দৈনন্দিন ছোট্ট যে অভ্যাসেই বাড়বে সুখ ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন!
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
সুখ কি বড় কোনো সাফল্যের পর আসে, নাকি নতুন কিছু পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে? নাকি সুখ আসলে ছোট ছোট অনুভূতিরই যোগফল, যেগুলো আমরা প্রায়ই খেয়াল করি না? আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় মানুষ যত এগোচ্ছে, ততই বাড়ছে মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও অস্থিরতা। অথচ এই জটিলতার মাঝেই এমন একটি সহজ ও মানবিক অভ্যাস রয়েছে, যা ধীরে ধীরে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে, তার নামই কৃতজ্ঞতার চর্চা।
কৃতজ্ঞতা মানে শুধু “ধন্যবাদ” বলা নয়। কৃতজ্ঞতা হলো জীবনে যা আছে, যা পেয়েছি, এমনকি যা প্রতিদিন চোখ এড়িয়ে যায় সেসবের মূল্য উপলব্ধি করা। মনোবিজ্ঞান বলছে, এই অনুভূতিটিই মানুষের মস্তিষ্কে সুখের রাসায়নিক প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করে, যা দীর্ঘমেয়াদে মানসিক সুস্থতার ভিত্তি তৈরি করে।
কৃতজ্ঞতা একটি ল্যাটিন শব্দ 'gratus' থেকে এসেছে। এর অর্থ আনন্দদায়ক বা কৃতজ্ঞ হওয়া। প্রাচীন দর্শন ও ধর্মতত্ত্ব থেকে শুরু করে আধুনিক মনোবিজ্ঞানেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কৃতজ্ঞতা কেবল একটি ক্ষণস্থায়ী অনুভূতি নয়, বরং এটি মানুষের ব্যক্তিত্বের একটি ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য এবং থেরাপিউটিক নিরাময় পদ্ধতি হিসেবে কাজ করে। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে ব্যক্তি নিজে যেমন সুখী হন, তেমনি অন্যদের ওপরও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। একারণেই বর্তমানে ইতিবাচক মনোবিজ্ঞান (Positive Psychology) সামগ্রিক সুস্থতা ও মানসিক প্রশান্তি বৃদ্ধিতে নিয়মিত কৃতজ্ঞতা চর্চার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
কৃতজ্ঞতা কীভাবে সুখের সঙ্গে যুক্ত?
মানুষের মন স্বভাবতই নেতিবাচক বিষয়গুলোকে বেশি মনে রাখে। সমস্যার দিকে নজর দেওয়া আমাদের টিকে থাকার প্রবৃত্তির অংশ। কিন্তু এই প্রবণতা দীর্ঘদিন চললে মন ক্লান্ত হয়ে পড়ে। কৃতজ্ঞতার চর্চা এই স্বাভাবিক প্রবণতার বিপরীত পথে কাজ করে। যখন একজন ব্যক্তি সচেতনভাবে ভালো দিকগুলো, যেমন- একটি সুন্দর সকাল, পরিবারের কারও সহানুভূতি, নিজের পরিশ্রমে অর্জিত ছোট সাফল্য ইত্যাদির দিকে মনোযোগ দেয়, তখন মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে নতুন একটি অভ্যাস গড়ে তোলে। এই অভ্যাসই সুখ অনুভব করার ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে।
মানসিক স্বাস্থ্যে কৃতজ্ঞতার প্রভাব:
মানসিক স্বাস্থ্য বলতে শুধু কোনো মানসিক রোগ বা সমস্যার অনুপস্থিতিকে বোঝায় না, মানসিক স্থিতি, আত্মমূল্যবোধ ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও এর অংশ। কৃতজ্ঞতার চর্চা এই তিনটি ক্ষেত্রেই গভীর প্রভাব ফেলে।
প্রথমত, এটি উদ্বেগ ও অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা কমাতে সাহায্য করে। যখন মানুষ নিয়মিত কৃতজ্ঞতার কথা ভাবতে শেখে, তখন ভবিষ্যৎ নিয়ে অযথা ভয় কমে আসে। মন বর্তমান মুহূর্তে স্থির হতে শেখে।
দ্বিতীয়ত, বিষণ্নতার ঝুঁকি কমাতে কৃতজ্ঞতার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। নেতিবাচক চিন্তার চক্র ভাঙতে এটি কার্যকর এক মানসিক কৌশল হিসেবে কাজ করে। কারণ কৃতজ্ঞতা মস্তিষ্ককে নতুন করে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা খুঁজতে শেখায়।
তৃতীয়ত, আত্মসম্মানবোধ বাড়াতে কৃতজ্ঞতা বেশ সহায়ক।নিজের জীবনে পাওয়া সুযোগ, সহায়তা ও অর্জনগুলো স্বীকার করার মধ্য দিয়ে মানুষ নিজেকে কম অসম্পূর্ণ মনে করে।
মস্তিষ্কের ভেতরে কী ঘটে?
কৃতজ্ঞতার সময় মস্তিষ্কে এমন কিছু রাসায়নিক প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়, যা সুখ ও প্রশান্তির অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত। ইতিবাচক অনুভূতি তৈরি হলে মস্তিষ্কের স্নায়বিক সংযোগগুলো ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়। ফলে ভবিষ্যতে ইতিবাচক ভাবনা সহজে তৈরি হতে থাকে। এটি কোনো তাৎক্ষণিক বিষয় নয়। বরং নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে নতুন এক মানসিক পথ তৈরি করে, যেখানে চাপের মধ্যেও ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হয়।
সম্পর্কের উন্নতিতে কৃতজ্ঞতা:
মানুষ সামাজিক প্রাণী। আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যের একটি বড় অংশ নির্ভর করে, আশেপাশের সবার সাথে আমাদের সম্পর্কের ওপর। কৃতজ্ঞতার চর্চা আমাদের সম্পর্কগুলোকে আরও গভীর ও স্থিতিশীল করতে পারে। যখন আমরা কাছের মানুষদের অবদান স্বীকার করি, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, তখন পারস্পরিক আস্থা ও সংযোগ বাড়ে। এতে ভুল বোঝাবুঝি কমে, আবেগগত দূরত্ব ঘুচে যায়। এমনকি কর্মক্ষেত্রেও কৃতজ্ঞতা পরিবেশকে ইতিবাচক করে তুলতে পারে। সহকর্মীর ছোট সহযোগিতার মূল্য দেওয়া মানেই একটি সুস্থ কর্মসংস্কৃতির দিকে এগিয়ে যাওয়া।
কৃতজ্ঞতা ও চাপ ব্যবস্থাপনা:
চাপ আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য এক অংশ। কিন্তু চাপ কীভাবে আমরা গ্রহণ করি, সেটিই মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কৃতজ্ঞতার চর্চা চাপকে পুরোপুরি দূর করে না, তবে চাপ সামলানোর ক্ষমতা বাড়ায়। যখন কোনো কঠিন পরিস্থিতির মাঝেও মানুষ জীবনের ইতিবাচক দিকগুলো দেখতে শেখে, তখন পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি তৈরি হয়। এতে মানসিক শক্তি বাড়ে, ক্লান্তি কমে।
কৃতজ্ঞতার চর্চা মানে আত্মপ্রতারণা নয়! আমাদের অনেকেরই ধারণা, কৃতজ্ঞতার কথা ভাবা মানে সমস্যাকে অস্বীকার করা। বাস্তবে কিন্তু বিষয়টি ঠিক উল্টো। কৃতজ্ঞতা সমস্যাকে অস্বীকার করে না, বরং সমস্যার মাঝেও ভারসাম্য বজায় রাখতে শেখায়। একজন মানুষ দুঃখ, ক্ষতি বা ব্যর্থতার মধ্যেও বলতে পারে, সবকিছু খারাপ নয়। এই উপলব্ধিই মানসিক সুস্থতার মূল চাবিকাঠি।
দৈনন্দিন জীবনে কৃতজ্ঞতার চর্চা কীভাবে শুরু করা যায়?
কৃতজ্ঞতার চর্চা কোনো জটিল নিয়মে বাঁধা থাকেনা। এটি শুরু হতে পারে খুব সাধারণ অভ্যাস দিয়েই। প্রতিদিনের শেষে নিজের কাছে প্রশ্ন করা,আজকের দিনে এমন কী ছিল, যার জন্য আমি কৃতজ্ঞ হতে পারি? এটি হতে পারে একটি শান্ত দুপুর, কারও সহানুভূতিশীল কথা, অথবা নিজের কোনো ছোট অর্জন। গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই অনুভূতিটিকে নিয়মিত মনে জায়গা দেওয়া।
শিশু ও কিশোরদের মানসিক বিকাশে কৃতজ্ঞতা:
শিশুদের মানসিক গঠন গড়ে ওঠে পারিবারিক পরিবেশে। যদি তারা ছোটবেলা থেকেই কৃতজ্ঞতার ভাষা শোনে ও দেখে, তবে তারা জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বড় হয়। কৃতজ্ঞতা শেখানো মানে শিশুদের বাস্তবতা থেকে দূরে রাখা নয়,বরং জীবনের ওঠানামাকে গ্রহণ করার মানসিক শক্তি দেওয়া।
আধুনিক সমাজে কেন কৃতজ্ঞতা বেশি জরুরি?
আজকের সমাজে তুলনা একটি বড় সমস্যা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষকে প্রতিনিয়ত অন্যের সাফল্যের সঙ্গে নিজের জীবন তুলনা করতে বাধ্য করছে। এতে অপ্রাপ্তির অনুভূতি বাড়ে। কৃতজ্ঞতার চর্চা এই তুলনার প্রবণতাকে দুর্বল করে। মানুষ নিজের জীবনের বাস্তবতাকে গ্রহণ করতে শেখে, অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজেকে মেপে কম বিচার করে।
আমাদের সকলেরই বোঝা উচিত কৃতজ্ঞতা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানসিক স্বাস্থ্যের একটি শক্ত ভিত্তি। প্রতিদিনের ছোট ছোট অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়েই মানুষ ধীরে ধীরে সুখের কাছাকাছি পৌঁছায়। সুখ সবসময় বড় অর্জনের ফল নয়। অনেক সময় এটি লুকিয়ে থাকে সাধারণ মুহূর্তে। মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার লড়াইয়ে কৃতজ্ঞতার চর্চা হতে পারে সবচেয়ে মানবিক, সবচেয়ে সহজ এবং সবচেয়ে শক্তিশালী এক সঙ্গী।
আপনার প্রতিক্রিয়া জানান
মন্তব্যসমূহ
এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।