{{ news.section.title }}
রেললাইনে ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল - আইনের দুর্বল প্রয়োগে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল
দেশের বিভিন্ন এলাকায় রেললাইনের ওপর অবাধ চলাচল, বসে থাকা বা বাজার বসানোর মতো ঝুঁকিপূর্ণ চিত্র প্রায়ই দেখা যায়। অনেকেই অসচেতনভাবে রেললাইন পার হন, কেউবা ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ করেন। যদিও রেলওয়ে আইন অনুযায়ী এসব কর্মকাণ্ড স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ, বাস্তবে এর প্রয়োগ খুবই সীমিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ঘটনার পেছনে যেমন সাধারণ মানুষের অসচেতনতা দায়ী, তেমনি দায় এড়াতে পারে না পুরোনো আইনের দুর্বল প্রয়োগও। অনেক ক্ষেত্রেই নিয়ম থাকলেও তার বাস্তবায়ন চোখে পড়ে না। ফলে রেলপথের আশপাশে গড়ে উঠেছে এক ধরনের ‘অঘোষিত বিশৃঙ্খলা’।
বর্তমান আইন অনুযায়ী, রেললাইনের দুই পাশের নির্দিষ্ট এলাকায় অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করাও নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে এই বিধিনিষেধ অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত। সাধারণ মানুষের অনেকেই জানেন না যে রেললাইনের নির্দিষ্ট এলাকায় হাঁটাচলা করাও আইনত অপরাধ। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে সরকারের আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
রেলওয়ে পুলিশের তথ্য বলছে, ২০২১ থেকে ২০২৫- এই পাঁচ বছরে ট্রেনে কাটা পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৫ হাজার ৯৮ জন। এর মধ্যে শুধুমাত্র রেললাইনের ওপর বসা বা অবাধ চলাচলের কারণে মারা গেছেন প্রায় আড়াই হাজার মানুষ। এই পরিসংখ্যান পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করে।
এদিকে, রেললাইনে বসে সময় কাটানো বা গান শোনা অনেকের কাছে স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এই অসচেতন আচরণই কখনো কখনো প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। গত পাঁচ বছরে কানে ইয়ারফোন ব্যবহার করার সময় ট্রেনের শব্দ না শোনায় ১৬৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বর্তমানে চালু থাকা রেলওয়ে আইনটি ১৮৯০ সালের, যেখানে রেলসীমানায় অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করলে মাত্র ২০ থেকে ৫০ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। সময়ের সাথে এই জরিমানার পরিমাণ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাই নতুন আইনের খসড়ায় জরিমানা বাড়িয়ে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

রেলগেট বা লেভেল ক্রসিং এলাকাগুলোও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অনেকেই গেট নামার পরও ঝুঁকি নিয়ে দ্রুত পার হওয়ার চেষ্টা করেন। এতে ঘটে মারাত্মক দুর্ঘটনা। গত পাঁচ বছরে এভাবে পারাপারের সময় প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৬৮১ জন।
অন্যদিকে, ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ আইনত দণ্ডনীয় হলেও বাস্তবে তা পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। বরং অনেকের কাছে এটি সাহসিকতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ গত পাঁচ বছরে ছাদ থেকে পড়ে মারা গেছেন অন্তত ৬৯ জন। নতুন আইনের খসড়ায় এ ধরনের অপরাধে ৫০০ টাকা জরিমানা বা এক মাসের কারাদণ্ডের প্রস্তাব রয়েছে।
দেশের রেল অবকাঠামোর দুর্বলতাও এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। কোথাও মহাসড়কের সঙ্গে রেললাইন যুক্ত হলেও নেই কোনো বৈধ ক্রসিং, আবার কোথাও ক্রসিং থাকলেও গেটম্যান নেই। রেল পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, দেশে মোট ১ হাজার ৯৩৪টি রেলক্রসিংয়ের মধ্যে ৭২৫টিই অবৈধ।
নতুন আইনের খসড়ায় অনুমতি ছাড়া রেলগেট বা পারাপারের পথ তৈরি করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং ৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠছে- বিদ্যমান আইনই যেখানে সঠিকভাবে প্রয়োগ হয়নি, সেখানে নতুন আইন কতটা কার্যকর হবে?
রেলওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. তোফায়েল আহমেদ মিয়া জানিয়েছেন, জনবল সংকটের কারণে সব জায়গায় নজরদারি সম্ভব হয় না। অনেক স্থানে ট্রেন চলাচলের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, রেল কর্তৃপক্ষ জানায়, রেললাইনে সবসময় ১৪৪ ধারা জারি থাকলেও তা বাস্তবে মানানো যায় না। বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম বলেন, অনেক মানুষ এই নিয়ম সম্পর্কে জানেন না, আবার যারা জানেন তারাও তা মানেন না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল আইন প্রণয়ন নয়, তার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহবুব আলম তালুকদার মনে করেন, আইনের যথাযথ বাস্তবায়নে প্রয়োজন শক্ত অবস্থান এবং আন্তরিকতা।
বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা এই বিশৃঙ্খলা বন্ধে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ- সবকিছুর সমন্বয়েই কেবল কমানো সম্ভব এই মৃত্যুর মিছিল। না হলে অবহেলা আর অসচেতনতায় রেললাইনে ঝরে পড়বে আরও অনেক প্রাণ।