{{ news.section.title }}
কেনো আট শতাধিক বন্দিকে মুক্তি দিচ্ছে সরকার?
বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত বন্দীর চাপ দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতির মধ্যে মানবিক দিক বিবেচনায় এবং কারাবিধির বিধান অনুযায়ী প্রবীণ, গুরুতর অসুস্থ ও কম গুরুতর অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীদের একটি অংশকে মুক্তি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন শ্রেণির আট শতাধিক বন্দীকে পর্যায়ক্রমে মুক্তি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কারা কর্তৃপক্ষ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আইন মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে কাজ করছে। ইতোমধ্যে সম্ভাব্য মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দীদের বিষয়ে যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করে একটি চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।
কারা পাচ্ছেন মুক্তির সুযোগ
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যেসব বন্দী মানবিক বিবেচনায় মুক্তির জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচিত হয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন-
- বয়স্ক বা প্রবীণ বন্দী
- জটিল বা দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত বন্দী
- অন্তঃসত্ত্বা নারী বন্দী
- শিশুসহ কারাগারে থাকা নারী বন্দী
- অপেক্ষাকৃত কম গুরুতর অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত বন্দী
তবে গুরুতর অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত কিংবা নির্দিষ্ট কিছু আইনের আওতায় সাজাপ্রাপ্ত বন্দীরা এই সুযোগের বাইরে থাকবেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
যেভাবে নেওয়া হচ্ছে সিদ্ধান্ত
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বন্দীদের মুক্তির বিষয়টি একটি নির্দিষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন করা হয়। প্রথমে কারা কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্য মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দীদের একটি প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করে। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেই তালিকা যাচাই করে এবং প্রয়োজনীয় তদন্ত সম্পন্ন করে।
যাচাই-বাছাই শেষে তালিকাটি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। আইন মন্ত্রণালয় থেকে মতামত পাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য তালিকাটি পাঠানো হয়। পরবর্তী ধাপে রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের মাধ্যমে বন্দীদের মুক্তির আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
কারাবিধির যে ধারা অনুযায়ী মুক্তি
সরকারি সূত্র বলছে, বাংলাদেশ কারাবিধির ৫৬৯ ধারা অনুযায়ী প্রতিবছরই নির্দিষ্ট কিছু বন্দীকে বিশেষ বিবেচনায় মুক্তি দেওয়া হয়ে থাকে। এই বিধান অনুযায়ী সাধারণত যেসব বন্দী তাদের সাজার বড় অংশ ইতোমধ্যে ভোগ করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে মুক্তির সুযোগ দেওয়া হয়।
বিশেষ করে যেসব বন্দীর সাজার দুই-তৃতীয়াংশ সময় ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে, যারা শারীরিকভাবে গুরুতর অসুস্থ অথবা চলাফেরা করতে অক্ষম-তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এছাড়া যাদের অপরাধ তুলনামূলকভাবে লঘু বা কম গুরুতর, তাদের ক্ষেত্রেও এই সুযোগ বিবেচনা করা হয়।
কারা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্রক্রিয়া কারাগারের ভেতরে মানবিক পরিস্থিতি বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে গুরুতর অসুস্থ বা প্রবীণ বন্দীদের জন্য এটি একটি মানবিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়।
ঈদ উপলক্ষে বিশেষ মুক্তি
এর পাশাপাশি আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বিশেষ বিবেচনায় কয়েকজন বন্দীকেও মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বুধবার (১১ মার্চ) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কারা-২ শাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
ঈদ উপলক্ষে যেসব সাজাপ্রাপ্ত বন্দীকে মুক্তির জন্য সুপারিশ করা হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন-
- চাঁদপুর কারাগারের আকাশ দাস
- লক্ষ্মীপুর কারাগারের রবিউল হোসেন
- রংপুর কারাগারের জিকরুল হক
- রংপুর কারাগারের মো. নুরুজ্জামান
- কুমিল্লা কারাগারের মো. আব্দুল করিম
কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে তারা শিগগিরই মুক্তি পাবেন।
কারাগারের বর্তমান পরিস্থিতি
বাংলাদেশে বর্তমানে বিভিন্ন জেলা ও কেন্দ্রীয় কারাগারে ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি বন্দী রয়েছে। বিভিন্ন সময় সরকার কারাগারের চাপ কমাতে এবং মানবিক দিক বিবেচনায় বন্দী মুক্তির উদ্যোগ নেয়। বিশেষ করে প্রবীণ ও অসুস্থ বন্দীদের ক্ষেত্রে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের উদ্যোগ কারাগারের ভিড় কমাতে কিছুটা সহায়ক হলেও দীর্ঘমেয়াদে কারা ব্যবস্থার সংস্কার এবং বিকল্প শাস্তির ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।
মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির অংশ
আইন ও মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, প্রবীণ, অসুস্থ বা নারী বন্দীদের ক্ষেত্রে মানবিক বিবেচনায় শাস্তি লাঘব বা মুক্তির ব্যবস্থা অনেক দেশেই প্রচলিত। বাংলাদেশেও কারাবিধির আওতায় সেই সুযোগ রাখা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মুক্তির জন্য নির্বাচিত বন্দীদের বিষয়ে সব ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে তাদের মুক্তি দেওয়া হবে।