{{ news.section.title }}
ঈদের আগে দেশে সোনার দামে বড় পতন, ভরি কত?
পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগমুহূর্তে দেশের স্বর্ণবাজারে বড় ধরনের মূল্যহ্রাসের ঘোষণা এসেছে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস) বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে কার্যকর নতুন দর ঘোষণা করে জানিয়েছে, সবচেয়ে ভালো মানের ২২ ক্যারেট সোনার দাম ভরিতে ৭ হাজার ৬৪০ টাকা কমানো হয়েছে।
নতুন দর অনুযায়ী, ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম এখন ২ লাখ ৫৪ হাজার ৬২৫ টাকা। এর ফলে প্রায় এক মাস পর আবারও ভালো মানের সোনার দাম আড়াই লাখ টাকার ঘরে নেমে এলো। বাজুস বলছে, স্থানীয় বুলিয়ন বাজারে তেজাবি সোনা বা পাকা সোনার দাম কমায় এই সমন্বয় করা হয়েছে।
বাজুসের মূল্যনির্ধারণ ও মূল্য মনিটরিং সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয়। পরে কমিটির চেয়ারম্যান ডা. দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে নতুন মূল্যতালিকা প্রকাশ করা হয়। সংগঠনটির ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের বাজারে কাঁচা সোনার দর হ্রাস পাওয়ায় খুচরা বিক্রয়মূল্যও সমন্বয় করা হয়েছে। সেই অনুযায়ী ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার ২০ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৮ হাজার ৩২০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির সোনার দাম প্রতি ভরিতে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৬৫৩ টাকা।
সোনার পাশাপাশি রুপার দামও কমানো হয়েছে। নতুন তালিকায় ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপার দাম রাখা হয়েছে ৫ হাজার ৭১৫ টাকা। ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ৫ হাজার ৪৮২ টাকা, ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি ৪ হাজার ৬৬৬ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি রুপার দাম ৩ হাজার ৪৯৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। খুচরা বাজারে অলংকার কিনতে গেলে এই মূল দামের সঙ্গে ৫ শতাংশ ভ্যাট যোগ হবে বলেও বাজুস জানিয়েছে।
নতুন দর কার্যকর হওয়ার আগে ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম ছিল ২ লাখ ৬২ হাজার ২৬৫ টাকা। সে হিসাবে আজকের সমন্বয়ে প্রতি ভরিতে ৭ হাজার ৬৪০ টাকা কমেছে। একইভাবে ২১ ক্যারেটে ৭ হাজার ৩৪৯ টাকা, ১৮ ক্যারেটে ৬ হাজার ২৯৯ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির সোনায় ৫ হাজার ১৩২ টাকা কমেছে। রুপার ক্ষেত্রেও কমেছে ভরিতে ৩৫০ টাকা। ফলে ঈদের আগে গয়না কেনার পরিকল্পনা করা ক্রেতাদের জন্য বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
চলতি বছরের শুরু থেকেই দেশের বাজারে সোনার দামে বড় ধরনের ওঠানামা লক্ষ্য করা গেছে। বছরের শুরুতে ২২ ক্যারেট সোনার প্রতি ভরির দাম ছিল প্রায় ২ লাখ ২২ হাজার টাকার ঘরে। পরে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ সম্পদে ঝোঁক বাড়ার কারণে জানুয়ারির শেষ দিকে দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। ২৯ জানুয়ারি ২২ ক্যারেট সোনার দাম দেশের বাজারে ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকায় উঠে যায়, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ স্তর হিসেবে আলোচিত। এরপর মূল্য কিছুটা কমলেও বাজারে অস্থিরতা পুরোপুরি কাটেনি।
আন্তর্জাতিক বাজারেও গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সোনার দর ছিল অস্বাভাবিক চাপের মুখে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পর প্রথম দিকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার চাহিদা বাড়ার কথা থাকলেও পরবর্তী সময় বাজারে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। রয়টার্সের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শক্তিশালী মার্কিন ডলার এবং ফেডারেল রিজার্ভের কড়াকড়ি অবস্থানের কারণে বৃহস্পতিবার স্পট গোল্ডের দাম নেমে ৪ হাজার ৭৬৪ দশমিক ২৭ ডলার প্রতি আউন্সে দাঁড়ায়, যা এক মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। আগের দিনও স্পট গোল্ড ৪ হাজার ৮৬০ ডলারের কাছাকাছি ছিল। বিশ্লেষকেরা বলছেন, তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে এবং সে কারণে যুক্তরাষ্ট্রে সুদহার কমার সম্ভাবনা দুর্বল হয়েছে। ফলে সোনার প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ সাময়িকভাবে কমেছে।
সাধারণভাবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময় সোনার দাম বাড়ে, কারণ এটি নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু এবার যুদ্ধের মধ্যেও বাজারে সোনার দাম একইভাবে ঊর্ধ্বমুখী থাকেনি। এর বড় কারণ হিসেবে সামনে আসছে মার্কিন ডলারের শক্তিশালী অবস্থান এবং সুদহার দীর্ঘ সময় উচ্চপর্যায়ে থাকতে পারে-এই আশঙ্কা। ডলারে বিনিয়োগ বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠলে সোনার চাহিদা কমে যায়, কারণ সোনায় সুদ পাওয়া যায় না। রয়টার্সের বিশ্লেষণও বলছে, জ্বালানি খরচ ও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ায় বিনিয়োগকারীরা এখন সুদহারের দিকেই বেশি নজর দিচ্ছেন।
অর্থনীতিবিদ জেমস মিডওয়ে বলেন, বিনিয়োগকারীরা কিছুদিন ধরেই প্রত্যাশা করছেন, সুদের হার কমবে। আরেকটি কারণ হলো, বছরের শুরু থেকেই সোনার দাম বেশ চড়া ছিল। মিডওয়ে আরও বলেন, সোনার দাম আগেই এতটা বেড়েছে যে এখন যুদ্ধের প্রভাব সেভাবে পড়ছে না।
সব মিলিয়ে ঈদের আগে দেশের বাজারে সোনার এই দরপতন ক্রেতাদের জন্য ইতিবাচক বার্তা দিলেও আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ফলে সামনে আবারও মূল্য সমন্বয়ের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে আপাতত যারা সোনা বা রুপা কেনার পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য এটি সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে তুলনামূলক স্বস্তির একটি মুহূর্ত।