জ্বালানির মূল্য বাড়লে ৬১ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়ের শঙ্কা

জ্বালানির মূল্য বাড়লে ৬১ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়ের শঙ্কা
ছবির ক্যাপশান, জ্বালানির মূল্য বাড়লে ৬১ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়ের শঙ্কা

বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়লে বাংলাদেশের ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকেরা। ঢাকায় শনিবার প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দীর্ঘ সময় ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারের ওপরে থাকলে বাংলাদেশের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। ডলারপ্রতি ১২২ টাকা ধরলে এই অঙ্ক সর্বোচ্চ প্রায় ৬১ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়ায়।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের মাসিক ব্যয় প্রায় ৮০ মিলিয়ন ডলার বেড়ে যায়, যা বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। গবেষণাটি তুলে ধরা হয় বিসিক শিল্পনগরীতে থাকা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জ্বালানি ব্যবহার, কার্বন নিঃসরণ এবং ডিকার্বনাইজেশন সম্ভাবনা নিয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জ্বালানি কাঠামোর দুর্বলতাও সামনে এসেছে। গবেষকদের ভাষ্য, দেশে মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানিনির্ভর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের অস্থিরতা সরাসরি আমদানি ব্যয়, উৎপাদন খরচ এবং ভর্তুকির ওপর চাপ বাড়ায়। এই চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে শিল্পখাতে ধীরগতি, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে শিল্প সংকোচনের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত। গবেষণায় বলা হয়েছে, এই খাত দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত এবং শিল্প ইউনিটের ৯০ শতাংশের বেশি এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। ফলে জ্বালানির ব্যয় বাড়লে এর অভিঘাত শুধু ছোট কারখানায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বড় শিল্পের সরবরাহ শৃঙ্খলেও চাপ পড়বে। ২০২৫ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এসএমই খাতের জিডিপিতে অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ এবং কর্মসংস্থানে অবদান ৮৫ শতাংশ।

গবেষণাটি সংকটের পাশাপাশি একটি বিকল্প পথও দেখিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসএমই খাতে বিকেন্দ্রীভূত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়ানো গেলে পরিচালন ব্যয় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে পরিবেশগত মান রক্ষা এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতা শক্তিশালী করার সুযোগও তৈরি হবে। বিসিক শিল্পাঞ্চলের খালি জমির মাত্র ১০ শতাংশ ব্যবহার করেই প্রায় ৫৭ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

কার্বন নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রেও এই রূপান্তরকে গুরুত্বপূর্ণ বলা হয়েছে। গবেষণা অনুযায়ী, পরিকল্পিত পদক্ষেপ নিলে এসএমই শিল্পে বছরে ১ কোটি ৪০ লাখ টনের বেশি কার্বন নিঃসরণ কমানো যেতে পারে। এর সঙ্গে জাতীয় জলবায়ু লক্ষ্যেরও মিল রয়েছে। বাংলাদেশের এনডিসি ৩.০ অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে জ্বালানি খাত থেকে ৬৯.৮৪ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, আর ২০৩৫ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আনার লক্ষ্য রয়েছে।

এদিকে জ্বালানি বাজারে বৈশ্বিক চাপ বাড়লেও দেশে এখনো দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়নি বলে সরকার গত কয়েক দিনে একাধিকবার জানিয়েছে। তবু গবেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্য দীর্ঘায়িত হলে শুধু ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে। সে কারণে শিল্পখাতে দ্রুত জ্বালানি রূপান্তর, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক বিকল্প ব্যবস্থায় বিনিয়োগ, এখন নীতিগত অগ্রাধিকার হওয়া দরকার।


সম্পর্কিত নিউজ