ভুতুড়ে অভিজ্ঞতা কি শুধুই মনের ভুল?- গবেষকরা যা খুঁজে পেলেন !
- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
-
রাত গভীর হলে হঠাৎ কেমন যেন গা ছমছম করা অনুভূতি। বন্ধ ঘরে বসেও মনে হয় যেন কেউ দেখছে। পোষা কুকুরটি অকারণেই গভীর রাতে ডেকে ওঠে, বিড়ালটি অন্ধকার কোণে তাকিয়ে স্থির হয়ে থাকে। কখনও মনে হয়, ঘরের জিনিসপত্র যেন নিজের জায়গা বদলে ফেলেছে। কখনও আবার সুইচ বন্ধ থাকলেও আলো জ্বলে ওঠে, কিংবা চিলেকোঠা থেকে ভেসে আসে অজানা আওয়াজ। এই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেই বহু মানুষের মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খায়, তবে কি বাড়িতে কোনো অশরীরি আত্মা আছে!
ভূত আছে কি নেই, এই বিতর্ক আজকের নতুন নয়। প্রাচীন লোককথা থেকে আধুনিক শহুরে গুঞ্জন, প্রতিটি সমাজেই ভূত-প্রেত নিয়ে ভয়, কৌতূহল আর কল্পনার মিশেল রয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞান এই প্রশ্নটিকে দেখে ভিন্ন চোখে। বিজ্ঞান বলে, ভয় নয়, প্রথমে
খুঁজতে হবে ব্যাখ্যা। কারণ মানুষ যা অশরীরি লক্ষণ বলে মনে করে, তার প্রায় প্রতিটিই বাস্তব, প্রাকৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
ঘরে একা থাকলেও অনেক সময় আমাদের মনে হয় পাশে কেউ আছে, এই রহস্যময় অনুভূতিকে আমরা প্রায়ই মনের ভুল বলে এড়িয়ে যাই। তবে ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. বেন অল্ডারসন-ডের গবেষণা বলছে, এটি নিছক কল্পনা নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা। বিজ্ঞান একে বাস্তব অশরীরী উপস্থিতি এবং মনের ভুলের মাঝামাঝি একটি অবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। মূলত আমাদের মস্তিষ্কের স্নায়বিক প্রক্রিয়ার বিশেষ এক ধরনের জটিলতার কারণেই এমন গা-ছমছমে অভিজ্ঞতার সৃষ্টি হয়।
পোষা প্রাণীটির অস্বাভাবিক আচরণ!
অনেকেই বলেন, কুকুর বা বেড়াল নাকি অশরীরি শক্তি দেখতে পায়। বাস্তবে পোষা প্রাণীর ইন্দ্রিয় মানুষের তুলনায় অনেক বেশি সংবেদনশীল। কুকুরের শ্রবণশক্তি মানুষের চেয়ে বহু গুণ বেশি, বিড়ালের দৃষ্টিশক্তি অল্প আলোতেও অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। দেয়ালের ভেতর ইঁদুরের নড়াচড়া, ছাদের উপর অন্য প্রাণীর চলাফেরা, বৈদ্যুতিক তারে সূক্ষ্ম একটা শব্দ আমরা হয়তো শুনতে বা দেখতে পাই না, কিন্তু ওরা পায়। ফলে গভীর রাতে হঠাৎ ডেকে ওঠা বা অদ্ভুত আচরণ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক একটি প্রাণীজ প্রতিক্রিয়া। আর পোষা প্রাণীর আকস্মিক মৃত্যুকে অনেক সময় অশরীরি উপস্থিতি’র সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। বাস্তবে বয়স, অজানা রোগ, পরিবেশগত পরিবর্তন বা বিষাক্ত গ্যাসের মতো কারণই এর পেছনে বেশি দায়ী থাকে।
ঘরের জিনিসপত্রের একা একাই স্থান বদল!
বন্ধ ঘর খুলে দেখলেন, টেবিল বা চেয়ার একটু অন্য জায়গায়। মুহূর্তেই মনে হয় , কেউ ছিল এখানে! কিন্তু গবেষণা বলছে, মানুষের স্মৃতি নিখুঁত নয়। আমরা অনেক সময় ঠিক মনে রাখতে পারি না, কোন জিনিসটি ঠিক কোথায় ছিল। এছাড়া ঘরের ভেতরে বাতাসের চাপ, দরজা-জানালা খোলা থাকা, কিংবা অন্য কেউ অজান্তে জিনিস সরিয়ে রাখলেও তা আমাদের নজরে না আসতেই পারে।
হঠাৎ ঠান্ডা অনুভূব কর!
একটি নির্দিষ্ট ঘরে ঢুকেই গা শিরশির করা ঠান্ডা লাগছে, এমন অভিজ্ঞতা বহু মানুষের আছে। অনেকে এটিকে অশরীরির উপস্থিতি বলে মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে এর কারণ হতে পারে বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তন, দেয়ালের ভেতরের স্যাঁতসেঁতে অংশ, কিংবা তাপমাত্রার অসম বণ্টন। শরীরের রক্ত সঞ্চালন হঠাৎ কমে গেলেও এমন ঠান্ডা অনুভূতি হতে পারে, বিশেষ করে ভয় বা উৎকণ্ঠার সময়।
দেওয়ালে অজানা কোনো আঁচড়ের দাগ!
কাঠের আসবাব বা দেয়ালে হঠাৎ আঁচড়ের দাগ দেখলে আতঙ্কিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কাঠ ও রঙ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রসারিত ও সংকুচিত হয়। এতে ফাটল বা দাগ তৈরি হতেই পারে। এছাড়া পোকামাকড়, ইঁদুর কিংবা পুরনো কাঠামোর নড়াচড়াও এমন চিহ্নের কারণ হতে পারে।
আলো জ্বলে ওঠা বা দপদপ করে ওঠা নিয়ে আতঙ্ক!
সুইচ বন্ধ থাকা সত্ত্বেও আলো জ্বলে ওঠা বা বাল্বের দপদপ করা বিষয়টি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝির জন্ম দেয়। বাস্তবে পুরনো তার, ঢিলা সংযোগ, ভোল্টেজের ওঠানামা বা বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ত্রুটিই এর কারণ। বিদ্যুৎ এমন একটি শক্তি, যা চোখে না দেখা গেলেও তার আচরণ কখনও কখনও মানুষকে ভয় পাইয়ে দেয়।
নীরবতার মাঝে অজানা কোনো আওয়াজ!
রাতে যখন পরিবেশ শান্ত থাকে তখন ছোট শব্দও অনেক বড় মনে হয়। ছাদের উপর বাতাসের চাপ, পাইপলাইনের ভেতর পানির চলাচল, কাঠের ফাঁকে তাপমাত্রাজনিত শব্দ ইত্যাদি এসব ধস্তাধস্তি, হাঁটার শব্দ বা দরজা খোলার আওয়াজ বলে ভুল হতে পারে অনেকের। নীরবতা নিজেই অনেক সময় মস্তিষ্কে ভয় তৈরি করে।
ছায়ামূর্তি ও ‘পিছু নেওয়ার’ অনুভূতি!
ঘরের দেওয়ালে হঠাৎ ছায়া দেখার অভিজ্ঞতা বা মনে হওয়া কেউ পিছু নিচ্ছে, এগুলো মনস্তাত্ত্বিক ঘটনার অংশ। কম আলো, ক্লান্তি, ভয়, অতিরিক্ত কল্পনা কিংবা দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ মস্তিষ্ককে এমন বিভ্রম তৈরি করতে বাধ্য করে। মানুষের মস্তিষ্ক বিপদের আশঙ্কা করলে বাস্তবের সঙ্গে কল্পনাকে মিশিয়ে ফেলে।
বিজ্ঞান কী বলে?
আজ পর্যন্ত কোনও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় অশরীরি আত্মার অস্তিত্ব পুরোপুরি প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু মানুষের অভিজ্ঞতাকে বিজ্ঞান অস্বীকারও করে না। বিজ্ঞান বলে প্রতিটি অভিজ্ঞতার পেছনে কোনও না কোনও কারণ রয়েছে, যা খুঁজে বের করা সম্ভব। ভয় নয়, বরং অনুসন্ধানই প্রকৃত সমাধান।
বাড়িতে অদ্ভুত কিছু ঘটলেই আতঙ্কিত হয়ে অশরীরি ভাবার আগে বাস্তব কারণ খোঁজা জরুরি। কারণ ভয় নিজেই মানুষের চিন্তাকে আরও অন্ধকার করে তোলে। অজানা মানেই অতীন্দ্রিয় নয়। বিজ্ঞানের আলোয় দেখলে, রহস্যের পর্দা ধীরে ধীরে সরে যায়। অশরীরির গল্প হয়তো মানুষের কল্পনায় বেঁচে থাকবে, কিন্তু বাস্তব জীবন চলে যুক্তি, পর্যবেক্ষণ আর প্রমাণের উপর ভিত্তি করে।
আপনার প্রতিক্রিয়া জানান
মন্তব্যসমূহ
এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।