{{ news.section.title }}
কেন খামেনির চেহলাম অনুষ্ঠান স্থগিত করল ইরান
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে ঘিরে ৪০ দিন পূর্তির শোকানুষ্ঠান-যাকে ইরানে ‘চেহলাম’ বা ‘চেহেলোম’ বলা হয়-স্থগিত হওয়ার খবরে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সাধারণত এই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয়ভাবে বড় জনসমাগম, উচ্চ পর্যায়ের উপস্থিতি, বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি দেখা যায়। কিন্তু বর্তমান সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে ইরান যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা অনেকের কাছে ইঙ্গিত দিচ্ছে-রাষ্ট্র এখন একযোগে নিরাপত্তা ঝুঁকি ও নেতৃত্ব-পরিবর্তনের সংবেদনশীল প্রক্রিয়া সামাল দিতে চাইছে।
বড় আয়োজন মানেই বড় ঝুঁকি-যুদ্ধাবস্থায় জনসমাগম টার্গেট হতে পারে
বিশ্লেষকদের মতে, চেহলাম ধরনের বড় সমাবেশ বর্তমানে ইরানের জন্য ‘উচ্চ ঝুঁকির’ আয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলমান উত্তেজনা ও হামলার আশঙ্কা থাকলে-যেকোনো বড় অনুষ্ঠান সহজেই সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। কারণ, এমন আয়োজনে একদিকে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি থাকে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের শীর্ষপর্যায়ের ব্যক্তি ও নিরাপত্তা কাঠামো এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত হয়। ফলে নিরাপত্তার সামান্য দুর্বলতাও বড় বিপর্যয় তৈরি করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠান স্থগিত করার সিদ্ধান্তকে অনেকেই দেখছেন “ঝুঁকি কমানোর” পদক্ষেপ হিসেবে-অর্থাৎ, রাষ্ট্র প্রথমে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইছে, তারপর বড় জনসমাবেশে যেতে চাইবে।
উত্তরসূরি নির্বাচন-সময়ের দরকার, ভুল হলে ক্ষতি বড়
চেহলাম স্থগিতের আরেকটি বড় কারণ হতে পারে নতুন সুপ্রিম লিডার নির্বাচন নিয়ে চলমান প্রক্রিয়া। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা পদটি শুধু প্রতীকী নয়-এই পদে থাকা ব্যক্তি রাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী সিদ্ধান্তকেন্দ্র। প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি ও রাষ্ট্রের মূল কৌশলগত দিকগুলোতে চূড়ান্ত কর্তৃত্ব এ পদেই কেন্দ্রীভূত থাকে।
এ কারণেই উত্তরসূরি নির্বাচনে তাড়াহুড়ো যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি দীর্ঘসূত্রতাও অনিশ্চয়তা বাড়াতে পারে। বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি ইরানের জন্য “হাই-স্টেকস ট্রানজিশন”-এখানে যেকোনো ভুল সিদ্ধান্ত অভ্যন্তরীণ বিভাজন, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। তাই প্রয়োজন হয় ব্যাপক পরামর্শ, ভেতরের ঐকমত্য এবং বিভিন্ন শক্তিকেন্দ্রের ভারসাম্য নিশ্চিত করার।
অন্তর্বর্তী ব্যবস্থায় রাষ্ট্র চালানো-একসঙ্গে অনেক চাপ
নেতৃত্ব পরিবর্তনের সময় রাষ্ট্র পরিচালনা চালিয়ে যাওয়াটাও বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে সংঘাতপূর্ণ পরিবেশে প্রতিদিনই নিরাপত্তা সিদ্ধান্ত, কূটনৈতিক বার্তা, সামরিক প্রস্তুতি ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন পড়ে।
এই বাস্তবতায়, শোকানুষ্ঠান পরিচালনার মতো বড় আয়োজনের প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গেলে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা সক্ষমতার উপর বাড়তি চাপ পড়ে। ফলে সিদ্ধান্ত হতে পারে-আগে রাষ্ট্র পরিচালনার জরুরি কাজগুলো স্থিতিশীল করা, তারপর বড় আয়োজন করা।
রাজনৈতিক বার্তা ও বৈধতা-সময়টা গুরুত্বপূর্ণ
চেহলাম অনুষ্ঠান কেবল ধর্মীয় বা সামাজিক শোক প্রকাশ নয়-ইরানের ক্ষেত্রে এটি রাজনৈতিক বার্তাও দেয়। বড় সমাবেশ মানে জনসমর্থন, রাষ্ট্রীয় ঐক্য ও বৈধতার প্রদর্শন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে যদি আয়োজন আশানুরূপ না হয়, নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকে, কিংবা নেতৃত্ব নির্বাচন অনিশ্চিত থাকে-তাহলে সেই আয়োজন উল্টো বার্তা দিতে পারে।
এ কারণে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন, অনুষ্ঠান বাতিল নয়-বরং “সময় পিছিয়ে” দেওয়া হয়েছে, যাতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে, নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রক্রিয়া স্পষ্ট করে-তারপর তুলনামূলক শক্ত অবস্থান থেকে আয়োজন করা যায়।
সামনে কী হতে পারে
চেহলাম স্থগিত থাকার অর্থ হলো-ইরানের রাজনৈতিক সময়সূচি এখন মূলত দুই বিষয়ে ঘুরছে:
- নিরাপত্তা পরিস্থিতি কত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে
- নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন কত দ্রুত চূড়ান্ত হয়
এই দুই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে কবে এবং কীভাবে বড় আকারে রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে এটি স্পষ্ট-ইরানের জন্য এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হচ্ছে স্থিতিশীলতা ধরে রাখা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা।