পাথরকুচির পাতা ঔষধি গুণ: যেসব রোগে উপকার মিলতে পারে

পাথরকুচির পাতা ঔষধি গুণ: যেসব রোগে উপকার মিলতে পারে
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে শহরের ছাদবাগান কিংবা বারান্দার টব-প্রায় সর্বত্রই দেখা মেলে পাথরকুচি গাছের। সহজে জন্মানো এই ঔষধি উদ্ভিদ বহু শতাব্দী ধরে লোকজ চিকিৎসা, আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা এবং ভেষজ ওষুধের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বৈজ্ঞানিক নাম Kalanchoe pinnata। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এটি পাথরকুচি, অমৃতপাতা বা জীবনপাতা নামেও পরিচিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাথরকুচি পাতায় রয়েছে বিভিন্ন ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ফ্ল্যাভোনয়েড, ফেনোলিক যৌগ, খনিজ উপাদান এবং প্রদাহরোধী উপাদান, যা শরীরের নানা সমস্যার বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে। যদিও এর অনেক ব্যবহার লোকজ চিকিৎসার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রচলিত, তবুও আধুনিক গবেষণায়ও কিছু সম্ভাবনাময় স্বাস্থ্যগুণের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

 

পাথরকুচি গাছের পরিচয়

পাথরকুচি সাধারণত দেড় থেকে দুই ফুট উঁচু হয়ে থাকে। এর পাতা মাংসল, রসালো ও মসৃণ। পাতার কিনারাজুড়ে ছোট ছোট খাঁজ থাকে এবং সেই খাঁজ থেকেই নতুন চারা জন্ম নিতে পারে। একটি পাতা মাটিতে ফেলে রাখলেও অল্প সময়ের মধ্যে সেখান থেকে নতুন গাছ জন্মানো সম্ভব। এ গাছ সাধারণত কাঁকরযুক্ত মাটিতেও জন্মাতে পারে, তবে ভেজা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে দ্রুত বৃদ্ধি পায়। খুব বেশি পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না বলেই এটি সহজেই বাড়ির বাগানে চাষ করা যায়।

 

কিডনির পাথর অপসারণে সম্ভাব্য সহায়ক

পাথরকুচি পাতার সবচেয়ে পরিচিত ব্যবহার হলো কিডনির পাথর সমস্যায়। লোকজ চিকিৎসায় দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বাস করা হয়, এই পাতার রস বা পাতা নিয়মিত সেবন করলে ছোট আকারের কিডনি পাথর ভেঙে বা গলিয়ে প্রস্রাবের মাধ্যমে বের হতে সাহায্য করে। এ কারণে অনেকেই সকালে খালি পেটে ২-৩টি পাতা চিবিয়ে খান অথবা পাতার রস পান করেন। তবে চিকিৎসকরা মনে করিয়ে দেন, বড় আকারের কিডনি পাথর বা তীব্র ব্যথার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ভেষজ চিকিৎসার ওপর নির্ভর না করে দ্রুত ইউরোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

 

প্রস্রাবের জ্বালাপোড়া ও মূত্রনালির সংক্রমণে উপকার

মূত্রনালির সংক্রমণ (UTI), প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া বা প্রস্রাব আটকে থাকার মতো সমস্যায়ও পাথরকুচি পাতা ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। এর প্রাকৃতিক মূত্রবর্ধক বৈশিষ্ট্য শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি ও বর্জ্য পদার্থ বের করে দিতে সাহায্য করতে পারে বলে ধারণা করা হয়। অনেক ভেষজ চিকিৎসক মনে করেন, নিয়মিত ও পরিমিত মাত্রায় এর রস সেবন করলে মূত্রথলির স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।

 

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা

বর্তমান সময়ে উচ্চ রক্তচাপ একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, পাথরকুচিতে থাকা কিছু প্রাকৃতিক উপাদান রক্তনালিকে শিথিল করতে সাহায্য করতে পারে। ফলে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখতে এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে উচ্চ রক্তচাপের রোগীরা নিয়মিত ওষুধ বন্ধ করে শুধুমাত্র পাথরকুচির ওপর নির্ভর করবেন না। এটি কেবল সহায়ক ভেষজ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

 

গ্যাস্ট্রিক, পেট ফাঁপা ও বদহজমে স্বস্তি

পেট ফাঁপা, গ্যাস, বদহজম কিংবা আধোবায়ুর সমস্যায় পাথরকুচি পাতার ব্যবহার বহু পুরোনো। লোকজ চিকিৎসা অনুযায়ী, পাতার রস সামান্য গরম করে খেলে পেটের অস্বস্তি কমে এবং হজম প্রক্রিয়া স্বাভাবিক হয়। অনেকের মতে, সকালে খালি পেটে পরিমিত পরিমাণে এর রস পান করলে গ্যাস্ট্রিকজনিত অস্বস্তি কিছুটা কমতে পারে।

 

লিভারের সুরক্ষা ও জন্ডিস নিরাময়ে ব্যবহার

লিভার মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। দীর্ঘদিন ধরে পাথরকুচি পাতার রস জন্ডিস এবং লিভারজনিত সমস্যার লোকজ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ভেষজ বিশেষজ্ঞদের মতে, এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান লিভারের কোষকে সুরক্ষা দিতে সহায়তা করতে পারে। যদিও জন্ডিস বা লিভারের গুরুতর রোগের ক্ষেত্রে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

 

পুরোনো সর্দি-কাশি ও কফ দূর করতে সহায়ক

দীর্ঘদিনের সর্দি, কাশি এবং কফ জমে থাকার সমস্যায়ও পাথরকুচির ব্যবহার দেখা যায়। পাতা থেকে রস বের করে সামান্য গরম করে সেবন করলে শ্বাসতন্ত্রে জমে থাকা কফ নরম হতে পারে এবং কাশি কমতে সাহায্য করতে পারে। গ্রামীণ অঞ্চলে এখনো অনেক পরিবারে এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।

 

ফোঁড়া, মেহ ও প্রদাহজনিত সমস্যায়

সর্দিজনিত কারণে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ফোঁড়া বা প্রদাহ দেখা দিলে অনেকেই পাথরকুচি পাতার রস ব্যবহার করেন। লোকজ বিশ্বাস অনুযায়ী, এর প্রদাহরোধী গুণ আক্রান্ত স্থানের ফোলা ও ব্যথা কমাতে সাহায্য করতে পারে।

 

কাটা-ছেঁড়া ও থেঁতলে যাওয়া স্থানে উপকারী

টাটকা পাতা সামান্য গরম করে কাটা, থেঁতলে যাওয়া বা ব্যথাযুক্ত স্থানে সেঁক দিলে আরাম পাওয়া যায় বলে প্রচলিত ধারণা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পাতার রস ক্ষতস্থানে প্রয়োগও করা হয়। এর শীতলকারী বৈশিষ্ট্য আক্রান্ত স্থানের জ্বালাপোড়া কমাতে সাহায্য করতে পারে।

 

শিশুদের পেটব্যথায় ব্যবহারের প্রচলন

গ্রামীণ এলাকায় শিশুদের সাধারণ পেটব্যথার ক্ষেত্রে পাথরকুচি পাতার রস দিয়ে পেটে মালিশ করার প্রচলন রয়েছে। এটি ব্যথা উপশমে সহায়ক বলে অনেকের বিশ্বাস। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে যেকোনো ভেষজ চিকিৎসা ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

 

শরীরের জ্বালাপোড়া কমাতে সহায়ক

অনেক সময় শরীরে অস্বাভাবিক জ্বালাপোড়া বা অস্বস্তি অনুভূত হলে পাথরকুচির রস গরম পানির সঙ্গে মিশিয়ে পান করা হয়। লোকজ চিকিৎসায় এটি শরীর ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে বলে মনে করা হয়।

 

পাইলস ও অর্শ রোগে ব্যবহার

প্রচলিত ভেষজ চিকিৎসা অনুযায়ী, পাথরকুচি পাতার রসের সঙ্গে গোলমরিচ মিশিয়ে সেবন করলে পাইলস বা অর্শ রোগের উপসর্গ কিছুটা কমতে পারে। তবে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণা এখনো সীমিত।

 

ডায়রিয়া, আমাশয় ও কলেরায় সম্ভাব্য উপকারিতা

লোকজ চিকিৎসায় পাথরকুচি পাতা ডায়রিয়া, রক্ত আমাশয় এবং কলেরার ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে। জিরা ও ঘির সঙ্গে পাতার রস মিশিয়ে খাওয়ার একটি প্রচলিত পদ্ধতি রয়েছে। তবে এসব রোগ গুরুতর হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে।

 

ত্বকের যত্নে প্রাকৃতিক উপাদান

পাথরকুচি পাতায় প্রচুর পরিমাণে পানি থাকে, যা ত্বককে আর্দ্র রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া এতে থাকা প্রদাহরোধী উপাদান ব্রণ, ফুসকুড়ি এবং ত্বকের জ্বালাপোড়া কমাতে সহায়ক হতে পারে। অনেকে পাতা বেটে ফেসপ্যাকের মতো ব্যবহার করেন। এতে ত্বক কিছুটা সতেজ ও কোমল অনুভূত হতে পারে।

 

পোকামাকড়ের কামড়ে উপকার

বিষাক্ত পোকামাকড় বা কীটপতঙ্গ কামড়ালে পাতার রস আক্রান্ত স্থানে লাগানোর প্রচলন রয়েছে। এটি জ্বালাপোড়া ও ফোলা কমাতে সহায়তা করতে পারে বলে লোকজ চিকিৎসায় বিশ্বাস করা হয়।

 

কীভাবে খাবেন?

পাথরকুচি পাতা সাধারণত নিচের উপায়ে খাওয়া হয়-

  • সকালে খালি পেটে ২-৩টি তাজা পাতা ধুয়ে চিবিয়ে খাওয়া।
  • পাতা বেটে বা ব্লেন্ড করে ১-২ চা চামচ রস পানির সঙ্গে মিশিয়ে পান করা।
  • প্রয়োজনে ভেষজ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী সেবন করা।


সতর্কতা ও বিশেষ পরামর্শ

যদিও পাথরকুচি একটি উপকারী ঔষধি উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিত, তবুও অতিরিক্ত সেবন ক্ষতির কারণ হতে পারে। গর্ভবতী নারী, দুগ্ধদানকারী মা, শিশু এবং দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এটি খাওয়া উচিত নয়। এছাড়া কিডনির বড় পাথর, গুরুতর লিভার রোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা অন্য কোনো দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ভেষজ চিকিৎসাকে মূল চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে নেওয়া উচিত নয়।

 

সহজলভ্য হলেও পাথরকুচি পাতা প্রকৃতির এক মূল্যবান উপহার। কিডনির পাথর, প্রস্রাবের সমস্যা, গ্যাস্ট্রিক, সর্দি-কাশি, ত্বকের যত্ন, লিভারের সুরক্ষা থেকে শুরু করে বিভিন্ন লোকজ চিকিৎসায় এর ব্যবহার দীর্ঘদিনের। তবে এর বেশ কিছু উপকারিতা এখনো বৈজ্ঞানিকভাবে আরও বিস্তৃত গবেষণার অপেক্ষায় রয়েছে। তাই পাথরকুচিকে সহায়ক ভেষজ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে, কিন্তু গুরুতর রোগের ক্ষেত্রে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।


সম্পর্কিত নিউজ