আফ্রিকার বাটারফ্রুট ‘সাফু’, ত্বক ও হাড়ের সুস্থতায় বিশ্বব্যাপী আলোচনায়!

আফ্রিকার বাটারফ্রুট ‘সাফু’, ত্বক ও হাড়ের সুস্থতায় বিশ্বব্যাপী আলোচনায়!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

বিশ্বজুড়ে সুপারফুডের তালিকায় প্রতিনিয়ত নতুন নতুন নাম যুক্ত হচ্ছে। কখনও অ্যাভোকাডো, কখনও ব্লুবেরি, কখনও বা চিয়া সিড। কিন্তু আফ্রিকার ঘন অরণ্যঘেরা অঞ্চলে এমন একটি ফল রয়েছে, যা যুগের পর যুগ ধরে মানুষের পুষ্টি জুগিয়ে আসছে, তার নাম সাফু। অনেকেই একে চেনেন আফ্রিকান বাটারফ্রুট নামে। নাম শুনলেই বোঝা যায়, এর ভেতরের অংশ মাখনের মতো নরম।এটি তেলতেলে শাঁস এবং পুষ্টিতে ঠাসা এক প্রাকৃতিক খাদ্য। আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান এখন আবার নতুন করে তাকাচ্ছে এই ফলটির দিকে। কারণ সাফু শুধু স্বাদে নয়, বরং ত্বক, হাড় ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় ফ্যাটি অ্যাসিডে সমৃদ্ধ। প্রশ্ন হলো এই ফলটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, আর কীভাবেই বা এটি শরীরের ভেতরে কাজ করে?

সাফু কী? 

সাফু মূলত মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকার একটি স্থানীয় ফল। আফ্রিকার বহু অঞ্চলে এটি প্রতিদিনের খাদ্যতালিকার অংশ। বাইরে থেকে দেখতে ফলটি গাঢ় বেগুনি বা নীলচে রঙের আর ভেতরে রয়েছে হালকা সবুজাভ বা ফ্যাকাসে সাদা নরম শাঁস। রান্না করলে বা হালকা গরম করলে এর শাঁস আরও মোলায়েম হয়ে ওঠে, ঠিক যেন প্রাকৃতিক বাটার।

এই কারণেই একে ‘বাটারফ্রুট’ বলা হয়। তবে এটি কোনো কৃত্রিম নাম নয়। এর শাঁসে থাকা প্রাকৃতিক তেলই এই নামের পেছনের মূল কারণ।

ফ্যাটি অ্যাসিড কেন এত জরুরি?

অনেকের মনেই এখনও ধারণা রয়েছে, চর্বি মানেই ক্ষতিকর। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, সব চর্বি এক নয়। শরীরের জন্য কিছু নির্দিষ্ট ফ্যাটি অ্যাসিড অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এগুলো ছাড়া কোষের গঠন, হরমোন উৎপাদন, ত্বকের আর্দ্রতা ও হাড়ের সুস্থতা বজায় রাখা সম্ভব নয়। সাফুতে থাকা ফ্যাটি অ্যাসিড মূলত উপকারী চর্বির দলে পড়ে। এই ফ্যাট শরীরে জমে ক্ষতি করে না, বরং শরীরের ভেতরের প্রক্রিয়াগুলোকে সঠিকভাবে চালাতে সহায়তা করে।

ত্বকের জন্য কেন সাফু বিশেষ?

মানুষের ত্বক মূলত একাধিক স্তরের কোষ দিয়ে তৈরি। এই কোষগুলোর মাঝখানে থাকে লিপিড বা তেলজাত উপাদান, যা ত্বককে আর্দ্র, নমনীয় ও সুরক্ষিত রাখে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বা পুষ্টির অভাবে এই লিপিড স্তর দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে দেখা যায় শুষ্ক ত্বক, ফাটল, দ্রুত বলিরেখা। সাফুতে থাকা প্রাকৃতিক ফ্যাটি অ্যাসিড ত্বকের এই লিপিড স্তরকে শক্তিশালী করতে সহায়তা করে। নিয়মিত খাদ্যতালিকায় এই ধরনের উপকারী ফ্যাট থাকলে-

⇨ ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়ে।

⇨ শুষ্কতা ও রুক্ষতা কমে।

⇨ ত্বকের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা বজায় থাকে।

⇨ পরিবেশগত ক্ষতির বিরুদ্ধে ত্বকের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে।

এই কারণেই আফ্রিকার অনেক অঞ্চলে ঐতিহ্যগতভাবে সাফু শুধু খাবার নয়, ত্বকের যত্নেও ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

হাড়ের ও ফ্যাটি অ্যাসিডের সম্পর্ক:

হাড়ের স্বাস্থ্য মানেই শুধু ক্যালসিয়াম,এই ধারণা এখন অনেকটাই পুরনো। হাড়কে মজবুত রাখতে শরীরের প্রয়োজন হয় বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি উপাদান। ফ্যাটি অ্যাসিড তার মধ্যে অন্যতম। হাড়ের ভেতরে থাকা কোষগুলোকে সক্রিয় রাখতে এবং ক্যালসিয়ামের সঠিক শোষণে উপকারী ফ্যাট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাফুতে থাকা ফ্যাটি অ্যাসিড হাড়ের কোষের কার্যকারিতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। হাড়ের ভেতরের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে এবং বয়সজনিত হাড় দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি কমাতেও ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে দুগ্ধজাত খাবার সহজলভ্য নয়, সেখানে সাফু প্রাকৃতিকভাবে হাড়ের পুষ্টি জোগানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

শুধু ত্বক আর হাড় নয় ভেতরের স্বাস্থ্যের জন্যও এটি খুব উপকারী! সাফুতে থাকা উপকারী চর্বি শরীরের ভেতরে আরও নানা কাজে লাগে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো :

১. হৃদ্‌যন্ত্রের স্বাস্থ্য: উপকারী ফ্যাটি অ্যাসিড রক্তে ক্ষতিকর চর্বির ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। ফলে হৃদ্‌যন্ত্রের উপর চাপ কমে।

২. মস্তিষ্কের কার্যকারিতা: মস্তিষ্কের কোষের একটি বড় অংশই চর্বি দিয়ে তৈরি। সঠিক ধরনের ফ্যাটি অ্যাসিড মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে।

৩. শক্তি জোগান: সাফুর প্রাকৃতিক তেল শরীরে ধীরে ধীরে শক্তি সরবরাহ করে, ফলে দীর্ঘ সময় কাজ করার ক্ষমতা বাড়ে।

রান্না ও খাওয়ার ধরন: 

আফ্রিকার বহু অঞ্চলে সাফু সাধারণত হালকা গরম করে বা রান্না করে খাওয়া হয়। তাপের সংস্পর্শে এর শাঁস আরও নরম হয় এবং তেলের স্বাদ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অনেক সময় এটি ভাত, শাকসবজি বা অন্যান্য খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়া হয়। রান্না ছাড়াও সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করলে এটি বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্যে ব্যবহার করা সম্ভব। তবে এর এর প্রাকৃতিক গুণ বজায় রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো।

কেন এখন সাফু নিয়ে নতুন করে আগ্রহ?

বিশ্বব্যাপী মানুষ এখন প্রাকৃতিক, উদ্ভিদভিত্তিক পুষ্টির দিকে ঝুঁকছে। কৃত্রিম সাপ্লিমেন্টের বদলে মানুষ চায় প্রকৃতি থেকেই প্রয়োজনীয় উপাদান পেতে। এই জায়গাতেই সাফু গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সুপারফুড মানেই যে বিদেশি বা আধুনিক কোনো আবিষ্কার নয়,এটিই তার প্রমান। 

সতর্কতা:

যেকোনো উপকারী খাদ্যের ক্ষেত্রেই ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ। সাফুতে প্রাকৃতিক তেল বেশি থাকায় অতিরিক্ত খেলে ক্যালরির পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। তাই এটি নিয়মিত কিন্তু পরিমিতভাবে খাদ্যতালিকায় রাখা সবচেয়ে যুক্তিসংগত।

সাফু কোনো জাঁকজমক প্রচারের ফল নয়। এটি প্রকৃতির নিজস্ব দান, যা আফ্রিকার মানুষ যুগের পর যুগ ধরে ব্যবহার করে আসছে। ত্বককে সুস্থ রাখা, হাড়কে মজবুত করা এবং শরীরের ভেতরের ভারসাম্য বজায় রাখতে এই ফলটির ভূমিকা বিজ্ঞানসম্মতভাবেই ব্যাখ্যা করা যায়। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন আমরা নতুন নতুন পুষ্টির উৎস খুঁজি, তখন সাফু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতি অনেক আগেই সমাধান তৈরি করে রেখেছে। দরকার শুধু সেগুলোকে নতুন করে চিনে নেওয়া।
 

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

❤️
Love
0
(0.00 / 0 total)
👏
Clap
0
(0.00 / 0 total)
🙂
Smile
0
(0.00 / 0 total)
😞
Sad
0
(0.00 / 0 total)

মন্তব্যসমূহ

এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।


সম্পর্কিত নিউজ