প্রচণ্ড গরমে যে কারণে অচেতন হয়ে পড়তে পারেন

প্রচণ্ড গরমে যে কারণে  অচেতন হয়ে পড়তে পারেন
ছবির ক্যাপশান, প্রচণ্ড গরমে যে কারণে অচেতন হয়ে পড়তে পারেন

প্রচণ্ড গরমে হঠাৎ অচেতন বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মূল কারণ হলো মস্তিষ্কে রক্ত ও অক্সিজেনের সাময়িক ঘাটতি এবং শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় গরমের কারণে এভাবে অচেতন হয়ে পড়াকে হিট সিনকোপ (Heat Syncope) বা তীব্রতর ক্ষেত্রে হিট স্ট্রোক (Heat Stroke) বলা হয়।

প্রচণ্ড গরমে শরীর অতিরিক্ত উত্তপ্ত হলে শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (ঘাম, রক্তপ্রবাহ) চাপের মুখে পড়ে, যার ফলে পানিশূন্যতা, হিট স্ট্রোক, তীব্র রক্তচাপ কমে যাওয়া (হিট সিনকোপ) বা হিট এক্সহস্টশনের কারণে মানুষ অচেতন হয়ে পড়তে পারে। অতিরিক্ত ঘামের ফলে শরীর থেকে পানি ও লবণ বেরিয়ে গেলে মাথা ঘোরা, দুর্বলতা ও দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে জ্ঞান হারানো পরিস্থিতি তৈরি হয়। 

প্রচণ্ড গরমে অচেতন হওয়ার প্রধান কারণসমূহ:

১. পানিশূন্যতা ও রক্তচাপ কমে যাওয়া (Dehydration & Low Blood Pressure) 

  • অতিরিক্ত গরমে শরীরকে ঠান্ডা রাখতে অনবরত ঘাম হতে থাকে.

  • ঘামের সাথে শরীর থেকে প্রচুর পানি এবং প্রয়োজনীয় লবণ-খনিজ (ইলেক্ট্রোলাইট) বেরিয়ে যায়.

  • শরীরে পর্যাপ্ত তরলের ঘাটতি হলে রক্তচাপ (Blood Pressure) হঠাৎ কমে যায়.

  • রক্তচাপ কমলে মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন সাময়িকভাবে হ্রাস পায় এবং মানুষ অচেতন হয়ে পড়ে.

২. রক্তনালীর প্রসারণ (Vasodilation)

  • তীব্র গরমে শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা কমাতে ত্বক সংলগ্ন রক্তনালীগুলো প্রসারিত হয়ে যায়.

  • এর ফলে শরীরের রক্তপ্রবাহের একটি বড় অংশ ত্বকের দিকে ধাবিত হয়.

  • ফলস্বরূপ, হৃৎপিণ্ডে রক্ত ফিরে আসার পরিমাণ কমে যায় এবং মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছায় না. 

৩. হিট স্ট্রোক বা তাপঘাত (Heat Stroke) 

  • এটি গরমজনিত সবচেয়ে বিপজ্জনক ও জরুরি অবস্থা.

  • যখন শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়ে এবং শরীরের তাপমাত্রা ১০৪° ফারেনহাইট (৪০° সেলসিয়াস) ছাড়িয়ে যায়, তখন হিট স্ট্রোক হয়.

  • এই অবস্থায় ঘাম হওয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যার ফলে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র বা মস্তিষ্ক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং মানুষ দ্রুত অচেতন বা কোমায় চলে যায়. 

৪. দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা (Prolonged Standing) 

  • গরমে একটানা দীর্ঘক্ষণ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে অভিকর্ষজ টানের কারণে রক্ত পায়ের দিকে জমা হয়.

  • একে 'অর্থোস্ট্যাটিক পুলিং' বলা হয়, যা মস্তিষ্কে রক্ত চলাচলের গতি কমিয়ে দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে অজ্ঞান করে ফেলে.

৫. তীব্র শারীরিক পরিশ্রম (Strenuous Physical Exertion) 

  • কড়া রোদে বা ভ্যাপসা গরমে ভারী কাজ, ব্যায়াম কিংবা রিকশা বা গাড়ি চালালে মাংসপেশিতে অতিরিক্ত তাপ উৎপন্ন হয়.

  • এটি হৃৎপিণ্ডের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে শরীর রক্ত সঞ্চালনের ভারসাম্য ধরে রাখতে না পেরে জ্ঞান হারায়.

অচেতন হওয়ার পূর্ববর্তী সতর্ক সংকেত

সাধারণত আচমকা পুরোপুরি জ্ঞান হারানোর কয়েক মিনিট আগে শরীর কিছু লক্ষণ বা সংকেত দেয়:

  • তীব্র মাথাব্যথা এবং মাথা ঘোরা

  • চোখে অন্ধকার বা ঝাপসা দেখা

  • অতিরিক্ত ক্লান্তি, দুর্বলতা এবং বমি বমি ভাব

  • বুক ধড়ফড় করা এবং শরীর ঠান্ডা ও চটচটে হয়ে যাওয়া 

তাৎক্ষণিক করণীয় (First Aid)

কেউ গরমে অচেতন হয়ে পড়লে অবহেলা না করে দ্রুত এই পদক্ষেপগুলো নিন:

  1. ছায়াযুক্ত স্থানে নেওয়া: আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত রোদ থেকে সরিয়ে বাতাস চলাচল করে এমন শীতল স্থানে বা এসি রুমে নিয়ে যান.

  2. পা উঁচু করে শোয়ানো: রোগীকে চিত করে শুইয়ে দিন এবং পায়ের নিচে বালিশ বা কিছু দিয়ে পা দুটিকে হার্টের লেভেল থেকে কিছুটা ওপরে তুলে রাখুন (এতে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ দ্রুত বাড়ে).

  3. কাপড় ঢিলে করা: শরীরের আঁটসাঁট পোশাক ঢিলে করে দিন বা অতিরিক্ত কাপড় খুলে ফেলুন.

  4. শরীর ঠান্ডা করা: ঠান্ডা পানি বা বরফ-পানি দিয়ে পুরো শরীর মুছে দিন। বিশেষ করে ঘাড়, বগল ও কুচকিতে ভেজা কাপড় বা আইস প্যাক দিন.

  5. পানি পান করানো: রোগীর জ্ঞান ফিরলে তাকে ধীরে ধীরে খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি বা সাধারণ পানি পান করান (অচেতন অবস্থায় মুখে কিছু ঢালবেন না). 

যদি রোগীর তাপমাত্রা কমতে না চায়, খিঁচুনি হয় বা দীর্ঘ সময় অচেতন থাকে, তবে তাকে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে. 


সম্পর্কিত নিউজ