি?

বর্তমান সময়ে নারীদের গড় আয়ু বাড়ছে, জীবনধারা বদলাচ্ছে। এর সঙ্গে সঙ্গে কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে জরায়ুর মুখের ক্যানসার নিয়ে সচেতনতা এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি একটি প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য জ্ঞান। সময়মতো তথ্য ও সঠিক সিদ্ধান্তই পারে জীবন রক্ষা করতে।

লজ্জা, ভয় বা ভুল ধারণা নয়, সঠিক তথ্য, নিয়মিত পরীক্ষা এবং সচেতন সিদ্ধান্তই হতে পারে সবচেয়ে বড় সুরক্ষা। নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন হওয়া মানে নিজের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা। জরায়ুর মুখের ক্যানসার নিয়ে কথা বলা, জানা এবং অন্যকে জানানো বাঁচাতে পারে অসংখ্য নারীর জীবন। এই সচেতনতা যদি শুধু একটি সপ্তাহেই সীমাবদ্ধ না থেকে সারাবছরের অভ্যাসে পরিণত হয়, তাহলেই এই রোগের বিরুদ্ধে সত্যিকারের জয় সম্ভব।

সম্পর্কিত নিউজ