পে স্কেল নিয়ে দুঃসংবাদ!

পে স্কেল নিয়ে দুঃসংবাদ!
ছবির ক্যাপশান, সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান–ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে সংঘাতের প্রভাব ইতোমধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি করেছে। এর ঢেউ বাংলাদেশেও পৌঁছাতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক লেনদেনে চাপ-সব মিলিয়ে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, চলমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ও ব্যয়ের ওপর চাপ বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি। চলতি অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়েই সরকারের রাজস্ব ঘাটতি ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ফলে সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনায় সতর্ক অবস্থান নিতে বাধ্য হয়েছে সরকার।

এই পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত নতুন বেতনকাঠামো বা নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে ধীরগতির নীতি গ্রহণ করার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আর্থিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন পে-স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়ে ভাবছে সরকার।

এদিকে আগামীকাল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার কথা রয়েছে। এর পরপরই শুরু হবে বাজেট অধিবেশন। সংসদ সূত্রে জানা গেছে, নতুন পে-স্কেল এবং সরকারের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে সংসদে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে সংসদের কার্যপ্রণালি চূড়ান্ত করার প্রস্তুতিও চলছে।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পূর্বে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে তা একবারে বাস্তবায়ন না করে ধাপে ধাপে কার্যকর করার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

সরকারি সূত্রগুলো জানায়, বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতিতে হঠাৎ করে বড় ব্যয় বাড়ানো হলে তা বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। তাই পে-স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সময় নিয়ে পরিকল্পনা করার দিকেই ঝুঁকছে সরকার।

এরই মধ্যে গতকাল সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান ও পে কমিশনের প্রধান জাকির আহমেদ খান। সরকারি শিডিউল অনুযায়ী তিনি পিকেএসএফ চেয়ারম্যান হিসেবে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেও বৈঠকে পে কমিশনের সুপারিশ ও প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এর আগে নতুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১৮ ফেব্রুয়ারি গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, পে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের আগে তা বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হবে। তিনি বলেন, সরকারের পক্ষে কতটা ব্যয় বহন করা সম্ভব তা আগে দেখতে হবে।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশের কর আদায়ের হার এবং ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কমগুলোর একটি। এই বাস্তবতায় নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের আগে সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছর ২০২৬–২৭ সালে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রস্তাব থাকলেও বাস্তবে তা কতটা সম্ভব হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। কারণ বর্তমানে মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত। এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে আরও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এতে আমদানি ব্যয় বাড়বে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

তবে সরকার চাইছে না পে-স্কেল নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হোক। এজন্য প্রস্তাবিত বেতনকাঠামো পুনর্বিবেচনার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বাজেট প্রণয়নের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হলে পে কমিশনের সুপারিশগুলো পুনরায় পর্যালোচনা করা হতে পারে।

উল্লেখ্য, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণ করতে গত বছরের ২৭ জুলাই একটি বেতন কমিশন গঠন করা হয়। ২১ সদস্যের এই কমিশনের প্রধান করা হয় সাবেক অর্থ সচিব ও পিকেএসএফ চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খানকে।

কমিশনকে ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সেই অনুযায়ী চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি কমিশন তাদের সুপারিশমালা সরকারের কাছে জমা দেয়। প্রতিবেদনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সময়োপযোগী একটি বেতন কাঠামোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

তৎকালীন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ দায়িত্ব ছাড়ার আগে গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, পে কমিশনের প্রতিবেদন বাস্তবসম্মত এবং নির্বাচিত সরকার চাইলে তা বাস্তবায়ন করতে পারে। তবে তিনি তখনই পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা ও মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

বর্তমানে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। তবে সামনে জাতীয় সংসদের অধিবেশন এবং বাজেট আলোচনার সময় এ বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


সম্পর্কিত নিউজ