{{ news.section.title }}
মুখের পরিবর্তনই হতে পারে পেটের ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ
পেটের ক্যানসার বা গ্যাস্ট্রিক ক্যানসারকে অনেক সময় ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়। কারণ রোগটি শুরুতে সাধারণত স্পষ্ট কোনো লক্ষণ দেখায় না। অনেক ক্ষেত্রে রোগী দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ গ্যাস্ট্রিক, বদহজম, বুকজ্বালা বা পেট ফাঁপার সমস্যা মনে করে বিষয়টি এড়িয়ে যান।
কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, শরীরের কিছু ছোট পরিবর্তন-বিশেষ করে দীর্ঘদিনের হজমের সমস্যা, অল্প খাবারেই পেট ভরে যাওয়া, হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া, রক্তস্বল্পতা, বমিভাব, কালো পায়খানা কিংবা বিরল ক্ষেত্রে মুখ ও ত্বকে অস্বাভাবিক পরিবর্তন-পেটের ক্যানসারের সতর্ক সংকেত হতে পারে।
গ্যাস্ট্রিক ক্যানসার মূলত পাকস্থলীর ভেতরের আবরণে অস্বাভাবিক কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধির কারণে হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি ধীরে ধীরে তৈরি হয় এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রোগী বিষয়টি বুঝতেই পারেন না। এ কারণেই রোগটি অনেক সময় দেরিতে ধরা পড়ে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার সুযোগ অনেক বেশি থাকে।
পেটের ক্যানসার কীভাবে শুরু হয়
পাকস্থলীর ভেতরের আবরণে দীর্ঘদিন প্রদাহ, সংক্রমণ বা কোষের অস্বাভাবিক পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্যানসার তৈরি হতে পারে। সবচেয়ে সাধারণ ধরন হলো অ্যাডেনোকারসিনোমা, যা পাকস্থলীর ভেতরের গ্রন্থি-জাতীয় কোষ থেকে তৈরি হয়। পেটের ক্যানসারের প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রেই এই ধরন দেখা যায়।
এ ছাড়া আরও কিছু তুলনামূলক কম দেখা যায় এমন ধরন রয়েছে। যেমন-গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল স্ট্রোমাল টিউমার, নিউরোএন্ডোক্রাইন টিউমার, প্রাইমারি গ্যাস্ট্রিক লিম্ফোমা এবং কিছু বিরল ধরনের পাকস্থলীর টিউমার। রোগের ধরন, অবস্থান, বিস্তার ও রোগীর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসা পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে।
মুখ ও ত্বকে যে বিরল লক্ষণ দেখা দিতে পারে
চিকিৎসা-গবেষণায় পেটের ক্যানসারের সঙ্গে কিছু বিরল ত্বকজনিত সমস্যার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একটি হলো প্যাপুলোএরিথ্রোডার্মা অব ওফুজি। এটি খুবই বিরল একটি ত্বকের অবস্থা, যেখানে মুখসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট লালচে ফুসকুড়ি, ত্বক ওঠা, চুলকানি, ফোলা ভাব বা লালচে দাগ দেখা দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এটি শরীরের ভেতরের কোনো জটিল রোগ বা ক্যানসারের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা হলো-ত্বকে ফুসকুড়ি বা মুখে ফোলা দেখলেই পেটের ক্যানসার হয়েছে, এমন ভাবা যাবে না। অ্যালার্জি, একজিমা, সংক্রমণ, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, লিভার-কিডনির সমস্যা বা অন্যান্য অসুখেও এমন লক্ষণ দেখা দিতে পারে। কিন্তু মুখ বা ত্বকে দীর্ঘদিনের অস্বাভাবিক পরিবর্তনের সঙ্গে যদি ক্ষুধামন্দা, ওজন কমে যাওয়া, পেটব্যথা, বমি, রক্তস্বল্পতা বা কালো পায়খানার মতো লক্ষণ থাকে, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
যেসব লক্ষণ অবহেলা করা ঠিক নয়
পেটের ক্যানসারের লক্ষণ অনেক সময় সাধারণ হজমজনিত সমস্যার মতো মনে হতে পারে। তবে লক্ষণগুলো দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে বা ধীরে ধীরে বাড়লে সতর্ক হতে হবে। সাধারণ সতর্ক সংকেতগুলোর মধ্যে রয়েছে-
অল্প খাবার খেলেই পেট ভরে যাওয়া, দীর্ঘদিন বদহজম বা বুকজ্বালা, পেটের ওপরের অংশে ব্যথা বা অস্বস্তি, পেট ফাঁপা, ক্ষুধামন্দা, হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া, বমিভাব বা বমি, বমির সঙ্গে রক্ত আসা, কালো বা আলকাতরার মতো পায়খানা, অকারণ ক্লান্তি, রক্তস্বল্পতা, গিলতে সমস্যা এবং দীর্ঘদিন পেটের অস্বাভাবিক ভারী অনুভূতি।
অনেক সময় রক্তস্বল্পতা বা লো হিমোগ্লোবিন পেটের ভেতরে ধীরে ধীরে রক্তক্ষরণের কারণে হতে পারে। রোগী হয়তো সরাসরি রক্তক্ষরণ বুঝতে পারেন না, কিন্তু দীর্ঘদিন দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট বা ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে বয়স বেশি হলে বা দীর্ঘদিনের পেটের সমস্যার সঙ্গে রক্তস্বল্পতা থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
ঝুঁকি বাড়ায় যেসব কারণ
পেটের ক্যানসারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলো হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি বা এইচ. পাইলোরি সংক্রমণ। এই ব্যাকটেরিয়া দীর্ঘদিন পাকস্থলীতে প্রদাহ তৈরি করতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে কোষের পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে এইচ. পাইলোরি সংক্রমণ থাকলেই ক্যানসার হবে-এমন নয়; অনেক মানুষের শরীরে এই ব্যাকটেরিয়া থাকলেও ক্যানসার হয় না। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা ও চিকিৎসা গুরুত্বপূর্ণ।
খাদ্যাভ্যাসও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার, ধোঁয়ায় শুকানো খাবার, আচারজাত খাবার, প্রক্রিয়াজাত মাংস, অতিরিক্ত ভাজাপোড়া এবং কম ফল-শাকসবজি খাওয়ার অভ্যাস ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ধূমপান, অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ, স্থূলতা, দীর্ঘদিনের পাকস্থলীর প্রদাহ, আগের পেটের অস্ত্রোপচার, পার্নিশিয়াস অ্যানিমিয়া, কিছু জেনেটিক রোগ, পরিবারে পেটের ক্যানসারের ইতিহাস এবং বয়স বৃদ্ধিও ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। সাধারণত ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে পেটের ক্যানসার বেশি দেখা যায়। তবে অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান, স্থূলতা ও দীর্ঘদিনের পাকস্থলীর সমস্যার কারণে কম বয়সীদের মধ্যেও ঝুঁকি নিয়ে সচেতন থাকা জরুরি।
ক্যানসার কীভাবে ছড়ায়
পেটের ক্যানসার শুরুতে পাকস্থলীর ভেতরের স্তরে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি পাকস্থলীর গভীর স্তর, আশপাশের টিস্যু, লিম্ফ নোড এবং রক্তের মাধ্যমে শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। উন্নত পর্যায়ে এটি লিভার, অগ্ন্যাশয়, অন্ত্র, প্লীহা, পেরিটোনিয়াম বা শরীরের অন্য অংশেও ছড়াতে পারে। এই কারণেই প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা এত গুরুত্বপূর্ণ। রোগ যত আগে ধরা পড়ে, চিকিৎসার পরিকল্পনা তত কার্যকরভাবে করা যায়।
কীভাবে ধরা পড়ে রোগটি
পেটের ক্যানসার শনাক্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো আপার এন্ডোস্কোপি বা গ্যাস্ট্রোস্কোপি। এই পরীক্ষায় সরু ক্যামেরাযুক্ত একটি যন্ত্র মুখ দিয়ে খাদ্যনালি হয়ে পাকস্থলীতে প্রবেশ করানো হয়। এর মাধ্যমে পাকস্থলীর ভেতরের আবরণ সরাসরি দেখা যায়। সন্দেহজনক কোনো অংশ পাওয়া গেলে সেখান থেকে ছোট টিস্যু নমুনা নেওয়া হয়, যাকে বায়োপসি বলা হয়। বায়োপসি পরীক্ষায় ক্যানসার কোষ আছে কি না তা নিশ্চিত করা যায়।
রোগের বিস্তার বোঝার জন্য সিটি স্ক্যান, পিইটি স্ক্যান, এন্ডোস্কোপিক আল্ট্রাসাউন্ড, রক্ত পরীক্ষা, লিভার ফাংশন পরীক্ষা এবং অন্যান্য পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে। রক্তস্বল্পতা আছে কি না, শরীরের পুষ্টির অবস্থা কেমন, ক্যানসার ছড়িয়েছে কি না-এসব মূল্যায়নের ওপর চিকিৎসা নির্ভর করে।
চিকিৎসা কীভাবে হয়
চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের পর্যায়, ক্যানসারের ধরন, অবস্থান, রোগীর বয়স ও সামগ্রিক শারীরিক অবস্থার ওপর। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে সার্জারির মাধ্যমে আক্রান্ত অংশ অপসারণ করা যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি বা ইমিউনোথেরাপিও ব্যবহার করা হয়।
কিছু রোগীর ক্ষেত্রে অপারেশনের আগে কেমোথেরাপি দিয়ে টিউমার ছোট করার চেষ্টা করা হয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে অপারেশনের পর ক্যানসার ফিরে আসার ঝুঁকি কমাতে অতিরিক্ত চিকিৎসা দেওয়া হয়। উন্নত পর্যায়ে রোগ পুরোপুরি সারানো সম্ভব না হলেও ব্যথা, রক্তক্ষরণ, বমি বা খাদ্যগ্রহণের সমস্যা কমাতে চিকিৎসা দেওয়া যায়।
প্রতিরোধে কী করবেন
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস পেটের ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। প্রতিদিনের খাবারে ফল, শাকসবজি, পূর্ণ শস্যজাত খাবার এবং আঁশসমৃদ্ধ খাবার রাখা ভালো। অতিরিক্ত লবণযুক্ত, ধোঁয়ায় শুকানো, আচারজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া উচিত। ধূমপান পুরোপুরি এড়িয়ে চলা, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, নিয়মিত হাঁটা বা শরীরচর্চা করা এবং দীর্ঘদিনের গ্যাস্ট্রিক সমস্যা অবহেলা না করাও জরুরি। এইচ. পাইলোরি সংক্রমণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা ও নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে। পরিবারে পেটের ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে বা দীর্ঘদিনের হজমজনিত সমস্যা থাকলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
দীর্ঘদিন বদহজম, অল্প খেলেই পেট ভরে যাওয়া, দ্রুত ওজন কমে যাওয়া, ক্ষুধামন্দা, বমি, বমির সঙ্গে রক্ত, কালো পায়খানা, রক্তস্বল্পতা, গিলতে সমস্যা বা পেটের ব্যথা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে ৪০ বছরের বেশি বয়সে নতুন করে দীর্ঘস্থায়ী হজমের সমস্যা শুরু হলে বা আগের সমস্যা হঠাৎ বদলে গেলে তা অবহেলা করা উচিত নয়।
মুখ বা ত্বকে অস্বাভাবিক ফুসকুড়ি, দীর্ঘদিনের চুলকানি, ফোলা বা রং পরিবর্তন দেখা দিলে ত্বকের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। তবে এর সঙ্গে পেটের উপসর্গ, ওজন কমা বা দুর্বলতা থাকলে গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিশেষজ্ঞের পরামর্শও জরুরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে পেটের ক্যানসার ভয়াবহ হলেও সচেতনতা, ঝুঁকি কমানো, লক্ষণ বুঝে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো রোগটি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শরীরের ছোট পরিবর্তনকে অবহেলা না করাই হতে পারে সময়মতো রোগ শনাক্তের প্রথম পদক্ষেপ।