{{ news.section.title }}
কারা হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করার অনুমতি পেলো, জানল ইরান
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার কোনো “পরিকল্পনা নেই”-ইরানের সামরিক বাহিনীর এক মুখপাত্রের এমন বক্তব্যের মধ্যেও উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই নৌপথে জাহাজ চলাচল দ্রুত কমে যাওয়ার চিত্রই এখন বেশি উদ্বেগ তৈরি করছে।
ইরান বলছে, সাধারণভাবে কোনো দেশের জাহাজকে তারা বাধা দেবে না-তবে এই পথে চলাচলের নিরাপত্তার দায় সংশ্লিষ্ট জাহাজ কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে। একই সঙ্গে তেহরানের কড়া সতর্কবার্তা হলো-যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করলে সেটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে। এতে করে “খোলা থাকবে” ধরনের বক্তব্য থাকলেও বাস্তবে ঝুঁকি এতটাই বেড়েছে যে অনেক শিপিং অপারেটর ও বিমা প্রতিষ্ঠান রুট পরিবর্তন বা অপেক্ষার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বলে বাজার বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
অন্যদিকে আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী (আইআরজিসি) সংশ্লিষ্ট বক্তব্য তুলে ধরে বলা হয়েছে-তেহরানের নিরাপত্তা বয়ান আরও কঠোর। সেখানে আইআরজিসির একজন জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা দাবি করেন, প্রণালিটি “বন্ধ” এবং কেউ পার হতে চাইলে হামলার মুখে পড়বে। এই ধরনের অবস্থান-একদিকে “বন্ধ নয়” বলা, অন্যদিকে “হামলার হুঁশিয়ারি”-বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে, কারণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্ব তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের বড় অংশ পরিবহন হয়।
এই টানাপোড়েনের মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে চীনের ভূমিকায়। রয়টার্সের বরাতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে অপরিশোধিত তেল ও কাতারের এলএনজিবাহী জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে বেইজিং। তিনটি কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়-মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল চীন প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত অচল হয়ে পড়ায় অস্বস্তিতে আছে এবং তেহরানকে নিরাপদ চলাচলের অনুমতি দিতে চাপ দিচ্ছে। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চীনের প্রয়োজনীয় তেলের বড় অংশ (প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী প্রায় ৪৫ শতাংশ) এই প্রণালি দিয়েই আসে-ফলে সরবরাহ বিঘ্নিত হলে চীনের শিল্প-অর্থনীতিতে দ্রুত প্রভাব পড়তে পারে।
যুদ্ধের শুরুর পর থেকে জাহাজ চলাচলের সংখ্যাও নাটকীয়ভাবে কমেছে বলে একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ভেসেল-ট্র্যাকিং তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়-জানুয়ারি থেকে গড়ে প্রতিদিন যেখানে প্রায় ২৪টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করত, সংঘাত শুরুর পর ১ মার্চ তা নেমে আসে মাত্র ৪টিতে। একই সঙ্গে ভোরটেক্সা ও জাহাজ ট্র্যাকার কেপলারের তথ্য উল্লেখ করে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, প্রায় ৩০০টি তেলবাহী ট্যাংকার ওই জলপথের ভেতরে আটকে আছে। এই অবস্থায় বাজার স্বাভাবিক করতে নিয়মিত ও বড় পরিসরে জাহাজ চলাচল জরুরি হলেও, বাস্তবে ঝুঁকি-ভীতি সেই প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে।
প্রতিবেদনে আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার উল্লেখ রয়েছে-‘আয়রন মেইডেন’ নামের একটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার সময় নিজের সিগন্যালিং/পরিচয় বার্তায় “চীনা মালিকানাধীন” ধরনের ইঙ্গিত দেখিয়ে পথ অতিক্রম করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এমন ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দেয়-এই সংকটে “কার মালিকানাধীন” বা “কোন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক” অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ঝুঁকি নির্ধারণে বাস্তব প্রভাব ফেলছে। তবে একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে-এভাবে হাতে গোনা কিছু জাহাজ পার হলেও বাজারকে স্থিতিশীল করতে দৈনিক আরও অনেক জাহাজের স্বাভাবিক চলাচল দরকার।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ইরানের বার্তা এখন দ্বিমুখী: আনুষ্ঠানিকভাবে “বন্ধ নয়” বা “বাধা দেব না”-কিন্তু উচ্চ ঝুঁকির ঘোষণা এবং নির্দিষ্ট দেশের জাহাজকে লক্ষ্য করার হুঁশিয়ারি। এই অনিশ্চয়তায় তেলের দামে চাপ বাড়ছে বলেও রয়টার্স-উদ্ধৃত প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে-সংঘাত শুরুর পর থেকে অপরিশোধিত তেলের দাম ১৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ফলে সামনে পরিস্থিতি যদি একইভাবে উত্তপ্ত থাকে, তাহলে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, শিপিং খরচ বৃদ্ধি (ফ্রেইট/ইনস্যুরেন্স), এবং আমদানিনির্ভর দেশগুলোর মূল্যস্ফীতি-সবকিছুই একসঙ্গে বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়ে যাচ্ছে।