{{ news.section.title }}
হাঁচি দিলে হৃদপিণ্ড এক মুহূর্ত থেমে যায়! - সত্য নাকি মিথ?
মানুষের শরীর নিয়ে প্রচলিত অসংখ্য রহস্যময় গল্পের মধ্যে একটি হলো, "হাঁচি দিলে হৃদপিণ্ড এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়।" অনেকেই একে সত্য বলে বিশ্বাস করেন। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং মানব শরীরের শারীরবৃত্তীয় বিশ্লেষণ কি এই দাবিকে সমর্থন করে? আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদনে আমরা উন্মোচন করব হাঁচি এবং হৃদস্পন্দনের মধ্যকার সেই বৈজ্ঞানিক সত্য, যা আপনার প্রচলিত ধারণা বদলে দেবে।
হাঁচি আসলে আমাদের শরীরের একটি অনৈচ্ছিক এবং অত্যন্ত শক্তিশালী সুরক্ষা কবচ। যখন আমাদের নাকের ভেতরে কোনো ধূলিকণা, পরাগরেণু বা অন্য কোনো ক্ষতিকর উপাদান প্রবেশ করে, তখন নাকের সংবেদনশীল স্নায়ুগুলো মস্তিষ্কে একটি জরুরি সংকেত পাঠায়। মস্তিষ্ক তখন ফুসফুস, বুক এবং গলার পেশিগুলোকে একযোগে কাজ করার নির্দেশ দেয় যাতে প্রচণ্ড বেগে বাতাসের মাধ্যমে সেই বহিরাগত বস্তুকে বের করে দেওয়া যায়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি এতই দ্রুত ঘটে যে এর প্রভাব শরীরের অন্যান্য অঙ্গের ওপরও পড়ে।
হৃদপিণ্ড কি সত্যিই থেমে যায়?
সরাসরি উত্তর হলো- না, হাঁচি দিলে হৃদপিণ্ড কখনোই থেমে যায় না। এটি একটি বহুল প্রচলিত একটি মিথ। তবে হাঁচি দেওয়ার সময় হৃদপিণ্ডের গতির বা ছন্দের মধ্যে একটি সাময়িক পরিবর্তন ঘটে, যা আমাদের মনে এমন ভ্রম তৈরি করতে পারে।
হাঁচি দেওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে আমরা গভীরভাবে শ্বাস গ্রহণ করি। এতে বুকের খাঁচার ভেতরে বাতাসের চাপ বা ইন্ট্রাথোরাসিক প্রেশার হঠাৎ করে বহুগুণ বেড়ে যায়। এই বাড়তি চাপ রক্ত চলাচলের ওপর প্রভাব ফেলে।
বুকের ভেতর চাপ বাড়লে তা শরীরের অন্যতম প্রধান স্নায়ু ভেগাস নার্ভকে উদ্দীপিত করে। এই স্নায়ুটি সরাসরি হৃদপিণ্ডের গতি নিয়ন্ত্রণ করে। ভেগাস নার্ভ সক্রিয় হলে হৃদপিণ্ড তার স্বাভাবিক স্পন্দনের গতি কিছুটা কমিয়ে দেয়।
হাঁচির সময় প্রচণ্ড চাপে হৃদপিণ্ডে ফিরে আসা রক্তের প্রবাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটে। এর ফলে পরবর্তী হৃদস্পন্দনটি স্বাভাবিকের চেয়ে সামান্য বিলম্বিত হতে পারে অথবা স্পন্দনের তীব্রতা বেড়ে যেতে পারে। এই অতি সামান্য বিলম্ব বা ছন্দের পরিবর্তনকেই অনেকে হৃদপিণ্ড থেমে যাওয়া বলে ভুল করেন। প্রকৃতপক্ষে, হৃদপিণ্ড তার বৈদ্যুতিক সংকেত অনুযায়ী কাজ চালিয়ে যায়, শুধু তার গতিতে একটি ক্ষুদ্র বিচ্যুতি ঘটে।
কেন আমরা হাঁচি দিলে চোখ বন্ধ করি?
হাঁচির সাথে হৃদপিণ্ডের সরাসরি বিরতির সম্পর্ক না থাকলেও চোখের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। হাঁচি দেওয়ার সময় আমরা চাইলেও চোখ খোলা রাখতে পারি না। এটি একটি স্বয়ংক্রিয় রিফ্লেক্স অ্যাকশন। অনেকে মনে করেন চোখ খোলা রাখলে তা কোটর থেকে বেরিয়ে আসবে, যা সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক। আসলে হাঁচির সময় মুখ ও চোখের চারপাশের পেশিগুলো সংকুচিত হয় বলেই চোখ বন্ধ হয়ে যায়।
সতর্কতা:
হাঁচি দিলে হৃদপিণ্ড থামে না ঠিকই, কিন্তু আপনি যদি জোর করেই হাঁচি আটকে রাখার চেষ্টা করেন, তবে তা আপনার শরীরের জন্য মারাত্মক হতে পারে। হাঁচির বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ১৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এই প্রচণ্ড চাপ যদি বাইরে বের হতে না পারে, তবে তা কানের পর্দা ফাটিয়ে দিতে পারে। এছাড়া চোখের সূক্ষ্ম রক্তনালী ছিঁড়ে ফেলতে পারে। এমনকি মস্তিষ্কের ধমনীতেও আঘাত করতে পারে। তাই হাঁচি এলে তাকে স্বাভাবিকভাবে বের হতে দেওয়াই নিরাপদ।
হাঁচি আমাদের শ্বাসতন্ত্রকে পরিষ্কার রেখে সুস্থ থাকতে সাহায্য করে। হৃদপিণ্ড থমকে যাওয়ার বিষয়টি কেবল একটি অলৌকিক ধারণা মাত্র। তবে হাঁচি দেওয়ার সময় হৃদস্পন্দনের যে সামান্য পরিবর্তন ঘটে, তা প্রমাণ করে মানব শরীরের প্রতিটি অঙ্গ কত গভীরভাবে একে অপরের সাথে যুক্ত। তাই পরের বার যখন কেউ বলবেন হাঁচি দিলে জীবন এক পলক থমকে যায়, তখন আপনি তাকে বিজ্ঞানের এই সঠিক ব্যাখ্যাটি দিয়ে আশ্বস্ত করতে পারেন।