ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও লিভারের যত্নে উপকারী জাম

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও লিভারের যত্নে উপকারী জাম
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

বর্তমানে বিশ্বে প্রতি চারজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের একজন কোনো না কোনো মাত্রায় ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। বাংলাদেশেও এই রোগ দ্রুত বাড়ছে। একসময় অতিরিক্ত ওজন বা মদ্যপানের সঙ্গে লিভারের সমস্যা বেশি সম্পর্কিত থাকলেও এখন স্বাভাবিক ওজনের তরুণ-তরুণীদের মধ্যেও নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (এনএএফএলডি) উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ, কোমল পানীয়, ফাস্টফুড, কম শারীরিক পরিশ্রম এবং পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এই সমস্যার অন্যতম কারণ। এমন পরিস্থিতিতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ ফল হিসেবে জাম নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।

 

লিভারের জন্য কেন উপকারী?

গবেষণায় দেখা গেছে, জামে রয়েছে অ্যান্থোসায়ানিন, ফ্ল্যাভোনয়েড, পলিফেনলসহ বিভিন্ন শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এসব উপাদান শরীরে তৈরি হওয়া ক্ষতিকর ফ্রি-র‍্যাডিক্যাল কমাতে সাহায্য করে। ফ্রি-র‍্যাডিক্যালের আধিক্য লিভারের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত ও পরিমিত পরিমাণে জাম খেলে লিভারের প্রদাহ কমতে পারে, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস হ্রাস পেতে পারে এবং লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমার ঝুঁকি কমতে পারে। তবে চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলেছেন, জাম কোনোভাবেই লিভারের ওষুধের বিকল্প নয়; এটি কেবল স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের একটি সহায়ক উপাদান।

 

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে জামের ভূমিকা

দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দীর্ঘদিন ধরেই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে জামের ব্যবহার হয়ে আসছে। গবেষণায় দেখা গেছে, জামের ফল, খোসা ও বিচিতে এমন কিছু উপাদান রয়েছে, যা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। জামের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স তুলনামূলক কম হওয়ায় এটি রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দ্রুত বাড়ায় না। কিছু গবেষক মনে করেন, জামে থাকা জ্যাম্বোলিন ও জ্যাম্বোসিন নামের যৌগ কার্বোহাইড্রেট ভাঙার গতি ধীর করতে সাহায্য করতে পারে। ফলে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এটি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও উপকারী ফল হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

হৃদযন্ত্রের জন্যও উপকারী

হৃদরোগ বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। পুষ্টিবিদদের মতে, জামে থাকা পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হৃদযন্ত্রের সুস্থতা রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে জাম খেলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে, রক্তনালির কার্যকারিতা উন্নত হতে পারে এবং ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করতে পারে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রেও এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

 

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে

জামে রয়েছে ভিটামিন সি, আয়রন, ক্যালসিয়াম এবং বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিজ্জ রাসায়নিক উপাদান। এসব উপাদান শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করতে সাহায্য করে। চিকিৎসকদের মতে, মৌসুমি সংক্রমণ, ভাইরাল জ্বর এবং অন্যান্য সাধারণ অসুস্থতার বিরুদ্ধে শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধব্যবস্থা উন্নত রাখতে ফলমূলসমৃদ্ধ খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সেই বিবেচনায় জাম একটি উপকারী মৌসুমি ফল।

 

অন্ত্র ও হজমশক্তির জন্য ভালো

জামে থাকা আঁশ বা ফাইবার হজমপ্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। এটি অন্ত্রের কার্যক্রম উন্নত করে এবং উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে। নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে জাম খেলে হজমশক্তি উন্নত হওয়ার পাশাপাশি বিপাকক্রিয়াও ভালো থাকতে পারে। তবে অতিরিক্ত জাম খেলে উল্টো কোষ্ঠকাঠিন্য বা পেটের অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।

 

ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক

কম ক্যালরি এবং উচ্চমাত্রার ফাইবারসমৃদ্ধ হওয়ায় জাম ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হয়। এতে পানির পরিমাণও বেশি থাকে, যা দীর্ঘসময় পেট ভরা অনুভূতি দিতে সাহায্য করে। ফলে অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমতে পারে। যারা স্বাস্থ্যকর উপায়ে ওজন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন, তাদের জন্য জাম একটি ভালো মৌসুমি বিকল্প হতে পারে।

 

ত্বকের জন্য সম্ভাব্য উপকারিতা

অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ হওয়ায় জাম ত্বকের জন্যও উপকারী বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এটি ত্বকের কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করতে পারে। পাশাপাশি বয়সজনিত কিছু পরিবর্তনের গতি ধীর করার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে। যদিও এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

 

কীভাবে খাবেন?

পুষ্টিবিদদের মতে, টাটকা জাম ধুয়ে সরাসরি খাওয়াই সবচেয়ে ভালো। এছাড়া ফলের সালাদ, স্মুদি কিংবা দইয়ের সঙ্গে মিশিয়েও খাওয়া যেতে পারে। অনেকে স্বাদ বাড়াতে সামান্য বিট লবণ ব্যবহার করেন, তবে অতিরিক্ত লবণ ব্যবহার না করাই উত্তম।

 

প্রতিদিন কতটুকু খাওয়া উচিত?

বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ সুস্থ মানুষের জন্য প্রতিদিন এক মুঠো বা প্রায় ৮০ থেকে ১০০ গ্রাম জাম যথেষ্ট। একদিন বেশি খেয়ে পরে কয়েকদিন না খাওয়ার চেয়ে নিয়মিত ও পরিমিত পরিমাণে খাওয়াই বেশি উপকারী।

 

যাদের সতর্ক থাকতে হবে

ডায়াবেটিসের ওষুধ বা ইনসুলিন গ্রহণকারী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত জাম রক্তে শর্করার মাত্রা অতিরিক্ত কমিয়ে দিতে পারে। তাই তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরিমাণ নির্ধারণ করা উচিত। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রেও নতুন খাদ্যাভ্যাস শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। এছাড়া কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ফলজনিত অ্যালার্জির সমস্যা থাকতে পারে। অতিরিক্ত জাম খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য, পেট ফাঁপা বা হজমজনিত অস্বস্তিও দেখা দিতে পারে।

 

পচা জাম কেন ঝুঁকিপূর্ণ?

জাম অত্যন্ত পচনশীল ফল। দীর্ঘসময় সংরক্ষণ করলে বা ছত্রাক আক্রান্ত হলে এতে ক্ষতিকর জীবাণু জন্ম নিতে পারে। পচা বা নষ্ট জাম খেলে খাদ্যবিষক্রিয়া, ডায়রিয়া বা পেটের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই খাওয়ার আগে ফলগুলো ভালোভাবে পরীক্ষা করে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

পুষ্টিগুণ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ফাইবার এবং বিভিন্ন জৈব সক্রিয় উপাদানে সমৃদ্ধ জাম নিঃসন্দেহে গ্রীষ্মের অন্যতম উপকারী ফল। লিভার সুরক্ষা, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, হৃদস্বাস্থ্য, হজমশক্তি উন্নয়ন এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এর সম্ভাব্য উপকারিতা নিয়ে চিকিৎসক ও গবেষকদের আগ্রহ বাড়ছে। তবে কোনো একটি খাবার একাই রোগ প্রতিরোধ বা নিরাময় করতে পারে না। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলার পাশাপাশি জাম হতে পারে সুস্থ জীবনের একটি পুষ্টিকর ও উপকারী সংযোজন।


সম্পর্কিত নিউজ