জিহ্বায় লুকানো ঝুঁকি! টাং হেম্যানজিওমার কারণ, ঝুঁকি ও সতর্কবার্তা

জিহ্বায় লুকানো ঝুঁকি! টাং হেম্যানজিওমার কারণ, ঝুঁকি ও সতর্কবার্তা
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

মুখের ভেতরের অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন আমরা কহুব একটা গুরুত্বের নজরে দেখিনা। বিশেষ করে জিহ্বায় যদি ছোট লালচে বা নীলচে কোনো দাগ, ফোলা অংশ বা নরম গাঁট দেখা যায়, অনেকেই সেটিকে সাময়িক সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় জিহ্বার এমন কিছু পরিবর্তন হতে পারে হেম্যানজিওমা অব টাং (Hemangioma of Tongue)। এটি একটি রক্তনালিজনিত অস্বাভাবিক অবস্থা, যা বেশিরভাগ সময় ক্ষতিকর না হলেও কিছু ক্ষেত্রে জটিলতার কারণ হয়ে উঠতে পারে।

হেম্যানজিওমা কী?

হেম্যানজিওমা মূলত একটি ভাসকুলার লেজন, অর্থাৎ রক্তনালির অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। এটি ক্যানসার নয় এবং সাধারণত মারাত্মক টিউমার হিসেবেও গণ্য করা হয় না। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, নির্দিষ্ট একটি স্থানে রক্তনালিগুলো স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি এবং ঘনভাবে বেড়ে ওঠার ফলেই হেম্যানজিওমা তৈরি হয়।শরীরের যেকোনো অংশেই হেম্যানজিওমা হতে পারে, তবে মুখগহ্বর, বিশেষ করে জিহ্বায় এধরনের রক্তনালিজনিত বৃদ্ধির জন্য তুলনামূলকভাবে সংবেদনশীল একটি স্থান।

জিহ্বায় হেম্যানজিওমা কেন বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে?

জিহ্বা শুধু কথা বলা বা স্বাদ গ্রহণের অঙ্গ নয়। এটি আমাদেরকে চিবানো ও গিলতে সাহায্য করে। স্পষ্ট উচ্চারণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। মুখগহ্বরের সংক্রমণ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে। এই কারণে জিহ্বায় কোনো অস্বাভাবিক বৃদ্ধি হলে তা শুধু দৃশ্যমান সমস্যাই নয়,দৈনন্দিন কার্যকলাপেও প্রভাব ফেলতে পারে। হেম্যানজিওমা যদি আকারে বড় হয় বা গভীরে অবস্থান করে, তাহলে কথা বলা, খাওয়া এমনকি শ্বাস-প্রশ্বাসেও সমস্যা তৈরি করতে পারে।

জিহ্বার হেম্যানজিওমা কীভাবে তৈরি হয়?

হেম্যানজিওমার সঠিক কারণ এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি । তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান কিছু সম্ভাব্য ব্যাখ্যা দেয়-

প্রথমত, জন্মগত কারণ। অনেক ক্ষেত্রে ধারণা করা হয়, গর্ভাবস্থায় রক্তনালির গঠনে সামান্য ত্রুটি থেকেই ভবিষ্যতে হেম্যানজিওমা তৈরি হতে পারে। সে কারণে শিশুদের মধ্যেও এটি দেখা যায়।

দ্বিতীয়ত, রক্তনালির অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। কোনো একটি স্থানে রক্তনালির বিভাজন ও বৃদ্ধি স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সেখানে হেম্যানজিওমা তৈরি হয়।

তৃতীয়ত, হরমোনাল প্রভাব। কিছু পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, হরমোনগত পরিবর্তনের সময়, বিশেষ করে শৈশব বা কৈশোরে হেম্যানজিওমা দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারে।

চতুর্থত, স্থানীয় আঘাত বা জ্বালা। যদিও এটি সরাসরি প্রমাণিত নয়, তবে জিহ্বায় বারবার কামড়, ঘষা বা দীর্ঘদিনের জ্বালার সঙ্গে হেম্যানজিওমার প্রকাশ সম্পর্কিত হতে পারে বলে মনে করা হয়।

জিহ্বার হেম্যানজিওমা দেখতে কেমন হয়?

জিহ্বার হেম্যানজিওমা সাধারণত চেহারার মাধ্যমেই প্রথম ধরা পড়ে। এটির বৈশিষ্ট্য হতে পারে-

⇨ লালচে, বেগুনি বা নীলচে রঙ

⇨ নরম ও স্পঞ্জের মতো অনুভূতি

⇨ চাপ দিলে রঙ ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া

⇨ আকারে ছোট দাগ থেকে ধীরে ধীরে বড় গাঁট

⇨ অনেক ক্ষেত্রে এটি ব্যথাহীন হয়। 

⇨ কিন্তু আকার বড় হলে বা গভীর রক্তনালির সঙ্গে যুক্ত থাকলে ব্যথা, রক্তপাত বা অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।

হেম্যানজিওমা কি বিপজ্জনক?

সব হেম্যানজিওমা বিপজ্জনক নয়। অনেক হেম্যানজিওমা ছোট থাকে, ধীরে ধীরে বাড়ে এবং  কোনো উপসর্গ সৃষ্টি করে না। এমন ক্ষেত্রে শুধু পর্যবেক্ষণই যথেষ্ট হতে পারে। কিন্তু কিছু পরিস্থিতিতে এটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।যেমন-

⇨ বারবার রক্তপাত হলে।

⇨ দ্রুত আকার বাড়তে থাকলে।

⇨ কথা বলা বা গিলতে সমস্যা হলে।

⇨ ঘনঘন সংক্রমণ দেখা দিলে।

এই অবস্থায় চিকিৎসা জরুরি হয়ে পড়ে।

শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে পার্থক্য:

শিশুদের জিহ্বায় হেম্যানজিওমা অনেক সময় জন্মের পরপরই বা শৈশবে ধরা পড়ে। কিছু ক্ষেত্রে এটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজে থেকেই ছোট হয়ে যায় বা স্থির থাকে। অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে-

⇨ এটি তুলনামূলকভাবে স্থায়ী হতে পারে।

⇨ নিজে নিজে সরে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।

⇨ আঘাত পেলে রক্তপাতের ঝুঁকি বেশি।

এই কারণে বয়সভেদে চিকিৎসার সিদ্ধান্তও ভিন্ন হয়।

জিহ্বার হেম্যানজিওমা শনাক্ত করা হয় কীভাবে?

প্রথম ধাপ হলো ক্লিনিক্যাল পর্যবেক্ষণ। অভিজ্ঞ চিকিৎসক অনেক সময় শুধু দেখে এবং স্পর্শ করেই ধারণা করতে পারেন এটি হেম্যানজিওমা কিনা। তবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য আল্ট্রাসাউন্ড, এমআরআই, ডপলার স্টাডি ইত্যাদি প্রয়োজন হতে পারে। এই পরীক্ষাগুলোর মাধ্যমে রক্তপ্রবাহ, গভীরতা এবং আশপাশের টিস্যুর সঙ্গে সম্পর্ক বোঝা যায়। সাধারণত বায়োপসি এড়িয়ে চলা হয়, কারণ এতে অতিরিক্ত রক্তপাতের ঝুঁকি থাকে।

চিকিৎসা না পর্যবেক্ষণ- কখন কোনটি?

চিকিৎসাবিজ্ঞানে জিহ্বার হেম্যানজিওমার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো-সবকিছুর চিকিৎসা দরকার নেই। যদি হেম্যানজিওমা ছোট হয়, কোনো উপসর্গ না থাকে, আকার  না বাড়ে তাহলে নিয়মিত পর্যবেক্ষণই যথেষ্ট। কিন্তু যদি এটি দৈনন্দিন জীবনে সমস্যা তৈরি করে, তখন চিকিৎসার কথা ভাবা হয়।


চিকিৎসা:

চিকিৎসার ধরন নির্ভর করে হেম্যানজিওমার আকার, গভীরতা ও অবস্থানের ওপর। ব্যবহৃত পদ্ধতিগুলোর মধ্যে থাকতে পারে লেজার থেরাপি, স্ক্লেরোথেরাপি (রক্তনালির ভেতরে বিশেষ ওষুধ দিয়ে সংকুচিত করা), অস্ত্রোপচার (নির্বাচিত ক্ষেত্রে) ইত্যাদি। 

প্রতিটি পদ্ধতিরই নিজস্ব ঝুঁকি ও সুবিধা রয়েছে। তাই চিকিৎসার সিদ্ধান্ত সবসময় ব্যক্তিভেদে নেওয়া হয়।

নিজে নিজেই কোনো পদক্ষেপ বিপদজনক!

অনেকে ভুল করে মনে করেন, ছোট গাঁট বা দাগ নিজে থেকেই কেটে ফেলা যাবে। জিহ্বার হেম্যানজিওমার ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক।

কারণ-

⇨ এটি রক্তনালির সঙ্গে যুক্ত।
⇨ হঠাৎ প্রচুর রক্তপাত হতে পারে।
⇨ সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

এই কারণে মুখের ভেতরের যেকোনো অস্বাভাবিক গাঁট নিয়ে নিজে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়।

জিহ্বার হেম্যানজিওমা শুধু শারীরিক সমস্যা নয়, অনেক সময় মানসিক চাপের কারণও হয়। কথা বলার সময় অস্বস্তি, চেহারা নিয়ে উদ্বেগ বা বারবার রক্তপাতের ভয় মানুষের আত্মবিশ্বাসে প্রভাব ফেলতে পারে। এই দিকটি চিকিৎসার সময় গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

কখন অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত?

জিহ্বায় অস্বাভাবিক লাল বা নীলচে দাগ দেখা দিলে, আকার দ্রুত পরিবর্তন হলে, রক্তপাত শুরু হলে, কথা বলা বা খেতে সমস্যা হলে ইত্যাদি লক্ষণগুলো দেখা দিলে, অবহেলা না করে দ্রুত পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

সব অস্বাভাবিক জিনিসই বিপজ্জনক নয়, কিন্তু সবকিছু উপেক্ষা করাও ঠিক নয়। এটি একদিকে যেমন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিরীহ, অন্যদিকে তেমনই ভুল সিদ্ধান্ত বা অবহেলায় জটিলতার কারণ হতে পারে। সচেতনতা, সঠিক পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনে সময়মতো চিকিৎসাই পারে এই নীরব সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে।

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

❤️
Love
0
(0.00 / 0 total)
👏
Clap
0
(0.00 / 0 total)
🙂
Smile
0
(0.00 / 0 total)
😞
Sad
0
(0.00 / 0 total)

মন্তব্যসমূহ

এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।


সম্পর্কিত নিউজ