লিভার সুস্থ রাখতে প্রতিদিনের ডায়েটে রাখুন এই পানীয়

লিভার সুস্থ রাখতে প্রতিদিনের ডায়েটে রাখুন এই পানীয়
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় পানীয়গুলোর মধ্যে কফি অন্যতম। প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ ঘুম ভাঙার পর প্রথমেই এক কাপ কফি হাতে নেন। অফিসের ব্যস্ততা, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, মানসিক চাপ কিংবা ক্লান্তি দূর করতে অনেকের কাছেই কফি যেন নির্ভরতার নাম। তবে দীর্ঘদিন ধরেই কফিকে ঘিরে নানা বিতর্ক রয়েছে। কেউ বলেন কফি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, আবার কেউ দাবি করেন এটি শরীরের জন্য উপকারী।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা ও চিকিৎসকদের মতামত বলছে, কফি নিজে সাধারণত সমস্যার কারণ নয়। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করে কফির সঙ্গে মেশানো অতিরিক্ত চিনি, ফ্লেভার সিরাপ, প্রসেসড ক্রিমার এবং উচ্চ ক্যালরিযুক্ত উপাদান।সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক চিকিৎসক ডা. সৌরভ শেঠি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় বলেন, পরিমিত পরিমাণে ব্ল্যাক কফি পান লিভারের জন্য উপকারী হতে পারে। তার মতে, কফির প্রকৃত উপকারিতা সম্পর্কে অনেকেরই ভুল ধারণা রয়েছে।

 

লিভারের জন্য কেন উপকারী হতে পারে কফি

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ফ্যাটি লিভার রোগ দ্রুত বাড়ছে। অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, স্থূলতা, ডায়াবেটিস এবং শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়ার কারণে অনেক মানুষ এই সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত কফি পানকারীদের মধ্যে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (NAFLD), লিভার ফাইব্রোসিস এবং লিভার সিরোসিসের ঝুঁকি তুলনামূলক কম দেখা যায়।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, কফিতে থাকা ক্যাফেইন এবং বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট লিভারের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করতে পারে। পাশাপাশি এটি লিভারের কোষকে ক্ষতির হাত থেকেও কিছুটা সুরক্ষা দেয়। কিছু গবেষণায় এমনও দেখা গেছে যে, নিয়মিত কফি পানকারীদের লিভার ক্যানসারের ঝুঁকিও তুলনামূলক কম হতে পারে।

 

কফির আসল সমস্যা কোথায়

চিকিৎসকদের মতে, সমস্যা শুরু হয় তখনই যখন কফি তার স্বাভাবিক রূপ হারিয়ে অতিরিক্ত চিনি ও কৃত্রিম উপাদানের বাহক হয়ে ওঠে। বর্তমানে বাজারে পাওয়া অনেক ফ্লেভারড কফি, ক্যারামেল লাতে, মোচা, ফ্রাপুচিনো বা বিভিন্ন ধরনের আইসড কফিতে বিপুল পরিমাণ চিনি ব্যবহার করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে একটি বড় কাপ কফিতে ৩০ থেকে ৫০ গ্রাম পর্যন্ত চিনি থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত ফ্রুক্টোজযুক্ত চিনি সরাসরি লিভারে গিয়ে জমা হয় এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লিভারে চর্বি বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ায়। ফলে কফির উপকারিতা নষ্ট হয়ে উল্টো স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

 

অতিরিক্ত চিনি শরীরে কী ক্ষতি করে

পুষ্টিবিদদের মতে, অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এতে সাময়িকভাবে শরীরে শক্তি বাড়ার অনুভূতি তৈরি হলেও কিছু সময় পর তা দ্রুত কমে যায়। এই ওঠানামার ফলে ক্লান্তি, অবসাদ এবং আবারও মিষ্টি খাবারের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হতে পারে। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ করলে-

  • স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ে
  • টাইপ-২ ডায়াবেটিস হতে পারে
  • ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বাড়ে
  • হৃদরোগের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়
  • শরীরে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ তৈরি হয়
  • উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়তে পারে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক মানুষ প্রতিদিন অজান্তেই কফির মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ করছেন।

 

হৃদযন্ত্রের ওপর কফির প্রভাব

একসময় ধারণা করা হতো কফি হৃদযন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। তবে সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো কিছুটা ভিন্ন তথ্য দিয়েছে। পরিমিত মাত্রায় কফি পান করলে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে-এমন শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন ২ থেকে ৪ কাপ ব্ল্যাক কফি পান করলে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কিছুটা কমতে পারে। তবে যাদের উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন বা বিশেষ হৃদরোগ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কফি গ্রহণ করা উচিত।

 

কফি কি মস্তিষ্কের জন্য উপকারী

ক্যাফেইন একটি প্রাকৃতিক উদ্দীপক। এটি মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্রকে সক্রিয় করে এবং মনোযোগ ও সতর্কতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, পরিমিত কফি পান-

  • মনোযোগ বৃদ্ধি করতে পারে
  • স্মৃতিশক্তি উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে
  • ক্লান্তি কমাতে পারে
  • কাজের দক্ষতা বাড়াতে পারে


কিছু গবেষক মনে করেন, নিয়মিত পরিমিত কফি পান পারকিনসনস ও আলঝেইমারের মতো স্নায়বিক রোগের ঝুঁকিও কিছুটা কমাতে পারে।

 

কত কাপ কফি নিরাপদ

বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য দৈনিক ৩০০ থেকে ৪০০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন নিরাপদ বলে বিবেচিত হয়। এটি সাধারণত ৩ থেকে ৪ কাপ কফির সমান। তবে ব্যক্তিভেদে ক্যাফেইনের প্রতি সংবেদনশীলতা ভিন্ন হতে পারে। কেউ অল্প কফিতেই অস্থিরতা অনুভব করেন, আবার কেউ তুলনামূলক বেশি পরিমাণ গ্রহণ করেও স্বাভাবিক থাকেন।

 

কখন কফি পান করা উচিত নয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু পরিস্থিতিতে কফি সীমিত রাখা ভালো। যেমন-

  • রাতে ঘুমানোর আগে
  • খালি পেটে অতিরিক্ত কফি পান
  • গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত কফি গ্রহণ
  • উদ্বেগ বা প্যানিক ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে
  • গুরুতর গ্যাস্ট্রিক বা অ্যাসিডিটির রোগীদের ক্ষেত্রে


বিশেষ করে রাতের দিকে অতিরিক্ত কফি ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

 

স্বাস্থ্যকরভাবে কফি পান করার উপায়

চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদরা কফি পান করার ক্ষেত্রে কিছু সহজ পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

  • যতটা সম্ভব কম চিনি ব্যবহার করা
  • ব্ল্যাক কফি বেছে নেওয়া
  • অতিরিক্ত সিরাপ ও কৃত্রিম ফ্লেভার এড়িয়ে চলা
  • প্রসেসড ক্রিমারের ব্যবহার কমানো
  • পরিমিত পরিমাণে পান করা
  • পর্যাপ্ত পানি পান করা


চিনি ব্যবহার করতেই হলে স্টেভিয়া বা মঙ্ক ফ্রুটের মতো বিকল্প ব্যবহার করা যেতে পারে।

 

চিনি ছাড়াই কফির স্বাদ বাড়ানোর উপায়

অনেকে মনে করেন চিনি ছাড়া কফি সুস্বাদু হয় না। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্যকর কিছু উপাদান ব্যবহার করেও কফির স্বাদ ও ঘ্রাণ বাড়ানো সম্ভব। যেমন-

  • দারুচিনি গুঁড়া
  • এলাচ গুঁড়া
  • জায়ফল
  • চিনি ছাড়া কোকো পাউডার
  • কয়েক ফোঁটা ভ্যানিলা এক্সট্র্যাক্ট


এসব উপাদান কফির স্বাদ বাড়ানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের ঝুঁকিও কমায়।


বিশেষজ্ঞদের মতে, কফি নিজে শত্রু নয়। বরং পরিমিত পরিমাণে এবং সঠিকভাবে পান করলে এটি লিভার, মস্তিষ্ক এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। তবে কফির সঙ্গে অতিরিক্ত চিনি, কৃত্রিম সিরাপ ও প্রসেসড উপাদান যোগ করার প্রবণতা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। তাই কফি উপকারী না ক্ষতিকর হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করে আপনি কী ধরনের কফি পান করছেন এবং কীভাবে পান করছেন তার ওপর। সচেতনভাবে কফি নির্বাচন ও গ্রহণ করলে এটি হতে পারে দৈনন্দিন জীবনের একটি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস।


সম্পর্কিত নিউজ