হামের লক্ষণ, ঝুঁকি ও প্রতিরোধে করণীয়

হামের লক্ষণ, ঝুঁকি ও প্রতিরোধে করণীয়
ছবির ক্যাপশান, হামের লক্ষণ, ঝুঁকি ও প্রতিরোধে করণীয়

হাম, যা রুবেওলা নামেও পরিচিত, একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাল সংক্রমণ যা মূলত শ্বাসনালীকে প্রভাবিত করে। এটি আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচির সময় নির্গত ক্ষুদ্র ফোঁটার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ভাইরাসটি বাতাসে বা পৃষ্ঠতলে কয়েক ঘন্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে। সংক্রমণ সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ, একই ঘরে থাকা বা ব্যবহার করা বাসনপত্র ও পানীয় ভাগাভাগি করার মাধ্যমে ঘটে।

রুবেওলার সংক্রমণে আক্রান্ত ব্যক্তি হামের ফুসকুড়ি দেখা দেওয়ার চার দিন আগে থেকে চার–পাঁচ দিন পরে পর্যন্ত সংক্রামক থাকে। টিকা না নেওয়া শিশুদের জন্য এই রোগ বিশেষভাবে বিপজ্জনক, এবং বিশ্বজুড়ে এটি প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর একটি প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

ভাইরাস প্রথমে নাক ও গলার শ্লেষ্মা ঝিল্লি সংক্রমিত করে এবং সাধারণত সংস্পর্শের ১০–১৪ দিনের মধ্যে লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়। সংক্রমণ শুরু হয় জ্বর, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং কাশি দিয়ে, এরপর শরীরে ফুসকুড়ি ছড়িয়ে পড়ে।

 

সংক্রমণের সন্দেহ হলে কী করবেন

  • যদি মনে হয় আপনি হামের সংস্পর্শে এসেছেন এবং আগে টিকা নেননি, তাহলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। 
  • সংস্পর্শের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে MMR টিকা নিলে সংক্রমণ প্রতিরোধে বা রোগের তীব্রতা কমাতে সাহায্য করতে পারে। 
  • বিকল্প হিসেবে, ৬ দিনের মধ্যে ইমিউনোগ্লোবুলিন দেওয়া যেতে পারে, বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে। 
  • দ্রুত শনাক্তকরণ ও সময়মতো চিকিৎসা জটিলতার ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ।

হাম আসলে কী কারণে হয়

  • হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। 
  • এটি শ্বাসতন্ত্রকে আক্রান্ত করে এবং সাধারণত নাক, মুখ বা গলার নিঃসরণ থেকে ছড়ায়। 
  • ভাইরাস শরীরে ঢোকার পর দ্রুত বিস্তার লাভ করে এবং জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া ও ফুসকুড়ির মতো উপসর্গ তৈরি করে।

কীভাবে এত দ্রুত ছড়ায়

  • আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি, হাঁচি বা কথা বললে ভাইরাসবাহী ক্ষুদ্র কণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। 
  • এসব কণা বাতাসে বা পৃষ্ঠে প্রায় ২ ঘণ্টা পর্যন্ত থাকতে পারে। 
  • কেউ ওই বাতাস শ্বাসের মাধ্যমে নিলে, বা দূষিত পৃষ্ঠ ছুঁয়ে পরে চোখ-নাক-মুখ স্পর্শ করলে সংক্রমিত হতে পারে। 
  • WHO ও CDC বলছে, হাম বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি।

রোগের ধাপগুলো কেমন

  • ইনকিউবেশন পর্ব: সাধারণত ৭–১৪ দিন; এ সময় দৃশ্যমান লক্ষণ নাও থাকতে পারে। 
  • প্রারম্ভিক উপসর্গ: জ্বর, কাশি, সর্দি, চোখ লাল হওয়া, গলা ব্যথা। 
  • কোপলিক স্পট: মুখের ভেতরে ছোট সাদা দাগ দেখা যেতে পারে। 
  • ফুসকুড়ি পর্ব: মুখ বা কানের পেছন থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। 
  • সেরে ওঠার ধাপ: জ্বর ও ফুসকুড়ি কমে আসে, তবে দুর্বলতা ও কাশি কিছুদিন থাকতে পারে।

সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ

  • উচ্চ জ্বর 
  • শুকনো কাশি 
  • নাক দিয়ে পানি পড়া 
  • চোখ লাল ও পানি পড়া 
  • মুখের ভেতরে সাদা দাগ 
  • পরে লালচে-বাদামি ফুসকুড়ি 
  • ফুসকুড়ি সাধারণত মুখ থেকে শুরু হয়ে নিচের দিকে নামে।

কাদের ঝুঁকি বেশি 

  • যারা টিকা নেয়নি 
  • যেসব এলাকায় টিকাদানের হার কম 
  • দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি 
  • ভিটামিন এ-এর ঘাটতি আছে এমন শিশু  
  • গর্ভবতী নারী 
  • ছোট শিশু, বিশেষ করে ৫ বছরের কম বয়সীরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। 

যে জটিলতাগুলো হতে পারে 

  • কানের সংক্রমণ 
  • নিউমোনিয়া 
  • শ্বাসনালীর প্রদাহ বা ক্রুপ 
  • ডায়রিয়া 
  • মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস)  
  • গর্ভাবস্থাজনিত জটিলতা 

গুরুতর ক্ষেত্রে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

 

ডাক্তাররা কীভাবে শনাক্ত করেন 

  • উপসর্গ, সংস্পর্শের ইতিহাস এবং ফুসকুড়ির ধরণ দেখে প্রাথমিকভাবে সন্দেহ করা হয়। 
  • প্রয়োজনে IgM অ্যান্টিবডি টেস্ট বা RT-PCR করে নিশ্চিত করা যায়। 

সংস্পর্শে এলে কী কী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা আছে 

  • MMR টিকা: সংস্পর্শের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দিলে উপকার হতে পারে। 
  • ইমিউনোগ্লোবুলিন: ৬ দিনের মধ্যে দিলে কিছু ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিকে সুরক্ষা দিতে পারে। 
  • বিশেষ করে অতি অল্পবয়সী শিশু, গর্ভবতী নারী এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা ব্যক্তিদের জন্য দ্রুত চিকিৎসা পরামর্শ জরুরি। 

চিকিৎসা কী 

  • হামের নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। 
  • মূলত সহায়ক চিকিৎসা দেওয়া হয়: 
    • জ্বর কমানোর ওষুধ 
    • পর্যাপ্ত পানি ও তরল 
    • বিশ্রাম 
    • কাশি বা গলা আরামে আর্দ্রতা 
    • প্রয়োজন হলে ভিটামিন এ 
  • যদি ব্যাকটেরিয়াল জটিলতা হয়, তখন অ্যান্টিবায়োটিক লাগতে পারে। 

প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় 

  • সময়মতো MMR টিকা নেওয়া 
  • প্রাদুর্ভাবের সময় টিকা বাকি থাকলে দ্রুত পূরণ করা 
  • আক্রান্ত ব্যক্তিকে অন্তত ফুসকুড়ি ওঠার পর ৪ দিন আলাদা রাখা 
  • ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা 
  • উচ্চ টিকাদান কাভারেজ বজায় রাখা।  

কখন অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যাবেন 

  • হামের সংস্পর্শে এসেছেন বলে সন্দেহ হলে 
  • উচ্চ জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া ও ফুসকুড়ি দেখা দিলে 
  • রোগী যদি শিশু, গর্ভবতী নারী বা দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কেউ হন 
  • শ্বাসকষ্ট, বিভ্রান্তি, খিঁচুনি বা অবস্থা খারাপ হতে থাকলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।

সূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা


সম্পর্কিত নিউজ