রাত নামলেই কেন বিড়াল হঠাৎ দৌড়ঝাঁপ শুরু করে? ঘরের অদ্ভুত রহস্য যা আপনার অজানা!

রাত নামলেই কেন বিড়াল হঠাৎ দৌড়ঝাঁপ শুরু করে? ঘরের অদ্ভুত রহস্য যা আপনার অজানা!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

রাত গভীর। সব ঘরের আলো নিভে এসেছে, চারপাশে শুনশান নীরবতা। ঠিক তখনই হঠাৎ একটি শব্দ, তারপর আরেকটি। কখনো সোফার ওপর লাফ, কখনো পর্দার পাশে ছুটে যাওয়া, আবার কখনো অদৃশ্য কিছুর পেছনে তীব্র তাড়া। অনেক বিড়ালপ্রেমীর কাছেই এই দৃশ্য নতুন কিছু নয়। দিনের বেলায় যে বিড়ালটি অলসভাবে ঘুমিয়ে কাটায়, রাত নামলেই সে যেন একদমই বদলে যায়। প্রশ্ন আসে,বিড়াল রাতের বেলা কেন হঠাৎ হঠাৎ এমন দৌড়ঝাঁপ শুরু করে?

এই আচরণ কোনো অস্বাভাবিকতা নয়, বরং এটি বিড়ালের স্বাভাবিক জীববৈজ্ঞানিক, মানসিক ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্যের সম্মিলিত প্রকাশ। বিষয়টি বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে বিড়ালের প্রকৃতি, তাদের বিবর্তন এবং তাদের দৈনন্দিন অভ্যাসের দিকে।

বিড়াল কিন্তু নিশাচর নয়, আবার পুরোপুরি দিবাচরও না। অনেকেরই ধারণা বিড়াল হয়তো নিশাচর প্রাণী। কিন্তু বাস্তবে বিড়াল পুরোপুরি নিশাচর নয়, তারা ক্রেপাসকুলার। অর্থাৎ ভোর ও সন্ধ্যার মাঝামাঝি সময়ে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে। প্রকৃতিতে এই সময়টিই ছোট শিকারদের চলাচলের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। ইঁদুর, পাখি বা ছোট প্রাণীরা তখন বের হয়, আলোও থাকে কম, আবার পুরো অন্ধকারও থাকে না।

গৃহপালিত বিড়াল হাজার বছর ধরে মানুষের সঙ্গে থাকলেও তাদের এই প্রাচীন শিকারি ছন্দ পুরোপুরি বদলায়নি। দিনের বেলা তারা বিশ্রাম নেয়, শক্তি জমায়। আর রাত নামলেই সেই সঞ্চিত শক্তি বেরিয়ে আসে আচমকা দৌড়ঝাঁপের মাধ্যমে।

একটি সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক বিড়াল দিনে গড়ে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা ঘুমায়। কখনো কখনো এই সময় আরো বেশিও হতে পারে। কিন্তু এই ঘুম গভীর ও দীর্ঘ নয়। বেশিরভাগ সময়ই তা হালকা, তন্দ্রা। দিনের বেলায় এই বিশ্রামের মূল উদ্দেশ্যই হলো শক্তি সঞ্চয় করা।

ফলাফল হিসেবে রাতে, যখন চারপাশ শান্ত এবং উদ্দীপনা কম, তখন বিড়ালের শরীরে জমে থাকা শক্তি হঠাৎ করে বেরিয়ে আসে। এই শক্তি নিঃসরণের অন্যতম উপায় হলো দৌড়ানো, লাফানো, খেলাধুলার মতো আচরণ।

বিড়ালের মস্তিষ্কে শিকারি প্রবৃত্তি অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে থাকে। রাতের নীরবতায় সামান্য শব্দ, আলো-ছায়ার পরিবর্তন বা পর্দার নড়াচড়া, তাদের কাছে সম্ভাব্য শিকারের ইঙ্গিত হিসেবে ধরা দেয়। মানুষের চোখে যেটা কিছুই না, বিড়ালের সংবেদনশীল কান ও চোখে সেটাই  উদ্দীপনা। ফলে তারা হঠাৎ করে দৌড়াতে শুরু করে, যেন অদৃশ্য কোনো কিছুকে ধরার চেষ্টা করছে।

রাতে ঘর তুলনামূলকভাবে নীরব থাকে। দিনের ব্যস্ত শব্দ অর্থাৎ মানুষের কথা, টিভি, গাড়ির আওয়াজ ইত্যাদি থাকেনা । এই নীরবতা বিড়ালের ইন্দ্রিয়কে আরও তীক্ষ্ণ করে তোলে। ফ্রিজের হালকা শব্দ, দেয়ালের ভেতরে কোনো পোকা বা বাইরের কোনো অচেনা আওয়াজ রাতে অনেক বেশি স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। এই অতিরিক্ত সংবেদনশীলতাই অনেক সময় তাদের হঠাৎ দৌড়ঝাঁপের কারণ হয়।

গৃহপালিত অনেক বিড়াল দিনের বেলা একা থাকে। মালিক কাজে বাইরে, খেলাধুলার সুযোগ কম। ফলে তাদের মানসিক উদ্দীপনা দিনের বেলায় পর্যাপ্তভাবে পূরণ হয় না। রাতে, যখন মানুষ ঘরে ফিরে আসে বা ঘরের পরিবেশ বদলায়, তখন বিড়াল আত্ম প্রকাশের সুযোগ পায়। এই সময়ের দৌড়ঝাঁপ আসলে এক ধরনের জমে থাকা মানসিক চাপ বা একঘেয়েমি দূর করার চেষ্টা।

ছোট বয়সের বিড়াল বা কিটেনদের মধ্যে রাতের দৌড়ঝাঁপ বেশি দেখা যায়। কারণ তাদের শরীরে শক্তি বেশি, শিকারি প্রবৃত্তি আরও তীব্র এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ তুলনামূলক কম থাকে। বয়স্ক বিড়ালদের ক্ষেত্রে আবার এই আচরণ কিছুটা কম হলেও একেবারে চলে যায় না। তবে যদি হঠাৎ করে বয়স্ক বিড়ালের রাতের অস্থিরতা বেড়ে যায়, তখন তা বয়সজনিত পরিবর্তন বা মানসিক বিভ্রান্তির ইঙ্গিতও হতে পারে।

বিড়ালের এই আচরণকে অনেকেই মজা করে “জুমিজ” বলে থাকেন। এটি আসলে শরীরে জমে থাকা অতিরিক্ত শক্তির হঠাৎ মুক্তি। মানুষের ক্ষেত্রে যেমন দীর্ঘ সময় বসে থাকার পর হঠাৎ হাঁটতে ইচ্ছা করে, বিড়ালের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অনেকটা তেমনই।

এই দৌড়ঝাঁপ সাধারণত কয়েক মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। এরপর বিড়াল আবার শান্ত হয়ে পড়ে।

বিড়ালের শরীরে হরমোনের ওঠানামাও আচরণে বেশ প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে অপরিণত বা প্রজনন সক্ষম বিড়ালদের মধ্যে রাতের অস্থিরতা বেশি হতে দেখা যায়। তাছাড়া খাবারের সময়সূচি, দিনের আলো কমে যাওয়া বা মৌসুমি পরিবর্তনও বিড়ালের জৈবঘড়িকে প্রভাবিত করতে পারে, যার ফল রাতের দৌড়ঝাঁপ।

এটি কি চিন্তার কারণ?

সাধারণভাবে, মাঝেমধ্যে রাতের দৌড়ঝাঁপ বিড়ালের জন্য স্বাভাবিক এবং স্বাস্থ্যকর আচরণ। এটি তাদের শরীর ও মনের সুস্থতারই লক্ষণ। তবে যদি এই আচরণ মাত্রাতিরিক্ত হয়ে যায়, যেমন যদি বিড়াল নিজেকে আঘাত করে বসে, সারারাত শান্ত না হয় বা দিনের বেলাও অস্বাভাবিক আচরণ দেখা যায় তখন সেটি মানসিক চাপ, শারীরিক অস্বস্তি বা পরিবেশগত সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।

কীভাবে এই আচরণ সামলানো যায়?

বিড়ালের রাতের দৌড়ঝাঁপ সম্পুর্নভাবে বন্ধ করা সম্ভব নয়। কারণ, এটি বিড়ালের একটি স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। তবে দিনের বেলায় পর্যাপ্ত খেলাধুলা, মানসিক উদ্দীপনা এবং নিয়মিত খাবারের সময়সূচি এই আচরণ অনেকটাই কমাতে পারে।দিনের বেলায় শক্তি খরচ হলে রাতে বিড়াল তুলনামূলক শান্ত থাকে। একই সঙ্গে ঘরের পরিবেশ স্থির ও নিরাপদ রাখা দৌড়ঝাঁপের সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও কমায়।

রাতের নীরবতায় বিড়ালের হঠাৎ দৌড়ঝাঁপ কোনো রহস্যময় আচরণ নয়। এটি প্রকৃতি, বিবর্তন ও দৈনন্দিন অভ্যাসের স্বাভাবিক ফল। দিনের ঘুমে সঞ্চিত শক্তি, শিকারি প্রবৃত্তি, সংবেদনশীল ইন্দ্রিয় ও মানসিক উদ্দীপনার চাহিদার মিলিত রুপ এই আচরণ।

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

❤️
Love
0
(0.00 / 0 total)
👏
Clap
0
(0.00 / 0 total)
🙂
Smile
0
(0.00 / 0 total)
😞
Sad
0
(0.00 / 0 total)

মন্তব্যসমূহ

এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।


সম্পর্কিত নিউজ