নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মায় লরি, ডুবল ২৪ হাজার লিটার তেল

নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মায় লরি, ডুবল ২৪ হাজার লিটার তেল
ছবির ক্যাপশান, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মায় লরি, ডুবল ২৪ হাজার লিটার তেল

মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার পাটুরিয়া ফেরিঘাটে ফেরি থেকে নামার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ২৪ হাজার লিটার তেলবোঝাই একটি লরি পদ্মা নদীতে ডুবে যাওয়ার ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার রাতের এই দুর্ঘটনার পর চালক ও সহকারীকে জীবিত উদ্ধার করা গেলেও দীর্ঘ সময় ধরেও লরিটি নদী থেকে তোলা সম্ভব হয়নি।

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যেখানে লরিটি ডুবে গেছে সেখানে পানির গভীরতা বেশি হওয়ায় উদ্ধারকাজ জটিল হয়ে পড়েছে।

দুর্ঘটনাটি ঘটে বুধবার, ১১ মার্চ রাত সাড়ে ৮টার দিকে পাটুরিয়া ৫ নম্বর ফেরিঘাটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঝিনাইদহ-ঢ ৪১-০০৪২ নম্বরের ১০ চাকার লরিটি যশোর থেকে ২৪ হাজার লিটার তেল নিয়ে নারায়ণগঞ্জের দিকে যাচ্ছিল। দৌলতদিয়া ঘাট থেকে ফেরিতে পদ্মা পার হয়ে পাটুরিয়া ঘাটে নামার পর ফেরির পন্টুন অতিক্রম করে সড়কে ওঠার মুহূর্তে ঢালু অংশে লরিটির ব্রেক হঠাৎ বিকল হয়ে যায়। একপর্যায়ে গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পেছনের দিকে গড়িয়ে সরাসরি নদীতে পড়ে যায়।

দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নদীতে লরি পড়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের লোকজন দ্রুত ঘাট এলাকায় জড়ো হন। পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে লরির চালক শরীফ এবং তাঁর সহকারীকে জীবিত উদ্ধার করেন। দুজনকেই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। তাৎক্ষণিক উদ্ধার তৎপরতার কারণে বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।

বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্তও লরিটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। বিআইডব্লিউটিসির আরিচা কার্যালয়ের বাণিজ্য শাখার সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. সালাম হোসেন জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। একই সঙ্গে বিআইডব্লিউটিএ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরাও যৌথভাবে উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত লরিটি তোলা সম্ভব হবে।

উদ্ধার কার্যক্রম কেন বিলম্বিত হচ্ছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা বলছেন, পদ্মার যে অংশে লরিটি নিমজ্জিত হয়েছে সেখানে পানির গভীরতা অনেক বেশি। ফলে ডুবুরিদের আগে লরিটির অবস্থান শনাক্ত করে সেটিকে ক্রেন বা রেকারের সঙ্গে সুরক্ষিতভাবে সংযুক্ত করতে হচ্ছে। উদ্ধার জাহাজ ‘হামজা’র ক্রেনের সঙ্গে লরিটি বেঁধে সিস্টেম অনুযায়ী উপরে তোলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ হওয়ায় অভিযান দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

ঘটনার পর শিবালয় উপজেলা প্রশাসনও সক্রিয় হয়। খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিষা রানী কর্মকার ঘটনাস্থলে যান এবং সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ডুবে যাওয়া লরিটির চালক ও সহকারীকে জীবিত উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সমন্বিতভাবে লরি উদ্ধারে কাজ করছে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নদীর পানি ও ঘাটের ঢাল-দুটিই এই দুর্ঘটনাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, লরিটি ছিল বিপুল পরিমাণ তেলবোঝাই। ২৪ হাজার লিটার তেল নদীতে ডুবে যাওয়ায় পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়টিও সামনে এসেছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বড় ধরনের দূষণের কথা তখনো জানায়নি, তবে উদ্ধারকাজ বিলম্বিত হলে জ্বালানি পদার্থ নদীর পানিতে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। এ কারণে শুধু যানবাহন উদ্ধারের দিক থেকে নয়, নদী ও আশপাশের পরিবেশ সুরক্ষার প্রশ্নেও ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উপলব্ধ প্রতিবেদনগুলোতে মূল জোর ছিল উদ্ধার কার্যক্রমের ওপর, তবে তেলবোঝাই লরি নিমজ্জিত হওয়ার কারণে পরিবেশগত উদ্বেগও স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসেছে।

পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। প্রতিদিন এই রুট দিয়ে পণ্যবাহী ও যাত্রীবাহী বহু যানবাহন চলাচল করে। এমন একটি ব্যস্ত ফেরিঘাটে ব্রেক ফেল করে তেলবোঝাই লরি নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। ফেরি থেকে নামার সময় ভারী যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, ঢালু পন্টুনে নিরাপত্তা, যান্ত্রিক ত্রুটি পরীক্ষা এবং জরুরি উদ্ধারসামগ্রীর প্রস্তুতি-সব বিষয়ই এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে ঘাট এলাকায় যানবাহনের প্রযুক্তিগত পরীক্ষা এবং নিরাপত্তা তদারকি আরও জোরদার করা জরুরি।

সব মিলিয়ে, মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ফেরিঘাটে ২৪ হাজার লিটার তেলবোঝাই লরি পদ্মায় ডুবে যাওয়ার এই ঘটনা শুধু একটি সড়ক বা নৌ দুর্ঘটনা নয়; এটি নিরাপত্তা, উদ্ধার সক্ষমতা এবং পরিবেশগত ঝুঁকির প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে। চালক ও সহকারী জীবিত উদ্ধার হওয়ায় স্বস্তি মিললেও লরিটি দ্রুত উদ্ধার করে তেলের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি ও নদী দূষণের ঝুঁকি কমানো এখন কর্তৃপক্ষের প্রধান চ্যালেঞ্জ।


সম্পর্কিত নিউজ