{{ news.section.title }}
নারীদের জন্য বিটরুট কেন এত উপকারী?
বিটরুট সবচেয়ে পুষ্টিকর সবজিগুলোর মধ্যে একটি। কম ক্যালোরি, আঁশ, ফোলেট, পটাশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, আয়রন, ভিটামিন সি এবং উদ্ভিজ্জ নাইট্রেটসমৃদ্ধ এই সবজি শরীরের জন্য নানা দিক থেকে উপকারী। পুষ্টিবিষয়ক তথ্যভান্ডার ইউএসডিএ ফুডডাটা সেন্ট্রাল অনুযায়ী, বিটরুটে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ রয়েছে; আর স্বাস্থ্য গবেষণায় বিটরুটকে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, রক্তসঞ্চালন, প্রদাহ কমানো ও শরীরের কর্মক্ষমতা বাড়ানোর সম্ভাবনাময় খাবার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
যদিও বিটরুট নারী-পুরুষ সবার জন্যই স্বাস্থ্যকর, তবে নারীদের জন্য এর কিছু বিশেষ উপকারিতা রয়েছে। মাসিকের সময় আয়রন ক্ষয়, গর্ভধারণের প্রস্তুতি, গর্ভাবস্থায় ফোলেটের প্রয়োজন, ত্বকের যত্ন, ক্লান্তি ও হৃদ্স্বাস্থ্যের মতো বিষয়গুলোতে বিটরুট সহায়ক খাবার হতে পারে। তবে এটি কোনো রোগের একমাত্র চিকিৎসা নয়; নিয়মিত খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে পরিমিতভাবে খাওয়াই সবচেয়ে ভালো।
রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে সহায়ক
নারীদের মধ্যে আয়রনের ঘাটতি ও রক্তস্বল্পতা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে মাসিক, গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদানকালীন সময়ে শরীরে আয়রনের প্রয়োজন বাড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের উইমেন্স হেলথ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতায় শরীরে পর্যাপ্ত আয়রন থাকে না; ফলে রক্তের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন পৌঁছাতে সমস্যা হতে পারে।
বিটরুটে আয়রন ও ফোলেট থাকায় এটি রক্ত তৈরির প্রক্রিয়াকে সহায়তা করতে পারে। ফোলেট স্বাস্থ্যকর লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে ভূমিকা রাখে-এ তথ্য হার্ভার্ডের পুষ্টি উৎসেও উল্লেখ আছে। তবে শুধু বিটরুট খেয়ে গুরুতর রক্তস্বল্পতা সারানো সম্ভব নয়। যাদের মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়ফড় বা দীর্ঘদিন ক্লান্তি থাকে, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শে রক্ত পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
মাসিকের সময় পুষ্টির ঘাটতি পূরণে সহায়তা করতে পারে
মাসিকের সময় অনেক নারীর শরীর থেকে রক্তের সঙ্গে আয়রনও বের হয়ে যায়। যাদের মাসিক বেশি হয়, তাদের আয়রনের ঘাটতির ঝুঁকি আরও বেশি। সাম্প্রতিক চিকিৎসা গবেষণায় বলা হয়েছে, স্বাভাবিক মাসিকেও শরীর থেকে আয়রন ক্ষয় হয়; আর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে এই ক্ষয় অনেক বেশি হতে পারে।
এ কারণে নারীদের খাদ্যতালিকায় আয়রনসমৃদ্ধ খাবার থাকা জরুরি। বিটরুটের সঙ্গে ডাল, পালং শাক, ডিম, মাছ, মাংস, বাদাম, খেজুর, কলিজা ও ভিটামিন সি–সমৃদ্ধ ফল খেলে আয়রন গ্রহণে সহায়তা হতে পারে। বিটরুট নিজে আয়রনের খুব বড় উৎস না হলেও ফোলেট, আঁশ ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের কারণে এটি নারীদের সামগ্রিক পুষ্টিতে ভালো ভূমিকা রাখতে পারে।
হৃদ্স্বাস্থ্য ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা
বিটরুটের অন্যতম আলোচিত উপকারিতা হলো হৃদ্স্বাস্থ্যে এর সম্ভাব্য ভূমিকা। বিটরুটে প্রাকৃতিক নাইট্রেট থাকে, যা শরীরে গিয়ে নাইট্রিক অক্সাইড তৈরিতে সহায়তা করতে পারে। নাইট্রিক অক্সাইড রক্তনালী শিথিল ও প্রসারিত করতে সাহায্য করে; ফলে রক্তপ্রবাহ সহজ হতে পারে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, বিটরুটে থাকা প্রাকৃতিক নাইট্রেট রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
বিটরুটের রস নিয়ে করা বিভিন্ন গবেষণায় উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বাস্থ্য গবেষণাভান্ডারে প্রকাশিত পর্যালোচনাগুলোতেও বিটরুটকে নাইট্রেটের একটি প্রাকৃতিক উৎস হিসেবে উল্লেখ করে হৃদ্রোগের ঝুঁকি, রক্তনালীর কার্যকারিতা ও রক্তচাপের সঙ্গে এর সম্পর্ক নিয়ে গবেষণার কথা বলা হয়েছে। তবে যারা উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ খান বা যাদের রক্তচাপ খুব কম, তারা নিয়মিত বেশি পরিমাণ বিটরুটের রস খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে ভালো। কারণ বিটরুট কিছু মানুষের রক্তচাপ আরও কমিয়ে দিতে পারে।
ত্বকে প্রাকৃতিক উজ্জ্বলতা আনতে সহায়ক
ত্বকের যত্নে শুধু বাইরে থেকে প্রসাধনী ব্যবহার করলেই হয় না; ভেতর থেকেও পুষ্টি দরকার। বিটরুটে থাকা বেটালেইনজাতীয় রঞ্জক উপাদান, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ভিটামিন সি শরীরের কোষকে অক্সিডেটিভ চাপ থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করতে পারে। বিটরুটের পুষ্টিগুণ ও জৈব সক্রিয় উপাদান নিয়ে প্রকাশিত গবেষণায় এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহরোধী সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
নিয়মিত পরিমিত বিটরুট খেলে রক্তসঞ্চালন, হজম ও পুষ্টি গ্রহণে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, যা পরোক্ষভাবে ত্বকের সতেজতা ধরে রাখতে সহায়তা করে। তবে ত্বকের উজ্জ্বলতা শুধু একটি খাবারের ওপর নির্ভর করে না। পর্যাপ্ত পানি পান, ঘুম, ফলমূল, শাকসবজি, সূর্যরশ্মি থেকে সুরক্ষা এবং মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণও জরুরি।
শক্তি ও কর্মক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক
অনেকে ব্যায়াম বা দীর্ঘ কাজের আগে বিটরুটের রস পান করেন। এর কারণ হলো বিটরুটে থাকা প্রাকৃতিক নাইট্রেট শরীরে অক্সিজেন ব্যবহারের দক্ষতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, বিটরুট খাওয়ার পর শরীরের কর্মক্ষমতা, রক্তপ্রবাহ ও ব্যায়াম সহনশীলতার ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব দেখা যেতে পারে।
যেসব নারী সারাদিন কাজ, পড়াশোনা, গৃহস্থালি, সন্তান লালনপালন বা পেশাগত চাপের মধ্যে থাকেন, তাদের জন্য পুষ্টিকর খাবার অত্যন্ত জরুরি। বিটরুট সালাদ, সেদ্ধ বিট, সবজি, স্যুপ বা অল্প পরিমাণ রস হিসেবে খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে। তবে খালি পেটে অতিরিক্ত রস পান করলে কারও কারও পেটে অস্বস্তি হতে পারে।
গর্ভধারণের প্রস্তুতি ও গর্ভাবস্থায় ফোলেটের গুরুত্ব
নারীদের জন্য বিটরুটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানগুলোর একটি হলো ফোলেট। ফোলেট হলো ভিটামিন বি–৯-এর প্রাকৃতিক রূপ, যা নতুন কোষ তৈরি, রক্তকণিকা গঠন এবং গর্ভস্থ শিশুর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, সন্তানধারণে সক্ষম নারীদের প্রতিদিন ৪০০ মাইক্রোগ্রাম ফলিক অ্যাসিড গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়, যা শিশুর মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের গুরুতর জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে।
ব্রিটিশ নিউট্রিশন ফাউন্ডেশনও গর্ভধারণের আগে ও গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে ফলিক অ্যাসিডের গুরুত্ব উল্লেখ করেছে এবং ফোলেটসমৃদ্ধ খাবারের তালিকায় বিটরুটের কথাও বলা হয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিটরুট ফোলেটসমৃদ্ধ খাবার হলেও এটি চিকিৎসক-নির্দেশিত ফলিক অ্যাসিড সাপ্লিমেন্টের বিকল্প নয়। গর্ভধারণের পরিকল্পনা থাকলে বা গর্ভবতী হলে চিকিৎসকের পরামর্শমতো সাপ্লিমেন্ট ও খাদ্যতালিকা অনুসরণ করা উচিত।
হজম ও ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক
বিটরুটে আঁশ থাকে, যা হজমে সহায়ক এবং অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম ভালো রাখতে সাহায্য করে। আঁশসমৃদ্ধ খাবার খেলে দীর্ঘসময় পেট ভরা অনুভূত হতে পারে, ফলে অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমে। বিটরুট কম ক্যালোরির হওয়ায় ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকা খাদ্যতালিকায় এটি রাখা যেতে পারে। ইউএসডিএ ফুডডাটা সেন্ট্রালের তথ্যভান্ডার বিটরুটের পুষ্টিগুণ ও খাদ্য উপাদানের তথ্য সরবরাহ করে, যা খাদ্য নির্বাচন ও পুষ্টি বিশ্লেষণে ব্যবহার করা হয়। তবে শুধু বিটরুট খেলে ওজন কমে যাবে-এমন ধারণা ঠিক নয়। ওজন নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস, পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত ঘুম।
যকৃতের জন্যও সহায়ক হতে পারে
বিটরুটে থাকা বেটাইন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান নিয়ে গবেষণায় যকৃতের স্বাস্থ্য, প্রদাহ ও বিপাকীয় কার্যক্রমে সম্ভাব্য ভূমিকার কথা আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তাই যকৃতের রোগে আক্রান্ত কেউ শুধু বিটরুটের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলবেন।
কীভাবে খাবেন বিটরুট
বিটরুট খাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো সালাদ। শসা, গাজর, টমেটো, লেবু, সামান্য লবণ ও ধনেপাতার সঙ্গে কুচি করে বিটরুট খাওয়া যায়। আবার সেদ্ধ করে সবজি, স্যুপ বা ভর্তা হিসেবেও খাওয়া যায়। কেউ চাইলে বিটরুটের রসও পান করতে পারেন। তবে রস বানালে আঁশের পরিমাণ কমে যেতে পারে, তাই শুধু রসের ওপর নির্ভর না করে পুরো বিটরুট খাওয়াও ভালো।
পুষ্টিবিদদের মতে, নতুন করে বিটরুট খাওয়া শুরু করলে অল্প পরিমাণ দিয়ে শুরু করা ভালো। কারণ বেশি খেলে কারও কারও গ্যাস, পেট ফাঁপা বা হজমের অস্বস্তি হতে পারে। যারা আগে কখনও বিটরুট খাননি, তারা সপ্তাহে কয়েক দিন অল্প পরিমাণ দিয়ে শুরু করতে পারেন।
বিটরুট খাওয়ার সীমাবদ্ধতা
বিটরুট স্বাস্থ্যকর হলেও সবার জন্য একইভাবে উপযোগী নাও হতে পারে। বিটরুট খাওয়ার পর অনেকের প্রস্রাব বা মলের রং লালচে বা গোলাপি হতে পারে। একে বিটুরিয়া বলা হয়। সাধারণত এটি ক্ষতিকর নয় এবং বিটরুটের প্রাকৃতিক রঙের কারণে এমন হয়। ওয়েবএমডি ও ভেরিওয়েল হেলথ-দুই সূত্রেই বিটরুট খাওয়ার পর প্রস্রাব বা মলের রং পরিবর্তনের বিষয়টি সাধারণ ও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিরীহ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে যাদের কিডনিতে পাথর হওয়ার প্রবণতা আছে, তাদের বিটরুট খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ বিটরুটে অক্সালেট থাকে, যা কিছু ধরনের কিডনির পাথরের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। হার্ভার্ডের পুষ্টি উৎসে বলা হয়েছে, বিটসহ কিছু খাবারের অক্সালেট ক্যালসিয়ামের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। ওয়েবএমডি বলছে, কিডনিতে পাথরের ইতিহাস থাকলে বিটরুট কম খাওয়া বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। যাদের রক্তচাপ খুব কম, যারা রক্তচাপের ওষুধ খান, কিডনির জটিলতা আছে, গেঁটে বাতের সমস্যা আছে বা গর্ভাবস্থায় বিশেষ চিকিৎসা চলছে-তাদের নিয়মিত বেশি পরিমাণ বিটরুটের রস পান করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিটরুট নারীদের জন্য একটি উপকারী ও পুষ্টিকর খাবার। এটি রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে সহায়ক খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে, হৃদ্স্বাস্থ্য ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে, ত্বকের সতেজতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে, শরীরে শক্তি জোগাতে পারে এবং গর্ভধারণের প্রস্তুতি ও গর্ভাবস্থায় ফোলেটের প্রয়োজন পূরণে সহায়ক হতে পারে। তবে কোনো খাবারই একা সব সমস্যার সমাধান নয়। তাই বিটরুটকে নিয়মিত সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে খাওয়া উচিত। শাকসবজি, ফল, প্রোটিন, পর্যাপ্ত পানি, ঘুম ও নিয়মিত শরীরচর্চার সঙ্গে বিটরুট যোগ করলে এর উপকারিতা আরও ভালোভাবে পাওয়া যেতে পারে।
তথ্যসূত্র: ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশন