{{ news.section.title }}
জন্ডিস হলে ভয়ের কিছু নেই! লক্ষণ ও দ্রুত সুস্থ হওয়ার গাইড জানুন!
চোখ কিংবা নখ হলুদ হয়ে যাওয়া মানেই কি আপনি জন্ডিসে আক্রান্ত? চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, জন্ডিস নিজে কোনো রোগ নয়, এটি আমাদের শরীরের সবচেয়ে কর্মঠ অঙ্গ লিভারের একটি জরুরি বিপদ সংকেত কেবল। যখন রক্তে বিলিরুবিন নামক হলুদাভ রঞ্জক পদার্থের মাত্রা অস্বাভাবিকভাব্ব বৃদ্ধি পায়, তখনই শরীর আমাদের এই হলুদ আভার মাধ্যমে সতর্ক করে। কিন্তু কেন এমনটা হয়? আজকের বিশদ প্রতিবেদনে আমরা আলোচনা করব জন্ডিসের প্রকৃত কারণ এবং এর ঘরোয়া প্রতিকার নিয়ে।
জন্ডিস কেন হয়?
আমাদের রক্তে লোহিত রক্তকণিকা বা রেড ব্লাড সেল প্রতিনিয়ত ভেঙে যায় এবং নতুন কোষ তৈরি হয়। এই পুরনো কোষগুলো ভেঙে যাওয়ার সময় উপজাত হিসেবে বিলিরুবিন তৈরি হয়। সুস্থ অবস্থায় লিভার এই বিলিরুবিনকে প্রক্রিয়াজাত করে পিত্তরসের মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে দেয়। কিন্তু যদি লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা পিত্তনালীতে কোনো বাধা থাকে, তবে বিলিরুবিন রক্তের মধ্যে মিশে যায়। যখন রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা ২.৫ - ৩.০ mg/dL অতিক্রম করে, তখনই শরীরের চামড়া ও মিউকাস মেমব্রেন হলুদ বর্ণ ধারণ করে।
ধরণ ও কারণসমূহ:
চিকিৎসা বিজ্ঞানে জন্ডিসকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে:
১. হেপাটোসেলুলার জন্ডিস: এটি সরাসরি লিভারের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে হয়। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
☞ ভাইরাল হেপাটাইটিস: হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি এবং ই ভাইরাসের আক্রমণ। দূষিত পানি ও খাবার থেকে সাধারণত হেপাটাইটিস 'এ' এবং 'ই' ছড়ায়।
☞ অ্যালকোহল: অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলে লিভারে প্রদাহ বা লিভার সিরোসিস হওয়া।
☞ ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: প্যারাসিটামল বা কিছু অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ডোজ লিভারের ক্ষতি করতে পারে।
২. অবস্ট্রাক্টিভ জন্ডিস : যদি লিভার বিলিরুবিন তৈরি করতে পারে কিন্তু তা পিত্তনালী দিয়ে বের হতে না পারে, তবে তাকে অবস্ট্রাক্টিভ জন্ডিস বলে। এর কারণ হতে পারে:
☞ পিত্তথলিতে পাথর ।
☞ পিত্তনালীতে টিউমার বা প্রদাহ ।
৩. হেমোলাইটিক জন্ডিস : যদি লিভারের ক্ষমতার চেয়েও দ্রুত গতিতে লোহিত রক্তকণিকা ভাঙতে শুরু করে, তবে রক্তে বিলিরুবিনের আধিক্য দেখা দেয়। এটি সাধারণত ম্যালেরিয়া, থ্যালাসেমিয়া বা কিছু বিশেষ রক্তজনিত সমস্যার কারণে হয়।
লক্ষণসমূহ:
জন্ডিস আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে নিচের পরিবর্তনগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
১। চোখ এবং ত্বকের সাদা অংশ হলুদ হয়ে যাওয়া।
২। প্রস্রাবের রঙ গাঢ় হলুদ বা সরিষার তেলের মতো হওয়া।
৩। বিলিরুবিন চামড়ার নিচে জমা হওয়ার কারণে
শরীর চুলকানো।
৪। প্রচণ্ড ক্লান্তি, বমি বমি ভাব এবং ক্ষুধা মন্দা।
৫। পেটের ডান দিকে (লিভারের অবস্থানে) হালকা ব্যথা বা ভারী ভাব।
জন্ডিস নিরাময়ে সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও প্রতিকার:
জন্ডিস হলে লিভারের ওপর চাপ কমানো এবং তাকে বিশ্রাম দেওয়া খুবই জরুরি। এর জন্য নিচের নিয়মগুলো অনুসরণ করা আবশ্যক:
১. পর্যাপ্ত তরল ও পানি পান: লিভার থেকে টক্সিন বের করে দিতে প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে। গ্লুকোজের পানি বা বাড়িতে তৈরি
ফলের রস অত্যন্ত উপকারী। তবে বাইরের খোলা শরবত বা আখের রস খাওয়া যাবে না, কারণ তা থেকে হেপাটাইটিস-ই ছড়িয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ করতে পারে।
২. ফ্যাট বা চর্বিযুক্ত খাবার বর্জন: জন্ডিস আক্রান্ত লিভার চর্বি হজম করতে পারে না। তাই তেল এবং মসলাযুক্ত খাবার, ঘি, মাখন এবং ফাস্ট ফুড সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হবে। এর পরিবর্তে সহজে হজম হয় এমন কার্বোহাইড্রেট, যেমন: নরম ভাত, সুজি, রুটি খেতে হবে।
৩. প্রোটিন গ্রহণ সীমিত করা: তীব্র জন্ডিসের সময় মাছ-মাংসের প্রোটিন হজম করা লিভারের জন্য কষ্টকর হতে পারে। তবে সুস্থ হওয়ার পর্যায়ে হালকা প্রোটিন, যেমন: পাতলা ডাল বা অল্প মুরগির মাংস শুরু করা যায়।
৪. বিশ্রাম ও পরিচ্ছন্নতা: জন্ডিস হলে পর্যাপ্ত শারীরিক বিশ্রাম অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া রোগীর থালা বাসন ও ব্যবহারের জিনিসপত্র আলাদা রাখা এবং হাত ধোয়ার অভ্যাস করা উচিত যাতে সংক্রমণ না ছড়ায়।
সতর্কতা:
আমাদের দেশে জন্ডিস হলে অনেকে হাত ধোয়ানো বা ঝাড়ফুঁকের আশ্রয় নিয়ে থাকেন। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এর কোনো ভিত্তি নেই। জন্ডিস একটি শরীরের অভ্যন্তরীণ সমস্যা যা সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং বিশ্রামে সেরে যায়। অপচিকিৎসার ফলে অনেক সময় লিভার ফেইলিউর হওয়ার ঝুঁকি থাকে। লক্ষণ দেখা দিলে অবশ্যই একজন হেপাটোলজিস্ট বা লিভার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিশুদ্ধ পানি পান করা, রাস্তার ধারের অস্বাস্থ্যকর খাবার এড়িয়ে চলা এবং হেপাটাইটিস বি-এর টিকা গ্রহণ করার মাধ্যমে এই ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।