কেনো ও কাকে সরি বললো ইরান?

কেনো ও কাকে সরি বললো ইরান?
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
  • লেখক, Showanur Rahman

ইরান বলছে, প্রতিবেশী আরব দেশগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো তাদের উদ্দেশ্য নয়-মূল লক্ষ্য ওই দেশগুলোর ভেতরে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনা। তবে একই সঙ্গে তেহরান স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে-যুদ্ধের তীব্রতা বাড়লে “ভুল বোঝাবুঝি”, পাল্টা প্রতিশোধ এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

এই অবস্থানকে সামনে রেখে মধ্যপ্রাচ্যে এখন তিনটি বিষয় একসঙ্গে এগোচ্ছে: (১) সামরিক পাল্টাপাল্টি হামলা, (২) প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ, (৩) হরমুজ প্রণালি–কেন্দ্রিক জ্বালানি ও বাণিজ্য ঝুঁকি।

“প্রতিবেশীদের সঙ্গে শত্রুতা নেই”-ইরানের বার্তা কী?

ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, আরব প্রতিবেশীদের প্রতি তাদের বৈরিতা নেই; কিন্তু যখন ওই দেশগুলোর ভেতরে মার্কিন ঘাঁটি বা মার্কিন সামরিক অবকাঠামো থাকে, তখন “প্রতিরক্ষামূলক জবাব” দিতে গিয়ে ওই ভূখণ্ডে আঘাত লাগতে পারে-এটা তাদের ভাষ্য। বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তেহরান এই ব্যাখ্যাকে সামনে রেখে আরব দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক “ড্যামেজ কন্ট্রোল” করতে চাইছে-যাতে প্রতিবেশীরা সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়ে এবং রাজনৈতিকভাবে ইরানের বিরুদ্ধে একজোট না হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যের একটি বড় কৌশলগত দিক আছে: ইরান যদি যুদ্ধকে “ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি” হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে, তাহলে আঞ্চলিক জনমত ও কিছু সরকারের ওপর চাপ তৈরি হয়-কারণ অনেক দেশে মার্কিন ঘাঁটি থাকা নিজেই বিতর্কিত ইস্যু। একইসঙ্গে এটি ইরানের জন্য একটি “বাছাইকৃত লক্ষ্যবস্তু” ন্যারেটিভ তৈরি করে-যাতে বেসামরিক স্থাপনা বা প্রতিবেশী দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ কিছুটা ‘ব্যাখ্যাযোগ্য’ করা যায় (যদিও আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ হয়ে যায় না)।

কেন মার্কিন ঘাঁটি-এত গুরুত্বপূর্ণ?

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য সামরিক উপস্থিতি আছে-কাতার (আল উদেইদ), বাহরাইন (পঞ্চম নৌবহর), কুয়েতসহ একাধিক দেশে ঘাঁটি/সুবিধা/প্রি-পজিশনড অবকাঠামো রয়েছে। সংকটকালে এগুলো থেকেই আকাশ প্রতিরক্ষা, নজরদারি, লজিস্টিকস ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া পরিচালিত হয়। তাই তেহরান এই স্থাপনাগুলোকে তাদের নিরাপত্তা ঝুঁকির “সরাসরি উৎস” হিসেবে দেখাতে চায়।

হরমুজ প্রণালি-ঝুঁকি কেন “আঞ্চলিক” থেকে “বিশ্ব” হয়ে যায়?

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র/ইসরায়েল উত্তেজনায় সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক শঙ্কা হলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও গ্যাস পরিবহন ব্যাহত হওয়া। এই জলপথটি বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ “চোকপয়েন্ট”-যেকোনো সামরিক হুমকি, বিমা ব্যয় বৃদ্ধি, জাহাজ চলাচল কমে যাওয়া বা কার্যত অচলাবস্থা দ্রুতই তেল-গ্যাসের দামে চাপ ফেলে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে ধাক্কা দেয়।

এখানেই ইরানের বক্তব্যের আরেকটি স্তর দেখা যায়। একদিকে কিছু বার্তায় বলা হচ্ছে, “প্রণালি বন্ধ করার পরিকল্পনা নেই”-অন্যদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে হরমুজ বন্ধ হতে পারে-এমন সতর্কতাও ইরানের সংশ্লিষ্ট মহল থেকে এসেছে। ইরান ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে অঞ্চলজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে হরমুজ বন্ধ হওয়ার আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে।
ফলে বাস্তবে অনেক জাহাজ কোম্পানি ঝুঁকি কমাতে রুট/সময়সূচি বদলায়, বিমা প্রিমিয়াম বাড়ে, এবং ট্রাফিক কমে-যা “ঘোষিতভাবে বন্ধ নয়” কিন্তু “কার্যত ঝুঁকিপূর্ণ ও ধীর” পরিবেশ তৈরি করে।

চীনের উদ্বেগ কেন আলাদা করে আলোচনায়?

এশিয়ার বড় ক্রেতা দেশগুলো-বিশেষ করে চীন-হরমুজের স্থিতিশীলতার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তাই প্রণালিতে অস্থিরতা বাড়লে বেইজিং কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করতে পারে-যাতে জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীল থাকে। সাম্প্রতিক নানা আন্তর্জাতিক ব্যাখ্যা-প্রতিবেদনে দেখা যায়, চীন সাধারণত এমন সংকটে “ডি-এসক্যালেশন” ও বাণিজ্যিক পথ নিরাপদ রাখার পক্ষে কূটনৈতিক চাপ বাড়াতে আগ্রহী থাকে-কারণ দীর্ঘ অচলাবস্থা তাদের আমদানি ব্যয় ও শিল্পখাতে প্রভাব ফেলতে পারে। (এটি সরাসরি সামরিক অবস্থান নয়, বরং জ্বালানি নিরাপত্তা–কেন্দ্রিক বাস্তববাদী কৌশল।)

আরব প্রতিবেশীরা কী ঝুঁকিতে?

ইরান যখন বলে “লক্ষ্য মার্কিন ঘাঁটি”, তখন আরব দেশগুলোর জন্য ঝুঁকি তিন রকম:

সার্বভৌম নিরাপত্তা ঝুঁকি: নিজ ভূখণ্ডে হামলা হলে সরকারকে প্রতিক্রিয়া দেখাতে হয়-এতে তারা অনিচ্ছায় সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।

অর্থনৈতিক ঝুঁকি: বিমা, বন্দর, এয়ারস্পেস, বিনিয়োগ-সবখানে অনিশ্চয়তা বাড়ে।

অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ঝুঁকি: জনমত, বিক্ষোভ, সাম্প্রদায়িক/রাজনৈতিক উত্তেজনা-সবকিছুর ওপর চাপ পড়ে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র টানাপোড়েন

বিশ্লেষকদের সাধারণ মূল্যায়ন হলো-যদি পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত থাকে, তাহলে ইরান “প্রতিবেশীদের দুঃখিত” বললেও মাঠের বাস্তবতায় ঘটনাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্ররা ঘাঁটি রক্ষায় প্রতিরক্ষা জোরদার করলে ইরান সেটিকে “উস্কানি” হিসেবে দেখাতে পারে। এই টানাপোড়েনে সবচেয়ে বড় ভয়ের জায়গা হলো ভুল হিসাব (miscalculation)-একটি বড় হামলা বা বড় ক্ষয়ক্ষতি পরিস্থিতিকে দ্রুত বিস্তৃত যুদ্ধে ঠেলে দিতে পারে; যার সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিফলন পড়বে হরমুজ–কেন্দ্রিক জ্বালানি বাজার ও শিপিং-এ।

 


সম্পর্কিত নিউজ