বৃষ্টিতে ভিজলেই মিলতে পারে যেসব ১০ স্বাস্থ্য উপকারিতা

বৃষ্টিতে ভিজলেই মিলতে পারে যেসব ১০ স্বাস্থ্য উপকারিতা
ছবির ক্যাপশান, ছবি: এআই

তীব্র গরমের পর এক পশলা বৃষ্টি অনেকের কাছেই স্বস্তির নাম। কেউ শখ করে বৃষ্টিতে ভেজেন, কেউ আবার পথে-ঘাটে প্রয়োজনের তাগিদে ভিজে যান। বৃষ্টির ঠান্ডা স্পর্শ, মাটির সোঁদা গন্ধ আর চারপাশের শীতল পরিবেশ অনেকের মন ভালো করে দেয়। তবে বৃষ্টিতে ভেজা নিয়ে মানুষের মধ্যে দ্বিধাও কম নয়। অনেকেই মনে করেন, বৃষ্টিতে ভিজলেই সর্দি-জ্বর হয়। আবার কেউ কেউ মনে করেন, বৃষ্টির পানি চুল ও ত্বকের জন্য খুব উপকারী।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবতা হলো-বৃষ্টিতে ভেজা সরাসরি সর্দি-জ্বরের কারণ নয়। সর্দি-কাশি সাধারণত ভাইরাসের কারণে হয়; শুধু ভিজে যাওয়ার কারণে নয়। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের চিকিৎসকরা বলছেন, ভেজা চুল বা বৃষ্টিতে ভেজা নিজে সর্দির কারণ নয়; সংক্রমণ ঘটতে হলে ভাইরাস বা জীবাণুর উপস্থিতি দরকার। তবে ভিজে থাকা, ঠান্ডা লাগা বা দীর্ঘ সময় ভেজা পোশাকে থাকা শরীরকে দুর্বল করতে পারে এবং অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

 

মায়ো ক্লিনিক হেলথ সিস্টেমের পরামর্শেও বলা হয়েছে, বৃষ্টি নিজে মানুষকে অসুস্থ করে না; তবে বৃষ্টির প্রভাবে শরীর ঠান্ডা হয়ে গেলে, ভেজা পোশাকে দীর্ঘ সময় থাকলে বা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হলে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই বৃষ্টিতে ভেজার আনন্দ থাকলেও সতর্কতা জরুরি।

 

বৃষ্টিতে ভেজার সম্ভাব্য উপকারিতা

১. গরমে শরীরকে সাময়িকভাবে ঠান্ডা করে
ভ্যাপসা গরমে বৃষ্টির ঠান্ডা পানি শরীরের তাপমাত্রা সাময়িকভাবে কমাতে সাহায্য করতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় গরমে থাকার পর বৃষ্টি শরীরে স্বস্তি এনে দেয়। তবে অতিরিক্ত ঠান্ডা বৃষ্টি বা দীর্ঘ সময় ভেজা থাকলে শরীরের তাপমাত্রা বেশি কমে যেতে পারে। তাই বৃষ্টিতে ভেজার পর দ্রুত শুকনো কাপড় পরা উচিত।

 

২. মানসিক প্রশান্তি বাড়াতে পারে
বৃষ্টির শব্দ, ঠান্ডা বাতাস ও মাটির সোঁদা গন্ধ অনেকের মনে শান্তির অনুভূতি তৈরি করে। বৃষ্টির পর যে মাটির গন্ধ পাওয়া যায়, তাকে বলা হয় “পেট্রিকর”। গবেষণায় দেখা গেছে, বৃষ্টির ফোঁটা মাটিতে পড়লে ক্ষুদ্র অ্যারোসল তৈরি হতে পারে, যা মাটি ও পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান বাতাসে ছড়িয়ে দেয়। এই প্রাকৃতিক ঘ্রাণ অনেক মানুষের কাছে আরামদায়ক ও নস্টালজিক মনে হয়।

 

৩. প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে
ব্যস্ত জীবন, মোবাইল-নির্ভরতা ও শহুরে চাপের মধ্যে বৃষ্টিতে কিছু সময় দাঁড়ানো অনেকের কাছে প্রকৃতির সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা। মনোবিজ্ঞানভিত্তিক অনেক আলোচনায় প্রকৃতির সংস্পর্শকে মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হিসেবে দেখা হয়। বৃষ্টির শব্দ, মেঘলা আকাশ ও শীতল বাতাস এক ধরনের mindful বা সচেতন মুহূর্ত তৈরি করতে পারে।

 

৪. মন ভালো করতে সহায়ক হতে পারে
বৃষ্টিতে ভেজা অনেকের কাছে আনন্দের অভিজ্ঞতা। বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রাকৃতিক পরিবেশে হাঁটা বা সময় কাটানো মুড উন্নত করতে পারে। ভেরিওয়েল হেলথে প্রকাশিত চিকিৎসক-ভিত্তিক আলোচনায় বলা হয়েছে, বৃষ্টির শব্দ ও গন্ধ অনেকের মধ্যে আরাম, মানসিক প্রশান্তি এবং স্ট্রেস কমানোর অনুভূতি তৈরি করতে পারে। তবে এটি চিকিৎসার বিকল্প নয়; বরং স্বাভাবিক মানসিক স্বস্তির একটি উপাদান হিসেবে দেখা উচিত।

 

৫. বৃষ্টির সময় বাতাস তুলনামূলক পরিষ্কার লাগতে পারে
বৃষ্টির সময় ধুলাবালি ও কিছু বায়ুকণা মাটিতে নেমে আসে। ফলে অনেকের কাছে বাতাস তুলনামূলক পরিষ্কার মনে হয়। ভেরিওয়েল হেলথের প্রতিবেদনে চিকিৎসকদের বরাতে বলা হয়েছে, বৃষ্টির মধ্যে হাঁটার একটি সুবিধা হলো বাতাসে ধুলা ও অ্যালার্জেন কিছুটা কমে যেতে পারে। তবে বজ্রঝড়, দূষিত শহুরে পরিবেশ বা জলাবদ্ধ এলাকার ক্ষেত্রে এই সুবিধা সব সময় প্রযোজ্য নয়।

 

৬. হালকা হাঁটা বা নড়াচড়া হলে শরীর সতেজ লাগে
বৃষ্টিতে হাঁটা বা হালকা নড়াচড়া শরীরকে সক্রিয় রাখতে পারে। গরমে সাধারণত অনেকেই বাইরে হাঁটতে চান না; কিন্তু বৃষ্টির শীতল পরিবেশে কিছু সময় হাঁটলে মানসিক ও শারীরিক সতেজতা আসতে পারে। তবে পিচ্ছিল রাস্তা, বজ্রপাত, জলাবদ্ধতা বা দূষিত পানি থাকলে বৃষ্টিতে হাঁটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

 

৭. ত্বকে সাময়িক সতেজতার অনুভূতি আসতে পারে
বৃষ্টির সময় বাতাসে আর্দ্রতা বাড়ে। এতে ত্বকের শুষ্কতা সাময়িকভাবে কম লাগতে পারে এবং ত্বক সতেজ অনুভূত হতে পারে। তবে বৃষ্টির পানি সব জায়গায় বিশুদ্ধ নয়। দূষিত বাতাস, ধুলো, রাস্তার ময়লা বা ছাদের পানি মিশলে ত্বকে অ্যালার্জি, চুলকানি বা সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই বৃষ্টিতে ভেজার পর পরিষ্কার পানি দিয়ে গোসল করা ভালো।

 

৮. চুলে ঠান্ডা পানির স্বস্তি মিলতে পারে, তবে ‘চুল ভালো করে’-এ দাবি সতর্কতার সঙ্গে দেখতে হবে
অনেকেই বলেন, বৃষ্টির পানি চুলের জন্য ভালো। কিন্তু এটি সব পরিস্থিতিতে ঠিক নয়। বৃষ্টির পানি পরিবেশভেদে ধুলা, ধোঁয়া, রাসায়নিক কণা বা জীবাণু বহন করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, বায়ুদূষণ বৃষ্টির পানির গুণমানকে প্রভাবিত করতে পারে এবং এতে ভারী ধাতুসহ বিভিন্ন দূষক মিশতে পারে। তাই বৃষ্টিতে ভিজলে চুলে ঠান্ডা ও সতেজ অনুভূতি আসতে পারে, কিন্তু এটিকে চুলের চিকিৎসা বা খুশকি দূর করার নিশ্চিত উপায় বলা ঠিক নয়। বরং ভেজার পর পরিষ্কার পানি ও প্রয়োজনে মৃদু শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে নেওয়া ভালো।

 

৯. বৃষ্টির শব্দ ঘুমে সহায়ক হতে পারে
বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ অনেকের কাছে calming sound হিসেবে কাজ করে। এতে মন শান্ত হয় এবং ঘুমের পরিবেশ তৈরি হতে পারে। তবে এটি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন। কারও কাছে বৃষ্টির শব্দ প্রশান্তির, আবার কারও কাছে বজ্রপাত বা ঝড়ের শব্দ উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

 

১০. ক্লান্তি কমাতে মানসিক বিরতি দেয়
ঝুম বৃষ্টির মধ্যে কিছু সময় দাঁড়ানো বা জানালার পাশে বসে বৃষ্টি দেখা অনেকের মানসিক ক্লান্তি কমায়। এটি দৈনন্দিন চাপ থেকে সাময়িক বিরতি দেয়। তবে দীর্ঘ সময় ভেজা থাকা, বিশেষ করে ঠান্ডা বাতাসে, শরীরের জন্য ভালো নয়।

 

যেসব ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি

বৃষ্টিতে ভেজা সব সময় নিরাপদ নয়। বিশেষ করে শহরের রাস্তা, জলাবদ্ধ এলাকা, নর্দমার পানি মেশা স্থান, শিল্পাঞ্চল বা বন্যার পানি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, দূষিত পানি কলেরা, ডায়রিয়া, আমাশয়, হেপাটাইটিস এ, টাইফয়েড ও পোলিওর মতো রোগ ছড়াতে পারে। বন্যা বা জলাবদ্ধতার পানিতে জীবাণু ও রাসায়নিক দূষণ থাকতে পারে। ইপিএ ভিক্টোরিয়া জানিয়েছে, floodwater বা বন্যার পানি মাইক্রোবিয়াল ও রাসায়নিক দূষণে আক্রান্ত হতে পারে এবং এতে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

 

দূষিত পানিতে হাঁটা বা ভেজা অবস্থায় দীর্ঘ সময় থাকা ত্বকে র‍্যাশ, চুলকানি, ফাঙ্গাল সংক্রমণ, চোখের সমস্যা বা শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। মেডিক্যাল নিউজ টুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দূষিত পানিতে সাঁতার বা সংস্পর্শ র‍্যাশ, চোখ ওঠা, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ও হেপাটাইটিসের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

 

বৃষ্টিতে ভেজার পর কী করবেন

বৃষ্টিতে ভিজলে যত দ্রুত সম্ভব শুকনো কাপড় পরুন। পরিষ্কার পানি দিয়ে গোসল করুন, বিশেষ করে যদি রাস্তার পানি, ছাদের পানি বা জলাবদ্ধ এলাকার পানিতে ভিজে থাকেন। চুল ভালোভাবে শুকিয়ে নিন। ভেজা মোজা বা জুতা দীর্ঘ সময় পরে থাকবেন না, কারণ এতে ফাঙ্গাল সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, হাঁপানি বা অ্যালার্জি রোগী, দুর্বল রোগ প্রতিরোধক্ষমতার মানুষ এবং জ্বর-সর্দি থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বৃষ্টিতে ভেজা এড়িয়ে চলাই ভালো। বজ্রপাতের সময় কোনোভাবেই খোলা মাঠ, গাছের নিচে, জলাশয়ের পাশে বা ধাতব বস্তু/বৈদ্যুতিক খুঁটির কাছে থাকা উচিত নয়। বৃষ্টি যদি বজ্রঝড়ের সঙ্গে হয়, তাহলে ভেজার আনন্দের চেয়ে নিরাপত্তাই আগে।

 

বৃষ্টিতে ভেজা সরাসরি সর্দি-জ্বরের কারণ নয়-এটি একটি প্রচলিত ভুল ধারণা। তবে দীর্ঘ সময় ভেজা থাকা, ঠান্ডা লাগা, দূষিত পানি বা বজ্রঝড়ের ঝুঁকি অবহেলা করা ঠিক নয়। পরিমিত সময় নিরাপদ পরিবেশে বৃষ্টিতে ভেজা মানসিক প্রশান্তি, গরমে স্বস্তি ও প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগের আনন্দ দিতে পারে। তবে বৃষ্টির পানি চুল-ত্বকের নিশ্চিত চিকিৎসা নয়। তাই আনন্দের পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা মানাই সবচেয়ে জরুরি।


সম্পর্কিত নিউজ