{{ news.section.title }}
ঠাকুরগাঁওয়ে পাম্প ফাঁকা, পেট্রোল ৩৫০ টাকা
ঠাকুরগাঁও জেলায় জ্বালানি তেলের সংকট এখন শুধু একটি সাধারণ সমস্যা নয়-এটি ধীরে ধীরে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটে রূপ নিচ্ছে। প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে চলমান এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে কৃষক, পরিবহন চালক এবং দৈনন্দিন কাজে মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীরা।
সংকটের চিত্র: পাম্পে নেই তেল, রাস্তায় লম্বা লাইন
জেলার বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে এখন প্রতিদিনই একই দৃশ্য-দীর্ঘ লাইন, হতাশ গ্রাহক এবং ‘তেল নেই’ লেখা সাইনবোর্ড। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেকেই ফিরে যাচ্ছেন খালি হাতে। কোথাও সামান্য তেল এলেও তা মুহূর্তেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি দিন দিন বেড়েই চলেছে।
এই পরিস্থিতিতে অনেক জায়গায় উত্তেজনাও তৈরি হচ্ছে। কোথাও কোথাও গ্রাহকদের সঙ্গে পাম্প কর্তৃপক্ষের বাকবিতণ্ডা এমনকি সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে, যা পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করে তুলছে।
অন্যদিকে কালোবাজারে তেলের ব্যবসা
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো-যেখানে ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল পাওয়া যাচ্ছে না, সেখানে একই সময়ে বিভিন্ন হাট-বাজারে খোলাখুলিভাবে বোতলে ভরে অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রি হচ্ছে।
সরকার নির্ধারিত দামে যেখানে পেট্রোলের দাম ১১৬ টাকা এবং অকটেন ১২০ টাকা হওয়ার কথা, সেখানে বিভিন্ন বাজারে তা ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
এই বৈপরীত্য সাধারণ মানুষের মনে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে-পাম্পে তেল না থাকলে বাজারে এতো তেল আসছে কোথা থেকে?
সিন্ডিকেটের আশঙ্কা: পরিকল্পিত সংকট?
স্থানীয়দের অনেকেই মনে করছেন, এটি কোনো স্বাভাবিক সংকট নয়। বরং একটি সংগঠিত চক্র বা সিন্ডিকেট ইচ্ছাকৃতভাবে সরবরাহ কমিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে।
একজন মোটরসাইকেল চালক জানান, পাম্পে তেল নেই বলা হলেও কিছু দূরেই একই তেল বেশি দামে বিক্রি হতে দেখা যায়। তার মতে, “এটা স্পষ্টভাবে পরিকল্পিত একটি খেলা, যেখানে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে লাভবান হচ্ছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী।”
কৃষকদের দুশ্চিন্তা: ফসল বাঁচানোই এখন চ্যালেঞ্জ
বর্তমানে সেচ মৌসুম চলায় কৃষকদের জন্য ডিজেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই সংকটের কারণে অনেকেই সময়মতো জমিতে পানি দিতে পারছেন না।
একজন কৃষক বলেন, “ফসল রক্ষা করতে হলে আমাদের যেভাবেই হোক সেচ দিতে হবে। কিন্তু পাম্পে তেল নেই, আর বাজারে যেটুকু পাওয়া যাচ্ছে তার দাম এত বেশি যে সেটা কিনতে গিয়ে আমাদের বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।”
এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে কৃষি উৎপাদনেও বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংঘর্ষ, অভিযান ও অনিয়মের অভিযোগ
সম্প্রতি একটি ফিলিং স্টেশনে তেল সংগ্রহকে কেন্দ্র করে গ্রাহকদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক থেকে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে অজ্ঞাতপরিচয় একটি দল এসে স্টেশনে ভাঙচুর চালায়, এতে কয়েকজন কর্মচারী আহত হন।
অন্যদিকে প্রশাসনও বসে নেই। একটি স্টেশনে তেল কম দেওয়ার অভিযোগে জরিমানা করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে-কিছু পাম্পে তেল মজুত থাকা সত্ত্বেও তা সরবরাহে গড়িমসি করা হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সাংবাদিকদের বাধা: প্রশ্ন আরও ঘনীভূত
একটি ঘটনায় দেখা গেছে, তেল সংকট নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে সাংবাদিকদের বাধা দেওয়া হয়, এমনকি তাদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টাও করা হয়।
এ ধরনের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও সন্দেহজনক করে তুলছে এবং অনিয়মের বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রশাসনের অবস্থান: কঠোর পদক্ষেপের আশ্বাস
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যেখানে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। অবৈধ মজুত, অতিরিক্ত দামে বিক্রি কিংবা গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা-কোনোটিই সহ্য করা হবে না।
একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা জানান, “আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে সাধারণ মানুষ ন্যায্য দামে তেল পেতে পারে।”