{{ news.section.title }}
প্রধানমন্ত্রীর নতুন কমিটিতে শায়খ আহমাদুল্লাহ!
বাংলাদেশে যাকাত সংগ্রহ ও বণ্টনব্যবস্থাকে আরও সুশৃঙ্খল, স্বচ্ছ এবং ফলপ্রসূ করতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় করেছেন শায়খ আহমাদুল্লাহ। বৈঠকে মূল আলোচ্য ছিল-দেশের ভেতরে যাকাতের সম্ভাবনাকে কীভাবে দারিদ্র্য বিমোচনে সরাসরি কাজে লাগানো যায়, এবং একই সঙ্গে যাকাত-ভিত্তিক কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে স্থায়ী স্বাবলম্বিতা কীভাবে তৈরি করা সম্ভব।
বৈঠকটি হয় প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে। যাকাতকে শুধু “দান” হিসেবে নয়, বরং একটি কার্যকর অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা সামনে রেখে সরকার কীভাবে কাজ করতে পারে-সে বিষয়ে শায়খ আহমাদুল্লাহর অভিজ্ঞতা ও প্রস্তাবনা শোনা হয়।
১) যাকাতকে দারিদ্র্য বিমোচনের ‘কার্যকর হাতিয়ার’ বানানোর আলোচনা
বৈঠকের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী যাকাত ব্যবস্থাপনার বর্তমান বাস্তবতা ও সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে জানতে চান-বাংলাদেশে যাকাত সংগ্রহের যে বড় সম্ভাবনা রয়েছে, তা কীভাবে গরিব মানুষকে অস্থায়ী সহায়তা নয়; বরং স্থায়ী সমাধানের পথে নিতে পারে।
আলোচনায় উঠে আসে, যাকাতের অর্থ অনেক সময় খণ্ড খণ্ডভাবে বণ্টিত হয়-যার ফলে তাৎক্ষণিক উপকার হলেও দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্যচক্র ভাঙা কঠিন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় যাকাতকে দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও আয়ের সক্ষমতা বাড়ানোর সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে সমাজে স্থায়ী প্রভাব তৈরি হতে পারে।
২) আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের মডেল: ১৩ কোটি টাকায় ২১০০ জনের কর্মসংস্থান-প্রধান উদাহরণ
শায়খ আহমাদুল্লাহ বৈঠকে তাঁর প্রতিষ্ঠানের বাস্তব অভিজ্ঞতার একটি বড় উদাহরণ তুলে ধরেন। তিনি জানান, আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন গত এক বছরে প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয় করে ২১০০ বেকার তরুণ-তরুণীকে আলাদা আলাদা স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে।
তিনি আরও বলেন, এই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ২১০০ জন এখন বছরে প্রায় ৪২ কোটি টাকা আয় করছে। অর্থাৎ, যাকাতের অর্থ একবার যদি দক্ষতা ও উপার্জনের সক্ষমতা তৈরিতে বিনিয়োগ করা যায়, তাহলে তা বারবার “সহায়তা দেওয়ার প্রয়োজন” কমিয়ে দেয় এবং একই সঙ্গে অর্থনীতিতে নতুন আয়-প্রবাহ তৈরি করে।
বৈঠকে এ তথ্যকে “যাকাত ব্যবস্থাপনার সম্ভাব্য রোডম্যাপ” হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়-কারণ এটি দেখায়, যাকাতভিত্তিক উদ্যোগ কেবল দাতা-গ্রহীতার সম্পর্ক নয়; বরং উৎপাদনশীল মানবসম্পদ তৈরির পথও হতে পারে।
৩) আন্তর্জাতিক যাকাত তহবিল: বাংলাদেশে আনার কাঠামো নেই-এখানেই বড় সুযোগ
বৈঠকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে-ওআইসি (OIC) ভুক্ত দেশগুলোতে বছরে প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলার যাকাত সংগ্রহ হয় (স্থানীয় হিসাবে প্রায় ৪৫ লক্ষ কোটি টাকা)।
শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, বাংলাদেশে এই বিশাল আন্তর্জাতিক যাকাত তহবিলকে আইনিভাবে ও নীতিগতভাবে দেশে আনার জন্য এখনো সুস্পষ্ট “প্রপার ওয়েতে” বা কার্যকর কাঠামো নেই। যদি সরকার প্রয়োজনীয় নীতিমালা, বৈধ চ্যানেল এবং তদারকি পদ্ধতি তৈরি করতে পারে, তাহলে-
- উন্নয়নমুখী যাকাত প্রকল্পে বাইরের দেশের দাতারা আস্থা পাবে
- দেশের দরিদ্র, কর্মহীন ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য বড় পরিসরে প্রকল্প নেওয়া সম্ভব হবে
- জাতীয় অর্থনীতিতে একটি অতিরিক্ত সামাজিক-অর্থনৈতিক সাপোর্ট তৈরি হবে
এই প্রস্তাবনাকে সম্ভাবনাময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে-কারণ আন্তর্জাতিক ফান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, মানদণ্ড এবং জবাবদিহি থাকলে বিদেশি দাতাদের অংশগ্রহণ বাড়ে।
৪) বাধ্যতামূলক ‘সরকারি যাকাত আদায়’ নয়-বরং নীতিমালা ও রেগুলেটরি কাঠামো
বৈঠকে শায়খ আহমাদুল্লাহ স্পষ্ট করে বলেন-সরকার সবার কাছ থেকে বাধ্যতামূলকভাবে যাকাত সংগ্রহ করবে-এমন ধারণা ঠিক নয় এবং তাঁর প্রস্তাবও সেটি নয়।
তার মূল প্রস্তাব ছিল:
- দেশে যেসব চ্যারিটি সংস্থা/প্রতিষ্ঠান যাকাত সংগ্রহ ও বণ্টন করে, সরকার তাদের জন্য একটি রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করতে পারে
- কে কীভাবে যাকাত ব্যবহার করছে, কতটা কার্যকর ফল দিচ্ছে-তার একটি স্বচ্ছ মানদণ্ড (standard) থাকলে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ভালো কাজের “কম্পিটিশন” তৈরি হবে
- স্বচ্ছতা বাড়লে দাতাদের আস্থা বাড়বে, এবং একই টাকার প্রভাব আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে
অর্থাৎ, সরকারের ভূমিকা হবে নীতিনির্ধারণ, তদারকি ও মান নিয়ন্ত্রণ-যাতে যাকাত ব্যবস্থাপনা আরও সুশৃঙ্খল ও ফলপ্রসূ হয়।
৫) ৫–৭ সদস্যের কমিটি গঠনের নির্দেশ: ধর্মমন্ত্রী সভাপতি, বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্তি
আলোচনার পর প্রধানমন্ত্রী বিষয়টিকে বাস্তবায়নযোগ্য পর্যায়ে নেওয়ার জন্য একটি ৫ থেকে ৭ সদস্যের কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। প্রাথমিকভাবে জানা যায়-
- কমিটির সভাপতিত্ব করবেন ধর্মমন্ত্রী
- বায়তুল মোকাররমের খতিব এবং ইসলামী অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা থাকবেন
- দেশ থেকে এবং প্রয়োজন হলে দেশের বাইরের বিশেষজ্ঞদের নামও প্রস্তাব করা হয়েছে
শায়খ আহমাদুল্লাহ প্রথমে ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে কমিটিতে থাকতে অনিচ্ছা প্রকাশ করলেও, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ অনুরোধে তিনি পরামর্শ দেওয়ার উদ্দেশ্যে কমিটিতে থাকার বিষয়ে সম্মতি জানান-এমন বক্তব্যও আলোচনায় এসেছে।
কমিটির কাজ হবে-যাকাতের অর্থকে কীভাবে দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, দরিদ্রতা হ্রাস এবং স্বচ্ছ বণ্টনব্যবস্থা-এই চারটি অগ্রাধিকার খাতে বাস্তবভাবে সংযুক্ত করা যায়, সে বিষয়ে সুপারিশ তৈরি করা।