সাবধান! জ্বর-ঠুসা কি অন্য রোগ ডেকে আনছে? বিস্তারিত জানুন

সাবধান! জ্বর-ঠুসা কি অন্য রোগ ডেকে আনছে? বিস্তারিত জানুন
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

হঠাৎ শরীর গরম হয়ে যাওয়া, মাথা ঝিমুনি, গা ব্যথা! এসবের সঙ্গে যদি ঠুসা বা কাঁপুনি যোগ হয়, তখন অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। বাস্তবে জ্বরের সঙ্গে ঠুসা হওয়ার পেছনে রয়েছে বিভিন্ন শারীরিক কারণ। বিষয়টি ভালোভাবে বোঝা গেলে, কখন ঘরে বসে যত্ন যথেষ্ট আর কখন চিকিৎসা জরুরি, তা নির্ধারণ করাও কিছুটা সহজ হয়ে যায়।

জ্বর-ঠুসা আসলে কী?

জ্বর ঠোসা ও জ্বর দুটি ভিন্ন ভিন্ন জিনিস। জ্বরের কারণে জ্বর ঠোসা হয় না। জ্বর ঠোসা হয় হার্পিস সিমপ্লেক্স নামক ভাইরাসের সংক্রমণে। শরীরে একবার কোনোভাবে এই ভাইরাস ঢুকলে সেটি সারাজীবন শরীরে থেকে যায়। বেশিরভাগ সময়ে ভাইরাস শরীরে চুপচাপ বসে থাকে। তবে মাঝেমাঝে জেগে উঠে জ্বর ঠোসা তৈরি করে। 

জ্বর ঠোসা কিভাবে ছড়ায়?

জ্বর ঠোসা বিভিন্নভাবে ছড়াতে পারে। যেমন-

☞ জ্বর ঠোসায় আক্রান্ত ব্যক্তির মুখ কিংবা মুখের লালার সংস্পর্শে গেলে জ্বর ঠোসা ছড়াতে পারে।

☞ জ্বর ঠোসা স্পর্শ করে সেই হাত অন্য কারও মুখের সংস্পর্শে নিলে জ্বর ঠোসা ছড়াতে পারে।

☞ জ্বর ঠোসায় আক্রান্ত ব্যক্তির মুখ কারও যৌনাঙ্গের সংস্পর্শে আসলে যৌনাঙ্গে ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়তে পারে।


শরীরে যদি একবার জ্বর ঠোসার ভাইরাস প্রবেশ করে, সেটি সারাজীবন থেকে যায়। বেশিরভাগ সময়ে ভাইরাস শরীরে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকে, তবে মাঝেমাঝে জেগে উঠে এবং জ্বর ঠোসা তৈরি করে। একারণে অনেকের বারবার জ্বর ঠোসা হয়। ভাইরাস জেগে ওঠার অন্যতম কারণ হলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়া। যেমন: ঠাণ্ডা লাগা অথবা জ্বর আসা। তবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়া। এছাড়াও ভাইরাস জেগে উঠে জ্বর ঠোসা উঠার আরও কিছু কারণ রয়েছে । যেমন: কোনো কারণে অসুস্থ হলে, খুব ক্লান্ত থাকলে, মানসিক চাপে থাকলে, রোদে গেলে ও মেয়েদের মাসিকের সময়ে।

 সতর্কতা:

আমাদের চোখের সামনে থাকে কর্নিয়া নামের একটি স্বচ্ছ আবরণ,যা আমাদের চোখের জানালা হিসেবে কাজ করে। এই কর্নিয়ার সমস্যার কারণে পৃথিবীতে যত মানুষ অন্ধ হয়ে যায়, তার মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত কারণটি  হলো জ্বর ঠোসার হার্পিস ভাইরাসের ইনফেকশন। অর্থাৎ মুখের জ্বর ঠোসা থেকে ভাইরাসটা যদি চোখে চলে যায়, তাহলে এই মারাত্মক বিপত্তি ঘটার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়।

তবে চোখে হার্পিস ইনফেকশন হলেই যে মানুষ অন্ধ হয়ে যাবে, তা নয়। অনেকেরই এই ইনফেকশন হয় আবার সেরেও যায়। তবে অল্প সংখ্যক মানুষের ক্ষেত্রে এটা চোখের জটিল ইনফেকশনে রূপ নিতে পারে। তাই সতর্ক থাকাই শ্রেয়। জ্বর ঠোসা থেকে অন্ধত্ব হওয়া প্রতিরোধে চারটি পরামর্শ -

১। জ্বর ঠোসায় হাত লাগাবেন না।

২। জ্বর ঠোসায় হাত চলে গেলে ভালো করে সাবান পানি দিয়ে হাত ধুয়ে নিবেন।

৩। জ্বর ঠোসা থাকা অবস্থায় চোখে হাত লাগাবেন না।

৪। কোনো কারণে চোখে হাত দিতে হলে আগে ভালো করে হাত সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে নিবেন।


জ্বর ঠোসা হলে কী করা উচিত?

সাধারণত জ্বর ঠোসা নিজে নিজেই সেরে যায়। সেরে যাওয়ার পরে সাধারণত কোনো দাগও থাকে না। তবে লক্ষণ উপশমে কিছু কার্যকর পরামর্শ মেনে চলা যেতে পারে-

⇨ জ্বর ঠোসা হবে বুঝতে পারার সাথে সাথেই অ্যান্টিভাইরাল ক্রিম লাগানো যেতে পারে। এটা জ্বর ঠোসা দ্রুত সারিয়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে। ক্রিম জ্বর ঠোসায় ঘষে ঘষে না লাগিয়ে আঙ্গুল দিয়ে আলতো করে চেপে চেপে লাগাতে হবে। ক্রিম লাগানোর আগে ও পরে ভালো করে সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধুয়ে নিবেন। 

⇨ কিছু গবেষণায় জ্বর ঠোসা সারাতে অ্যান্টিভাইরাল ক্রিমের পরিবর্তে মেডিকেল গ্রেড কানুকা মধু ব্যবহার করে দেখা গিয়েছে যে, মধু অ্যান্টিভাইরাল ক্রিমের মতোই কার্যকর। জ্বর ঠোসা হবে বুঝতে পারার সাথে সাথেই সেখানে মধু লাগাবেন। দিনে পাঁচ বার করে জ্বর ঠোসা পুরোপুরি সেরে ওঠা পর্যন্ত এভাবে ব্যবহার করবেন।

⇨ জ্বর ঠোসার ব্যথা কমানোর কয়েকটা উপায় আছে। জ্বর ঠোসার ওপরে বরফ লাগাতে পারেন।এ ছাড়া বরফের ছোটো ছোটো টুকরা চুষতে পারেন। এসবের মাধ্যমে ব্যথা কমার পাশাপাশি জ্বালাপোড়া ও চুলকানিও কমতে পারে। দিনে কয়েকবার ঠাণ্ডা সেঁক দিতে পারেন। একটা পরিষ্কার ছোটো তোয়ালে ঠাণ্ডা পানিতে ভিজিয়ে ৫–১০ মিনিট জ্বর ঠোসার ওপরে দিয়ে রাখুন। এটি জ্বালাপোড়া ও লালচে ভাব কমাতে সাহায্য করতে পারে। জ্বর ঠোসার ব্যথা কমাতে লিডোকেইন জাতীয় জেল অথবা মলম ব্যবহার করতে পারেন। ব্যথা, জ্বর ও ফোলা কমাতে প্যারাসিটামল অথবা আইবুপ্রোফেন খেতে পারেন। শিশুদের প্যারাসিটামল সিরাপ খাওয়াতে পারেন।

⇨ জ্বর ঠোসা হলে ব্যথার কারণে অনেকেই খাবার ও পানি খাওয়া কমিয়ে দেয়। একারণে পানিশূন্যতা দেখা দেয়। কিন্তু পর্যাপ্ত পানি পান করাটা সেসময় বেশি জরুরি।

⇨ ত্বক শুষ্ক হয়ে ফেটে যাওয়া এড়াতে জ্বর ঠোসার ওপরে ও এর আশেপাশের ত্বকে আলতো করে পেট্রোলিয়াম জেলি লাগাবেন। তবে আগে ও পরে অবশ্যই সাবান-পানি দিয়ে ভালোমতো হাত ধুয়ে নেয়াটা জরুরি।

⇨ রোদে বের হলে সানস্ক্রিন, বিশেষ করে ঠোঁটে সানব্লক লিপ বাম(এসপিএফ ১৫ বা তার বেশি শক্তির) ব্যবহার করবেন।

⇨ যেসব কাজ জ্বর ঠোসার ভাইরাসকে জাগিয়ে দিতে পারে সেগুলো এড়িয়ে চলবেন। যেমন: রোদ, মানসিক চাপ ও অতিরিক্ত ক্লান্তি। এতে পরবর্তীতে জ্বর ঠোসা হওয়ার সম্ভাবনা কমতে পারে।


যা করবেন না!

⇨ জ্বর ঠোসা হাত দিয়ে স্পর্শ করবেন না। ঔষধ লাগানোর সময়ে বা কোনো কারণে স্পর্শ করতে হলে তার আগে ও পরে অবশ্যই সাবান ও পানি দিয়ে ভালোমতো হাত ধুয়ে ফেলবেন। 

⇨আক্রান্ত অবস্থায় কাউকে চুমু দিবেন না। বিশেষ করে ছোটো শিশুদের চুমু দেওয়া থেকে একেবারেই বিরত থাকবেন।

⇨ জ্বর ঠোসা থাকা অবস্থায় আপনার খাবার অথবা পানি আরেকজনের সাথে শেয়ার করবেন না।

⇨ জ্বর ঠোসায় ছোঁয়া লাগে এমন জিনিসপত্র। যেমন: আপনার ব্যবহার করা চামচ, গ্লাস, তোয়ালে, লিপজেল ও লিপস্টিক, রেজার ইত্যাদি আলাদা রাখবেন। অন্য কেউ যেন ব্যবহার না করে সেই বিষয়ে সতর্ক থাকবেন।

⇨ জ্বর ঠোসা থাকলেও সহবাস করা যাবে। তবে জ্বর ঠোসা পুরোপুরি সেরে ওঠার আগ পর্যন্ত ওরাল সেক্স বা যৌনাঙ্গে মুখ স্পর্শ করা থেকে একেবারে বিরত থাকবেন। নাহলে আপনার সঙ্গীর যৌনাঙ্গে হার্পিস ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়তে পারে।

⇨ জ্বর ঠোসা থাকা অবস্থায় চোখে হাত লাগাবেন না। কোনো কারণে চোখে হাত দিতে হলে আগে ভালো করে হাত সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে নিবেন।

⇨ কারও কারও ক্ষেত্রে কিছু খাবার জ্বর ঠোসার সংস্পর্শে আসলে জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে। যেমন: টমেটো, কমলা, মাল্টা, জাম্বুরা, অতিরিক্ত মসলাদার ও লবণযুক্ত খাবার। আপনার এমন সমস্যা হলে এসব খাবার এড়িয়ে চলতে পারেন। 

⇨ জরুরি প্রয়োজন না হলে জ্বর ঠোসা পুরোপুরি সেরে ওঠার আগ পর্যন্ত দাঁতের কোনো প্রসিডিউর না করানোই ভালো।


কখন ডাক্তারের কাছে যেতে হবে:

⇨ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হলে। যেমন: গর্ভবতী নারী, ডায়াবেটিস বা ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তি, কেমোথেরাপি নিচ্ছেন কিংবা স্টেরয়েড জাতীয় ঔষধ খাচ্ছেন এমন রোগী। 

⇨ চোখের কাছাকাছি স্থানে জ্বর ঠোসা হলে।

⇨ মুখের ভেতরে ঘা হলে এবং মাড়ি ফুলে গিয়ে ব্যথা হলে।

⇨ অনেকখানি জায়গা জুড়ে জ্বর ঠোসা হলে কিংবা ঠোসা ছড়িয়ে পড়লে।

⇨ খুব বেশি ব্যথা হলে, খাওয়াদাওয়ায় অনেক সমস্যা হলে অথবা জ্বর না কমলে।

⇨ জ্বর ঠোসা শরীরের অন্য কোথাও যেমন হাতে অথবা যৌনাঙ্গে ছড়িয়ে পড়লে।

⇨ ১০ দিন পরেও জ্বর ঠোসা সেরে উঠতে শুরু না করলে।

⇨ কিছুদিন পরপরই (যেমন: বছরে ছয় বারের বেশি) জ্বর ঠোসা হলে।

কিছু ক্ষেত্রে ডাক্তার আপনাকে অ্যান্টিভাইরাল ট্যাবলেট সেবনের পরামর্শ দিতে পারেন।গর্ভবতী নারী, নবজাতক শিশু ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল কিংবা গুরুতর জ্বর ঠোসা হয়েছে এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে হাসপাতালে চিকিৎসা উত্তম।
 

সম্পর্কিত নিউজ