{{ news.section.title }}
চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযান
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল সলিমপুরে আজ সোমবার (৯ মার্চ) ভোর ৬টা থেকে যৌথ বাহিনীর বিশেষ অভিযান চলছে। সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশের সমন্বয়ে পরিচালিত এই অভিযানে প্রায় ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার সদস্য অংশ নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গণমাধ্যম) মো. রাসেল অভিযান শুরুর পর জানান, যৌথ বাহিনীর সদস্যরা মাঠে রয়েছেন এবং অভিযান সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য পরে জানানো হবে।
চারপাশ ঘিরে ফেলা, সব পথে তল্লাশিচৌকি
গোয়েন্দা ও স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, অভিযান শুরুর আগেই জঙ্গল সলিমপুরের চারপাশ ঘিরে ফেলা হয়। এলাকা থেকে বের হওয়ার প্রধান পথগুলোতে তল্লাশিচৌকি বসানো হয়েছে-যাতে অভিযান শুরুর পর কেউ পালিয়ে যেতে না পারে।
অভিযান পরিচালনায় সদস্যদের একাধিক দলে ভাগ করা হয়েছে। একটি দল পাহাড়ের নিচের বসতি ও ঘরবাড়িতে তল্লাশি চালাচ্ছে, আরেকটি দল পাহাড়ি পথ ধরে উপরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এলাকায় একাধিক ছড়া, ঝোপঝাড় ও পরিত্যক্ত ঘর থাকায় সন্দেহভাজনদের খোঁজে ছোট ছোট ইউনিটে ভাগ হয়ে তল্লাশি চলছে বলে অভিযানে যুক্ত একটি সূত্র জানায়।
লক্ষ্য: সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার ও অস্ত্র উদ্ধার
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানের মূল উদ্দেশ্য হলো সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করা এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা। এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরেই সন্ত্রাসী তৎপরতা, অবৈধ দখল ও প্লট-বাণিজ্যের অভিযোগে আলোচনায়। অতীতে অভিযান করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হামলার মুখে পড়েছিল-এ কারণেই এবার কৌশলগতভাবে বড় বহর ও সমন্বিত ব্যবস্থায় অভিযান চলছে বলে কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন।
র্যাব কর্মকর্তার মৃত্যুর ঘটনার পর নতুন করে চাপ
জঙ্গল সলিমপুর আবারো ‘হটস্পট’ হয়ে ওঠে চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি। ওই দিন এলাকায় অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসী হামলায় র্যাব-৭-এর উপসহকারী পরিচালক (নায়েব সুবেদার) মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। এই ঘটনার পর সীতাকুণ্ড থানায় মামলা হয় এবং মামলায় প্রধান আসামি করা হয় মোহাম্মদ ইয়াসিনকে।
মামলায় ইয়াসিন, নুরুল হক ভান্ডারীসহ মোট ২৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও প্রায় ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে বলে নথিভুক্ত অভিযোগে উল্লেখ আছে। এজাহারের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানে গিয়ে আসামি ধরতে গেলে র্যাব সদস্যদের ওপর রামদা, কিরিচ ও লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা হয়; র্যাবের আটক করা এক আসামিকেও ছিনিয়ে নেওয়া হয়। অভিযোগে আরও বলা হয়, চার র্যাব সদস্যকে অপহরণ করে নেওয়া হয়েছিল; পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ তাদের উদ্ধার করে।
‘ইয়াসিন পালিয়েছেন’-গুঞ্জন, নিশ্চিত নয়
এদিকে অভিযান চলাকালে এলাকায় গুঞ্জন ছড়িয়েছে-র্যাব কর্মকর্তা হত্যা মামলার অন্যতম আসামি এবং স্থানীয়ভাবে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ হিসেবে পরিচিত মো. ইয়াসিন অভিযান শুরুর আগেই পালিয়ে যেতে পারেন। স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের দাবি, ভোরের দিকে তিনি একটি গোপন পথ ব্যবহার করে নারী বেশে (বোরকা পরে) সরে পড়েছেন।
তবে এই দাবি সম্পর্কে এখনো কোনো সরকারি সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। অভিযানে যুক্ত একাধিক পক্ষ বলছে, অভিযান শেষে গ্রেপ্তার ও উদ্ধার সংক্রান্ত তথ্য জানানো হবে-তার আগে নির্দিষ্ট কারও পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
জঙ্গল সলিমপুর কোথায়, কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
জঙ্গল সলিমপুর চট্টগ্রাম নগরীর খুব কাছেই-বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার পশ্চিমে এবং লিংক রোডের উত্তর পাশে এর অবস্থান বলে স্থানীয়রা জানান। এলাকাটি সীতাকুণ্ড উপজেলায় হলেও নগরের সন্নিকটে হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে দখল, অবৈধ বসতি এবং ‘প্লট-বাণিজ্য’ ঘিরে নানা প্রভাবশালী চক্রের সক্রিয়তার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, চার দশকের বেশি সময় ধরে সরকারি পাহাড় কেটে সেখানে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি গড়ে ওঠে। পাহাড় কাটা এবং জমি ভাগ করে প্লট বিক্রির অভিযোগও পুরোনো। এসব কার্যক্রম টিকিয়ে রাখতে সশস্ত্র পাহারার মতো ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে-এমন অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক অভিযানের নথিতেও উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেন।
আগেও সংঘর্ষ-হামলা: সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনাও আলোচনায়
জঙ্গল সলিমপুর ঘিরে সহিংস ঘটনার ইতিহাসও রয়েছে। র্যাবের ওপর হামলার আগের বছর অক্টোবরে সেখানে দুই পক্ষের সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার ঘটনা আলোচনায় আসে। একই এলাকায় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে পরদিন সন্ত্রাসীদের হামলা ও মারধরের শিকার হন দুই সাংবাদিক-এ ঘটনার পর জঙ্গল সলিমপুরের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ে।
দুই গ্রুপের আধিপত্যের কথা বলছে স্থানীয়রা
পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা তথ্য অনুযায়ী, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অন্তত দুটি সন্ত্রাসী পক্ষের তৎপরতার অভিযোগ আছে। এক পক্ষের নেতৃত্বে মোহাম্মদ ইয়াসিন এবং আরেক পক্ষের নেতৃত্বে রোকন উদ্দিন-এমন কথাও শোনা যায়।
এলাকায় রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, ইয়াসিনকে অতীতে এক রাজনৈতিক বলয়ের অনুসারী হিসেবে বলা হলেও, পরে তিনি অন্য রাজনৈতিক পরিচয় দাবি করেন। তবে র্যাব কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর একটি পক্ষ সংবাদমাধ্যমে জানায়-জঙ্গল সলিমপুরে তাদের কোনো অনুসারী নেই এবং ওই ঘটনায় তাদের দলের কেউ জড়িত নয়।
আগে ‘সমন্বিত অভিযান’ আটকে ছিল নির্বাচনের কারণে
গোয়েন্দা সূত্রগুলোর ভাষ্য, জানুয়ারির ঘটনার পর থেকেই জঙ্গল সলিমপুরে বড় পরিসরে সমন্বিত অভিযান চালানোর আলোচনা ছিল। কিন্তু জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে থাকায় তখন তা বাস্তবায়ন হয়নি। এবার বড় বহর, চেকপোস্ট, বহু দলে ভাগ হয়ে অভিযান-সব মিলিয়ে আগের চেয়ে বেশি ‘সমন্বিত ও কড়াকড়ি’ কৌশলে অভিযান চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এখন কী অবস্থা
অভিযান শুরুর পর থেকে এলাকায় নিরাপত্তা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। তল্লাশি চলায় জঙ্গল সলিমপুরের আশপাশের চলাচলে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে বলেও স্থানীয়রা জানিয়েছেন। গ্রেপ্তার, অস্ত্র উদ্ধার বা অভিযানের বড় কোনো ফলাফল সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
আপনি চাইলে-এই নিউজটা আমি ফেসবুক/অনলাইন পোর্টাল স্টাইলে আরও ‘শর্ট প্যারাগ্রাফ + বুলেট হাইলাইট’ ফরম্যাটে সাজিয়ে দিতে পারি, যাতে স্ক্রল করে পড়তে আরও সহজ হয়।