জানালা বদলালেই বদলাবে বিদ্যুৎ বিল,স্মার্ট গ্লাস উইন্ডোজের নতুন যুগ!
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
শহরের আকাশচুম্বী ভবন, আধুনিক অফিস কিংবা বিলাসবহুল আবাসন সব জায়গাতেই আজ একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, কীভাবে বিদ্যুৎ খরচ কমানো যায় কিন্তু আরাম বজায় রেখে! গরমের দিনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের চাপ আর শীতে প্রয়োজন কৃত্রিম উত্তাপের, এই দুইয়ের মাঝেই ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে এক নতুন প্রযুক্তি, যার নাম স্মার্ট গ্লাস উইন্ডোজ। সাধারণ কাচের মতো দেখালেও এই জানালাগুলো আসলে শক্তি সাশ্রয়ের একটি অস্ত্র, যা আলো, তাপ ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরন পাল্টে দিতে সক্ষম।
এক সময় জানালার কাজ ছিল বাইরে তাকানো আর বাতাস চলাচলের সুযোগ দেওয়া। কিন্তু আধুনিক নগরজীবনে জানালাই এখন ভবনের সবচেয়ে বড় দুর্বল জায়গা। এখান দিয়েই অতিরিক্ত তাপ প্রবেশ করে আর ঠান্ডা হাওয়া বেরিয়ে যায়,ফলে এসির ওপর চাপ বাড়ে। স্মার্ট গ্লাস উইন্ডোজ এই ধারণাটাকেই উল্টে দিয়েছে। এই প্রযুক্তির কাচ নিজেই বুঝতে পারে কখন আলো দরকার, কখন তাপ আটকে রাখা প্রয়োজন, আবার কখন সবকিছু বন্ধ করে দেওয়া উচিত।
স্মার্ট গ্লাস আসলে কী?
সহজভাবে বলতে গেলে, স্মার্ট গ্লাস এমন এক ধরনের কাচ, যার স্বচ্ছতা ও তাপ গ্রহণের ক্ষমতা প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়। বাইরে সূর্যের আলো তীব্র হলে কাচ নিজে থেকেই গাঢ় হয়ে যায়, ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। আবার আলো কম হলে কাচ স্বচ্ছ হয়ে যায়, যাতে প্রাকৃতিক আলো ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। এর ফলে দিনের বড় একটা সময় কৃত্রিম আলো জ্বালানোর প্রয়োজন পড়ে না।
এই কাচে সাধারণ কাচের মতো শুধু সিলিকা নেই। এর ভেতরে থাকে বিশেষ স্তর ও উপাদান, যা বৈদ্যুতিক সংকেত, আলো বা তাপের প্রতিক্রিয়ায় নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বদলাতে পারে। কিছু স্মার্ট গ্লাস বিদ্যুৎ সংকেতে কাজ করে অর্থাৎ একটি সুইচ বা স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমের মাধ্যমে কাচের রঙ বা স্বচ্ছতা বদলে যায়। আবার কিছু স্মার্ট গ্লাস সূর্যের আলো বা তাপের ওপর নির্ভর করে নিজে থেকেই রূপ বদলায়, কোনো আলাদা নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই।
অফিসের ভবনগুলোতে দিনের বেলায় সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ খরচ হয়, আলো ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণে। স্মার্ট গ্লাস জানালা দিনের আলোকে দক্ষভাবে কাজে লাগিয়ে এই খরচ অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে। সূর্যের আলো যখন প্রয়োজনের বেশি হয়, কাচ তা ছেঁকে নেয়। ফলে ভেতরের পরিবেশ আরামদায়ক থাকে। আবার মেঘলা দিনে কাচ স্বচ্ছ হয়ে প্রাকৃতিক আলো ঢুকতে দেয়। এর ফলে লাইট জ্বালানোর প্রয়োজন কমে যায়, যা সরাসরি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সঙ্গে যুক্ত।
গ্রীষ্মপ্রধান দেশগুলোতে ভবনের ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সাধারণ কাচ সূর্যের তাপ প্রায় পুরোপুরি ভেতরে ঢুকতে দেয়। স্মার্ট গ্লাস এই জায়গাতেই পার্থক্য তৈরি করে। এটি সূর্যের ক্ষতিকর তাপ প্রতিফলিত বা শোষণ করে নেয়, ভেতরের তাপমাত্রা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রাখে। এতে করে এসির ওপর চাপ কমে, বিদ্যুৎ খরচ কমে এবং যন্ত্রের আয়ুষ্কালও বাড়ে।
শুধু গ্রীষ্ম নয়, শীতপ্রধান অঞ্চলেও স্মার্ট গ্লাস জানালা কার্যকর। শীতে এই কাচ ভেতরের তাপ বাইরে বেরোতে বাধা দেয়। অর্থাৎ হিটার বা অন্যান্য উত্তাপের যন্ত্রের ব্যবহার কমে যায়। এক ধরনের তাপীয় ঢাল হিসেবে কাজ করে এই জানালা, যা সারা বছরই শক্তি ব্যবস্থাপনাকে আরও দক্ষ করে তোলে।
এনার্জি সেভিং মানেই শুধু বিদ্যুৎ বিল কমানো তা কিন্তু নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবেশের প্রশ্নও। বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে কার্বনের নিঃসরণ সরাসরি সম্পর্কিত। স্মার্ট গ্লাস জানালা ব্যবহার করলে ভবনের মোট শক্তি-চাহিদা কমে, যার অর্থ কম বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং কম কার্বন নিঃসরণ। শহরের বড় বড় ভবনে এই প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহার হলে পরিবেশগত প্রভাবও উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।
বিশ্বের অনেক শহর এখন ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনায় শক্তি দক্ষ ভবনের দিকে ঝুঁকছে। স্মার্ট গ্লাস জানালা সেখানে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠছে। নতুন নির্মাণের পাশাপাশি পুরোনো ভবনেও এই কাচ বসানোর প্রবণতা বাড়ছে। এতে ভবনের নকশা বদলাতে হয় না, কিন্তু শক্তি ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আসে।
স্মার্ট গ্লাস জানালার আরেকটি বড় সুবিধা হলো গোপনীয়তা। প্রয়োজন হলে কাচ পুরোপুরি অস্বচ্ছ করে দেওয়া যায়, পর্দা বা ব্লাইন্ড ব্যবহারের দরকার পড়ে না। অফিসের মিটিং রুম, হাসপাতালের কেবিন কিংবা বাসাবাড়ির ব্যক্তিগত ঘরে এটি বাড়তি সুবিধা দেয়। একই সঙ্গে আলো ও তাপ নিয়ন্ত্রণের সুবিধা তো আছেই।
প্রথম দেখায় স্মার্ট গ্লাস জানালার দাম সাধারণ কাচের তুলনায় অনেক বেশি মনে হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয়, কম রক্ষণাবেক্ষণ এবং যন্ত্রপাতির কম ব্যবহার এই খরচ পুষিয়ে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে, কয়েক বছরের মধ্যেই বিনিয়োগের টাকা উঠে আসে। তাই এটি শুধু প্রযুক্তিগত নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও একটি বাস্তবসম্মত সমাধান।
প্রযুক্তি এখানেই থেমে নেই। স্মার্ট গ্লাসকে আরও উন্নত করার চেষ্টা চলছে প্রতিনিয়ত, যাতে এটি ভবনের স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হতে পারে। ভবিষ্যতে এমন জানালাও দেখা যেতে পারে, যা আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী নিজে থেকেই প্রস্তুতি নেবে, কিংবা সৌরশক্তি সংগ্রহ করে ভবনের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় সরাসরি অবদান রাখবে।
উষ্ণ আবহাওয়া ও ক্রমবর্ধমান নগরায়নের কারণে বাংলাদেশসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশে বিদ্যুৎ চাহিদা দিন দিন বাড়ছে তো বাড়ছেই । স্মার্ট গ্লাস জানালা এই চাপ কমানোর একটি কার্যকর উপায় হতে পারে। ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক ভবন, শপিং মল, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই প্রযুক্তির ব্যবহার শক্তি ব্যবস্থাপনায় বড় অবদান রাখতে পারে।
স্মার্ট গ্লাস উইন্ডোজ কোনো বিলাসী সাজসজ্জা নয়, আধুনিক জীবনের একটি বাস্তব প্রয়োজন মাত্র। আলো, তাপ ও শক্তি ব্যবহারের বুদ্ধিমান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এই প্রযুক্তি ভবনকে করে তোলে আরও আরামদায়ক, পরিবেশবান্ধব ও অর্থনৈতিকভাবে টেকসই। আজ যে জানালাগুলো নীরবে কাজ করছে, ভবিষ্যতে সেগুলিই হয়তো শহরের শক্তি ব্যবস্থাপনার প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।
আপনার প্রতিক্রিয়া জানান
মন্তব্যসমূহ
এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।