শীতের সকালে ব্যায়াম কি শরীরের জন্য বিপদজনক?- বিশেষজ্ঞের সতর্কবার্তা

শীতের সকালে ব্যায়াম কি শরীরের জন্য বিপদজনক?- বিশেষজ্ঞের সতর্কবার্তা
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

শীতের সকাল। চারপাশ কুয়াশাচ্ছন্ন, বাতাসে ঠান্ডার তীক্ষ্ণ ছোঁয়া। অনেকেই এই সময়টাকেই ব্যায়ামের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত বলে মনে করেন। ভোরের তাজা বাতাস আর ফাঁকা রাস্তা!এমন শান্ত পরিবেশে হাঁটা, দৌড় বা শরীরচর্চা করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু এখানে লুকিয়ে আছে এক বড় ভুল ধারণা। শীতের সকালে ঘুম থেকে উঠে হঠাৎ ব্যায়াম শুরু করা শরীরের জন্য উপকারী তো নয়ই, বরং অনেক ক্ষেত্রে তা বিপজ্জনকই বটে। এই ঝুঁকির বিষয়টি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু শরীরের ভেতরে তখন একের পর এক জৈবিক পরিবর্তন ঘটতে থাকে। বিষয়টি বুঝতে হলে শীতকালে আমাদের শরীর কীভাবে কাজ করে, সেটি আগে জানা জরুরি।

শীতে শরীর নিজেই থাকে “সংকুচিত” অবস্থায়! ঠান্ডা আবহাওয়ায় শরীর স্বাভাবিকভাবেই নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করে। তাপ ধরে রাখতে রক্তনালিগুলো সংকুচিত হয়ে যায়, বিশেষ করে হাত-পা ও ত্বকের কাছের অংশে। এর ফলে রক্তচাপ কিছুটা বেড়ে যায় এবং হৃদযন্ত্রকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর এই সংকুচন আরও প্রকট অবিস্থায় থাকে। কারণ, সারারাত শরীর বিশ্রামে ছিল, পেশি ছিল শক্ত, রক্তপ্রবাহ ছিল ধীর। ঠিক এই অবস্থাতেই যদি হঠাৎ দৌড়ানো, ভারী ব্যায়াম বা জোরালো স্ট্রেচিং শুরু করা হয়, তাহলে হৃদযন্ত্র ও রক্তনালির ওপর আচমকা চাপ পড়ে যায়।

সকালের সময় হৃদযন্ত্র সবচেয়ে সংবেদনশীল অবস্থায় থাকে। বৈজ্ঞানিকভাবে দেখা গেছে, ভোর থেকে সকাল, এই সময়টাতে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে। ঘুম থেকে ওঠার পর পর শরীরে কিছু হরমোনের মাত্রা দ্রুত পরিবর্তিত হয়, যা রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন বাড়ায়। শীতের সকালে এই প্রভাব আরও তীব্র হয়। ঠান্ডার কারণে রক্তনালি আগে থেকেই সংকুচিত থাকে। তার ওপর হঠাৎ ব্যায়াম শুরু হলে হৃদযন্ত্রকে দ্বিগুণ চাপ সামলাতে হয়। যারা উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগের ঝুঁকিতে আছেন, তাদের জন্য এটি বিশেষভাবে বিপজ্জনক।

শীতের সকালে শরীরের পেশি ও জয়েন্ট স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি শক্ত থাকে। ঠান্ডায় পেশির নমনীয়তা কমে যায়, রক্ত চলাচল ধীর হয়। এর ফলে পেশি দ্রুত প্রসারিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে না। এই অবস্থায় যফি হঠাৎ ব্যায়াম শুরু করা হয় তাহলে পেশিতে টান, লিগামেন্টে আঘাত বা জয়েন্টে ব্যথা হওয়ার আশঙ্কা অনেক বেড়ে যায়। অনেক সময় মানুষ এই ব্যথাকে তেমন গুরুত্ব না দিয়ে ব্যায়াম চালিয়ে যায়, যা পরে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় রূপ নিতে পারে।

শীতের সকালের ঠান্ডা ও শুষ্ক বাতাস সরাসরি শ্বাসতন্ত্রে প্রভাব ফেলে। হঠাৎ দ্রুত শ্বাস নেওয়া বা দৌড়ানোর সময় ঠান্ডা বাতাস ফুসফুসে ঢুকলে শ্বাসনালি সংকুচিত হতে পারে। বিশেষ করে যাদের হাঁপানি, অ্যালার্জি বা শ্বাসকষ্টের প্রবণতা আছে, তাদের ক্ষেত্রে শীতের সকালে হঠাৎ ব্যায়াম শ্বাস নিতে কষ্ট, বুকে চাপ বা কাশি বাড়িয়ে দিতে পারে। অনেক সময় এটি তাৎক্ষণিক সমস্যা তৈরি করলেও মানুষ বিষয়টিকে অবহেলা করে।

ঘুম থেকে ওঠার পর শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরে। শীতের সকালে এই প্রক্রিয়া আরও ধীর হয়। হঠাৎ ব্যায়াম শুরু করলে শরীরকে খুব দ্রুত তাপ উৎপাদন করতে হয়, যা তার জন্য এক ধরনের ধাক্কা। এই তাপমাত্রার আকস্মিক ওঠানামা হৃদযন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্র ও হরমোনের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি।

অনেকেই মনে করেন, অল্প হাঁটা বা দুই-একবার হাত-পা নেড়েই ব্যায়াম শুরু করা যায়। কিন্তু শীতের সকালে শরীরের জন্য এটি যথেষ্ট নয়। পর্যাপ্ত ওয়ার্ম আপ ছাড়া ব্যায়াম মানে শরীরকে কোনো সতর্কতা ছাড়াই কঠিন কাজে ঠেলে দেওয়া। ওয়ার্ম আপের মূল কাজ হলো ধীরে ধীরে রক্তপ্রবাহ বাড়ানো, পেশিকে উষ্ণ করা এবং হৃদযন্ত্রকে প্রস্তুত করা। এটি ছাড়া ব্যায়াম করলে হঠাৎ আঘাত বা শারীরিক জটিলতার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।

কেন অনেকেই এই বিপদ টের পান না?

শীতের সকালে ব্যায়াম করে অনেকেই বলেন, "আমি তো ঠিকই আছি।” কিন্তু সমস্যা হলো, এই ঝুঁকিগুলো সব সময় তাৎক্ষণিকভাবে ধরা পড়ে না। অনেক ক্ষেত্রে শরীর ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একদিন হালকা মাথা ঘোরা, আরেকদিন বুক ধড়ফড় করা, পরে হাঁটু বা পিঠে ব্যথা ইত্যাদি লক্ষণকে মানুষ আলাদা আলাদা সমস্যা হিসেবে দেখে। কিন্তু মূল কারণ অনেক সময় থাকে শীতের সকালে শরীর প্রস্তুত না থাকতেই হঠাৎ ব্যায়াম শুরু করা।

শীতে ব্যায়াম কি তাহলে একেবারেই করা যাবে না?

এই প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর হলো: ব্যায়াম করা যাবে এবং করা উচিতও । কিন্তু পদ্ধতিটা হতে হবে শরীরবান্ধব ও সময়োপযোগী। শীতের সকালে ব্যায়াম করার আগে শরীরকে সময় দিতে হবে। হালকা নড়াচড়া, ধীরে হাঁটা, শরীর উষ্ণ হওয়ার সুযোগ- এই ধাপগুলো পেরিয়ে, মূল ব্যায়ামে যাওয়া নিরাপদ।

কারা বেশি সতর্ক থাকবেন?

বয়স্ক ব্যক্তি, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা যাদের আছে, তাদের জন্য শীতের সকালে হঠাৎ ব্যায়াম বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। এই শ্রেণির মানুষদের ক্ষেত্রে শরীরের সামান্য অস্বস্তিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। তরুণ ও সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি একেবারে নেই, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই।ঠান্ডার প্রভাব সবার শরীরেই পড়ে, শুধু মাত্রা ভিন্ন হয়ে থাকে।

শীতের সকাল ব্যায়ামের জন্য খারাপ সময়, এই কথা বলার সুযোগ নেই। কিন্তু শীতের সকালে হঠাৎ ব্যায়াম শুরু করা যে বিপজ্জনক, সেটি বিজ্ঞানসম্মতভাবেই প্রমাণিত।  স্বাস্থ্য রক্ষার সবচেয়ে বড় শর্ত হলো শরীরের সংকেত বোঝা। শীতে ব্যায়াম করতে হলে ধৈর্য, প্রস্তুতি ও সচেতনতা, তিনটিই জরুরি। কারণ সুস্থ থাকার তাড়ায় যদি শরীরকেই ঝুঁকির মুখে ফেলা হয়, তাহলে সেই ব্যায়াম আর উপকারে আসে না, বরং ক্ষতির পথ সুগম করে।

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

❤️
Love
0
(0.00 / 0 total)
👏
Clap
0
(0.00 / 0 total)
🙂
Smile
0
(0.00 / 0 total)
😞
Sad
0
(0.00 / 0 total)

মন্তব্যসমূহ

এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।


সম্পর্কিত নিউজ