সরিষার তেল নাকি অলিভ অয়েল, হার্টের জন্য কোনটি বেশি উপকারী?

সরিষার তেল নাকি অলিভ অয়েল, হার্টের জন্য কোনটি বেশি উপকারী?
ছবির ক্যাপশান, ছবি: এআই

শরীর সুস্থ রাখতে, বিশেষ করে হার্টের যত্ন নিতে সঠিক রান্নার তেল বাছাই করা অত্যন্ত জরুরি। কোলেস্টেরল বাড়লে অনেকেই শুধু রান্নার তেলের পরিমাণ কমিয়ে দেন, কিন্তু সঠিক তেল বেছে না নিলে তাতেও খুব একটা লাভ হয় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমাতে শুধু তেলের পরিমাণ নয়, তেলের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে ব্যবহৃত তেল শরীরের কোলেস্টেরল, রক্তচাপ এবং রক্তনালির স্বাস্থ্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

সরিষার তেল থেকে অলিভ অয়েল: বদলে যাওয়া অভ্যাস

এক সময় বাঙালির রান্নাঘরে কেবল সরিষার তেলের চল থাকলেও, এখন অনেকেই রিফাইন্ড সাদা তেলের ক্ষতি এড়াতে অলিভ অয়েল ব্যবহার শুরু করেছেন। স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের মধ্যে অলিভ অয়েলের জনপ্রিয়তা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে পুষ্টিবিদদের মতে, হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য সরিষার তেল নাকি অলিভ অয়েল-কোনটি বেশি ভালো, তার উত্তর এতটা সহজ নয়। কারণ তেলের কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করে রান্নার ধরন, ব্যবহারের পরিমাণ এবং ব্যক্তির সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের ওপর।

 

ভালো ফ্যাট কেন প্রয়োজন

চিকিৎসকদের মতে, সব ধরনের ফ্যাট শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়। বরং কিছু ফ্যাট শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রান্নার তেলে ট্রান্স ফ্যাট বা স্যাচুরেটেড ফ্যাটের বদলে আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট, মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড থাকা বেশি উপকারী। এসব উপাদান হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমাতে, প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং রক্তনালির স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সাহায্য করে।

 

অলিভ অয়েলের বিশেষ উপকারিতা

অলিভ অয়েলে থাকা পলিফেনল নামের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরে ভালো কোলেস্টেরল (এইচডিএল) বাড়াতে সহায়তা করে এবং রক্তনালিতে ক্ষতিকর চর্বি জমার ঝুঁকি কমায়। এছাড়া এতে থাকা মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাট হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য উপকারী বলে বিবেচিত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, পরিমিত পরিমাণে অলিভ অয়েল গ্রহণ করলে হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমতে পারে। বিশেষ করে সালাদ, হালকা রান্না বা রান্না শেষে খাবারের ওপর ব্যবহার করলে এর পুষ্টিগুণ সবচেয়ে ভালোভাবে বজায় থাকে।

 

উচ্চ তাপে অলিভ অয়েল ব্যবহারে সতর্কতা

যদিও অলিভ অয়েল স্বাস্থ্যকর হিসেবে পরিচিত, তবে এটি সব ধরনের রান্নার জন্য সমান উপযোগী নয়। অলিভ অয়েলের স্মোক পয়েন্ট তুলনামূলক কম হওয়ায় উচ্চ আঁচে দীর্ঘ সময় রান্না করলে এর কিছু উপকারী উপাদান নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ফলে গভীর তেলে ভাজা বা অতিরিক্ত কষানো রান্নার ক্ষেত্রে এটি সবসময় আদর্শ বিকল্প নয়। বিশেষজ্ঞরা তাই অলিভ অয়েল ব্যবহারের ক্ষেত্রে রান্নার ধরন বিবেচনা করার পরামর্শ দেন।

 

সরিষার তেলের পুষ্টিগুণ ও উপকারিতা

অন্যদিকে, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডে সমৃদ্ধ সরিষার তেল দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ এশিয়ার খাদ্যসংস্কৃতির অংশ। এতে থাকা স্বাস্থ্যকর ফ্যাট হৃদ্‌স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি সরিষার তেলে প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্টও রয়েছে, যা শরীরকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস থেকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে। অনেক পুষ্টিবিদ মনে করেন, সঠিক পরিমাণে সরিষার তেল ব্যবহার করলে এটি হার্টের জন্য উপকারী খাদ্য উপাদান হতে পারে।

 

বাঙালি রান্নায় সরিষার তেল কেন উপযোগী

সরিষার তেলের একটি বড় সুবিধা হলো এটি তুলনামূলকভাবে উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে। ফলে ভাজাভুজি, কষানো তরকারি, মাছ বা মাংসের রান্নাসহ বাঙালির ঐতিহ্যবাহী নানা খাবার তৈরিতে এটি কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায়। রান্নার সময় তেলের গুণাগুণ বজায় রাখার ক্ষেত্রেও এটি অনেকটা সুবিধাজনক। এ কারণেই বহু বিশেষজ্ঞ উচ্চ আঁচে রান্নার জন্য সরিষার তেলকে উপযুক্ত বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করেন।

 

শুধু তেল নয়, পরিমাণও গুরুত্বপূর্ণ

স্বাস্থ্যকর তেল নির্বাচন করলেও অতিরিক্ত ব্যবহার করলে উপকারের বদলে ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অতিরিক্ত তেল শরীরে ক্যালরির পরিমাণ বাড়িয়ে ওজন বৃদ্ধি, কোলেস্টেরল সমস্যা এবং হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই যে তেলই ব্যবহার করা হোক না কেন, তা অবশ্যই পরিমিত পরিমাণে ব্যবহার করা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ জীবনযাপনের জন্য তেলের পাশাপাশি সুষম খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম এবং ধূমপান থেকে দূরে থাকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

 

কোন তেল বেছে নেবেন?

পুষ্টিবিদদের মতে, অলিভ অয়েল ও সরিষার তেল-দুটিরই নিজস্ব উপকারিতা রয়েছে। সালাদ, হালকা রান্না বা কম তাপে রান্নার ক্ষেত্রে অলিভ অয়েল ভালো বিকল্প হতে পারে। অন্যদিকে উচ্চ আঁচে রান্না, ভাজাভুজি বা ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবারের জন্য সরিষার তেল বেশি উপযোগী। তাই একটি তেলকে অন্যটির চেয়ে সম্পূর্ণ শ্রেষ্ঠ না বলে, রান্নার ধরন ও প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক তেল নির্বাচন করাই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত।

 

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হার্ট ভালো রাখতে কোনো একটি তেলের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। নিয়মিত শাকসবজি, ফলমূল, আঁশযুক্ত খাবার ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট গ্রহণের পাশাপাশি তেল ব্যবহারে সচেতনতা বাড়াতে হবে। পরিমিত পরিমাণে সরিষার তেল ব্যবহার করলে তা অলিভ অয়েলের মতোই হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। তবে যাদের আগে থেকেই হৃদ্‌রোগ, উচ্চ কোলেস্টেরল বা অন্যান্য জটিল স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী তেল নির্বাচন করা সবচেয়ে নিরাপদ।


সম্পর্কিত নিউজ