পিতামাতার এই পদক্ষেপ শিশুর শেখার আগ্রহকে পুরোপুরি নষ্ট করে দিতে পারে!

পিতামাতার এই পদক্ষেপ শিশুর শেখার আগ্রহকে পুরোপুরি নষ্ট করে দিতে  পারে!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

একটি শিশু জন্মের পর প্রথম যে পৃথিবীকে চেনে, সেটি হলো তার পরিবার। সেই পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন মা এবং বাবা। কীভাবে কথা বলা হয়, ভুল করলে কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়, কৌতূহল দেখালে সেটিকে উৎসাহ দেওয়া হয় নাকি থামিয়ে দেওয়া হয়- এই ছোট ছোট আচরণই ধীরে ধীরে শিশুর শেখার আগ্রহ গড়ে তোলে বা ভেঙে দেয়। শিশুর পড়াশোনায় তেমন আগ্রহ নেই, এই অভিযোগ প্রায় সব সমাজেই শোনা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই আগ্রহের বীজ কোথায় রোপণ হয়?

উত্তরটি কিন্তু খুবই সাধারণ আর তা হলো বাড়ির ভেতর, পিতামাতার আচরণে। গবেষক লিয়ান তং, হ্যালি এবং স্ট্যানসবারির গবেষণার বরাত দিয়ে জানিয়েছেন যে, শিশুর সঠিক বিকাশে পিতামাতার সরাসরি মনোযোগ এবং ইতিবাচক সাড়াদান অত্যন্ত জরুরি। এই গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, শিশুদের জ্ঞানীয়, সামাজিক ও আবেগীয় উন্নতির পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখে তাদের পেছনে, পিতামাতার ব্যয় করা গুণগত সময়। একজন অভিভাবক বা শিক্ষক শিশুর কথা শোনা, খেলাধুলা এবং নতুন কিছু শেখার পেছনে যত বেশি সময় দেবেন, শিশুটি সামাজিকভাবে এবং শিক্ষাগতভাবে তত বেশি দক্ষ হয়ে উঠবে।


আধুনিক শিক্ষা ও মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে শেখা মানে শুধু বই মুখস্থ করা নয়। শেখা মানে হলো প্রশ্ন করা, ভুল করা, নতুন কিছু জানার আনন্দ পাওয়া। আর এই মানসিকতা গড়ে ওঠে শিশুর পারিবারিক পরিবেশে। পিতামাতার ব্যবহার, দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রত্যাশা শিশুর মস্তিষ্কে শেখার প্রতি ইতিবাচক বা নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে।


আগ্রহের প্রথম বীজ রোপন হয় পরিবার থেকেই। শিশুরা জন্মগতভাবেই কৌতূহলী। “এটা কী?”,"ওটা কি?",“কেন এমন হয়?”, “এভাবে কেন?”- এই প্রশ্নগুলিই বাচ্চাদের শেখার সূচনা। কিন্তু অনেক সময় ব্যস্ততা, ক্লান্তি বা বিরক্তির কারণে পিতামাতারা এই প্রশ্নগুলোকে অবহেলা করেন বা ধমক দিয়ে থামিয়ে দেন। এতে শিশুর মনে  বার্তা পৌঁছে যে হয়তোপ্রশ্ন করা ভালো কিছু নয়। অন্যদিকে, যে পরিবারে শিশুর প্রশ্নকে গুরুত্বের সাথে শোনা হয়, উত্তর না জানলেও খুঁজে দেখার চেষ্টা করা হয়, সেখানে কোনো কিছু শেখা হয়ে ওঠে আনন্দের বিষয়। শিশু বুঝতে শেখে, জানা মানে আনন্দ, কৌতূহল মানে কোনো সমস্যা নয়।

ভয় হলো কোনোকিছু শেখার সবচেয়ে বড় শত্রু। যে শিশুকে সবসময় ভয় দেখিয়ে পড়ানো হয়,নম্বর না পেলে শাস্তি, ভুল করলে বকা দেয়া হয়,সে শিশু  শেখাকে দায় হিসেবে দেখতে শেখে। তার কাছে পড়াশোনা মানে চাপ, উৎকণ্ঠা আর আত্মবিশ্বাসহীনতা। কিন্তু পিতামাতার আচরণ যদি নিরাপত্তার হয়, ভুল করলে বোঝানো, চেষ্টা করলে প্রশংসা করা হয় তাহলে শিশুর মস্তিষ্ক শেখাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে। সে জানে, ভুল করা মানেই ব্যর্থতা নয় বরং শেখার একটি ধাপ।

অনেক পিতামাতা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে এতটাই উদ্বিগ্ন থাকেন যে, অজান্তেই শিশুর উপর অতিরিক্ত প্রত্যাশার বোঝা চাপিয়ে দেন। তারা অন্যের বাচ্চার সাথে তুলনা করে নিজের বাচ্চার সাথে কথা বলেন, এই তুলনামূলক কথা শিশুর শেখার আগ্রহ ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দেয়। শিশু তখন শেখে নিজের জন্য নয়, অন্যকে খুশি করার জন্য পড়তে হবে। ফলাফল হিসেবে শেখার আনন্দ হারিয়ে যায়, জায়গা নেয় মানসিক চাপ ও ভয়।


শিশুরা যা শোনে তার চেয়ে বেশি শেখে যা দেখে। পিতামাতা যদি নিজেরা বই পড়েন, নতুন কিছু জানতে আগ্রহী হন, তথ্য নিয়ে আলোচনা করেন, শিশু স্বাভাবিকভাবেই শেখার প্রতি আকৃষ্ট হয়। কিন্তু যদি শিশুর সামনে সবসময় শেখাকে বোঝা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যেমন- "পড়াশোনা না করলে কষ্ট করতে হবে”- এ ধরনের ভীতিকর কথা বলা হয় তাহলে শিশুর মনে শেখা মানেই কষ্টের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।

শেখা শুধুই বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়া নয়, এটি আবেগের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। যে শিশু পিতামাতার কাছ থেকে ভালোবাসা, সমর্থন ও স্বীকৃতি পায়, তার মস্তিষ্ক শেখার সময় বেশি সক্রিয় থাকে। ইতিবাচক আবেগ শেখাকে সহজ করে তোলে। অপরদিকে, অবহেলা বা অতিরিক্ত কঠোর পরিবেশে বড় হওয়া শিশুরা শেখার সময় বেশি মানসিক বাধার সম্মুখীন হয়। তাদের মনোযোগ কমে যায়, আগ্রহ হারিয়ে যায়।

শিশুকে শেখার ক্ষেত্রে কতটা স্বাধীনতা দেওয়া হচ্ছে, সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।  পড়বে, কখন পড়বে, কীভাবে পড়বে -সেসব কিছু যদি পিতামাতাই ঠিক করে দেন কীতাহলে শিশুর নিজস্ব আগ্রহ বিকশিত হওয়ার সুযোগ কমে যায়। যেসব পিতামাতা সন্তানের পছন্দকে সম্মান করেন, শেখার পদ্ধতিতে তাকে অংশ নিতে দেন, সেখানে শিশু নিজেকে শেখার মালিক হিসেবে ভাবতে শেখে। এই আত্মনিয়ন্ত্রণই শেখার আগ্রহকে দীর্ঘস্থায়ী করে।


ভুল মানেই ব্যর্থতা, এই ধারণা যদি শিশুর মনে ঢুকে যায়, সে নতুন কিছু চেষ্টা করতে ভয় পায়। কিন্তু পিতামাতার আচরণ যদি এমন হয় যে ভুলকে শেখার অংশ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে শিশু ঝুঁকি নিতে শেখে, নতুন বিষয় জানতে আগ্রহী হয়। ভুলের পর যদি এভাবে প্রশ্ন করা হয় যে, “কোথায় বুঝতে অসুবিধা হলো?”,তাহলে শিশুর শেখার প্রক্রিয়া আরও গভীর হয়।

শিশুর পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বাড়াতে সবচেয়ে শক্তিশালী উপাদান হলো পিতামাতার সময়। পাশে বসে পড়া দেখানো, আগ্রহ নিয়ে শোনা, একসঙ্গে আলোচনা করা, এগুলো শিশুকে বোঝায় যে শেখা গুরুত্বপূর্ণ। সময় না দিয়ে শুধু ফলাফল চাওয়াটা শিশুর কাছে শেখাকে মূল্যহীন করে তোলে।

শিশুর শেখার আগ্রহ কোনো জন্মগত গুণ নয়, এটি গড়ে ওঠে পরিবেশে। পিতামাতার প্রতিদিনের ছোট ছোট আচরণ, যেমন- কথা বলা, শোনা, উৎসাহ দেওয়া বা দমন করা,এই সবকিছু মিলেই একটি শিশুর শেখার মানসিকতা তৈরি করে। শিশু কেমন ছাত্র হবে, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সে শেখাকে কীভাবে দেখবে। আর সেই দৃষ্টিভঙ্গির নির্মাতা মূলত পিতামাতাই।
 

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

❤️
Love
0
(0.00 / 0 total)
👏
Clap
0
(0.00 / 0 total)
🙂
Smile
0
(0.00 / 0 total)
😞
Sad
0
(0.00 / 0 total)

মন্তব্যসমূহ

এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।


সম্পর্কিত নিউজ