মোবাইল নয়, বইকেই পছন্দ করাতে কী করবেন? শিশুদের জন্য কার্যকরী টিপস

- Author,
- Role, জাগরণ নিউজ বাংলা
এক সময় বিকেল মানেই খেলার মাঠ আর ছুটির দিন মানেই বইয়ের রাজ্যে ডুবে থাকা। কিন্তু সময় বদলেছে, বদলে গেছে শৈশবের সঙ্গী। আজকাল শিশুরা বইয়ের গন্ধ নয়, ভালোবাসে স্ক্রিনের ঝলকানি। মোবাইল ফোন, ট্যাবলেট আর ইউটিউব-কেন্দ্রিক বিনোদনের সহজলভ্যতার ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস ধ্বংসের মুখে।
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, ৮ থেকে ১৪ বছর বয়সের শিশুদের মধ্যে দিনে গড়ে ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় মোবাইল স্ক্রিনে কাটে। অপরদিকে, বই পড়ায় মনোযোগ দিচ্ছে মাত্র ১৫ শতাংশ শিশু, তাও স্কুলের বাধ্যবাধকতার কারণে। এই প্রবণতা শুধু শিক্ষাগত দিক থেকে নয়, মনস্তাত্ত্বিক ও স্নায়ুবৈজ্ঞানিক দিক থেকেও উদ্বেগজনক।
মস্তিষ্কে প্রভাব - বিজ্ঞান বলছে, নিয়মিত স্ক্রিন এক্সপোজারে শিশুর মস্তিষ্কে 'ডোপামিন সার্কিট' অতিরিক্তভাবে সক্রিয় হয়। এর ফলে ধৈর্য কমে যায়, মনঃসংযোগের ক্ষমতা কমে এবং দীর্ঘসময় মনোযোগ ধরে রাখার দক্ষতা হ্রাস পায়। বই পড়া যেখানে ধীরে ধীরে উপলব্ধি ও কল্পনাশক্তিকে শাণিত করে, সেখানে স্ক্রিন-নির্ভর বিনোদন তা ক্ষয়ে দেয়।
ভাষা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে বাধা- বই পাঠ শিশুদের শব্দভাণ্ডার বাড়ায়, চিন্তাশক্তি উন্নত করে ও বিশ্লেষণধর্মী মন গঠনে সহায়ক হয়। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, মোবাইলমুখী শিশুরা তুলনামূলকভাবে কম শব্দ জানে এবং বেশি সময় মৌখিক বা লেখ্যভাবে নিজেকে প্রকাশে অক্ষম বোধ করে।
মনোভাব ও আচরণেও পরিবর্তন - বই পড়া এক ধরনের ধৈর্যের চর্চা। অন্যদিকে, রঙচঙে ভিডিও ও অ্যানিমেশন দ্রুত উত্তেজনা তৈরি করে, যা শিশুদের মধ্যে সহিষ্ণুতা কমিয়ে দেয়। সহজেই বিরক্ত হওয়া, আক্রমণাত্মক আচরণ ও মানসিক অস্থিরতা
আজকাল অনেক শিশুদের মধ্যে লক্ষ করা যাচ্ছে - যার শিকড় মোবাইল আসক্তিতেই।
সমাধান কোথায়?
সমাধান শুধু নিষেধাজ্ঞায় নয়, বরং অভ্যাস বদলের মাধ্যমে। অভিভাবকদের উচিৎ ছোটবেলা থেকেই ঘরে বইয়ের পরিবেশ তৈরি করা, ঘুমের আগে বই পড়ার সময় নির্ধারণ করা এবং সন্তানদের সঙ্গে একসাথে বই নিয়ে আলোচনা করা। শিশুদের সামনে বই পড়ার ইতিবাচক উদাহরণ গড়তে হবে।
১. পরিবারকেই হতে হবে 'রোল মডেল'
শিশুরা যা দেখে, তাই শেখে। তাই শিশুকে বই পড়াতে চাইলে, প্রথমে মা-বাবা বা পরিবারের সদস্যদের বই পড়ার অভ্যাস গড়তে হবে। শুধু বই কিনে দিয়ে দায়িত্ব শেষ নয় - তার সামনে বসে বই পড়া, বইয়ের গল্প ভাগাভাগি করা ও বই নিয়ে আলোচনা করতে হবে।
টিপস: প্রতি রাতে ২০ মিনিট 'পড়ার সময়' নির্ধারণ করুন - সবাই একসাথে বই হাতে বসুন।
২. মোবাইলের ব্যবহার সীমিত ও পরিকল্পিত করা
মোবাইল সম্পূর্ণ বন্ধ করে রাখা সম্ভব নয়, কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ব্যবহার করালে শিশুর অভ্যাস ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে শুরু করবে। স্ক্রিন টাইম-এর নির্দিষ্ট নিয়ম থাকা উচিত - যেমন দিনে সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টা (শিক্ষাবিষয়ক সহ)।
টিপস: শিশুদের জন্য "screen-free zones" (যেমন: খাওয়ার টেবিল, শোবার ঘর) নির্ধারণ করুন।
৩. ঘরে 'রিডিং কর্নার' তৈরি করুন
শিশুদের উৎসাহিত করতে ঘরে ছোট একটি 'রিডিং কর্নার' বা 'বইয়ের কোণা' তৈরি করতে পারেন। সেখানে বয়স অনুযায়ী গল্পের বই, রঙিন বই, পাজল বা ছবির বই রাখা যেতে পারে।
টিপস: বইয়ের তাকের উচ্চতা শিশুর নাগালের মধ্যে রাখুন এবং সময়-সময় নতুন বই যোগ করুন।
৪. গল্প বলার পুরনো অভ্যাস ফিরিয়ে আনুন
একটি কার্যকর পদ্ধতি হলো - 'Storytelling'। ঘুমের আগে গল্প বলার অভ্যাস আবার চালু করলে শিশুর কল্পনাশক্তি এবং শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ হবে। ধীরে ধীরে সে নিজেই বইয়ের গল্প খুঁজে নিতে আগ্রহী হবে।
টিপস: শিশুর বয়স অনুযায়ী লোককথা, জীবজন্তুর গল্প বা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি বেছে নিন।
৫. স্কুলে পাঠাভ্যাস উন্নয়নমূলক কার্যক্রম চালু করা জরুরি
শুধু পরিবার নয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও বইয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে হবে। লাইব্রেরি ঘন্টা, 'Book Review' প্রতিযোগিতা, 'Reading Day' পালন করা যেতে পারে।
টিপস: প্রতিমাসে একদিন 'Silent Reading Hour' ও 'Book Exchange' প্রোগ্রাম চালু করা যেতে পারে।
৬. অনলাইন রিডিং অ্যাপের ব্যবহার সঠিকভাবে শেখানো
অনেক সময় শিশুরা মোবাইলে শুধু গেম খেলে না, তা দিয়ে বইও পড়া সম্ভব। বর্তমানে অনেক শিশু-কেন্দ্রিক রিডিং অ্যাপ বা ডিজিটাল লাইব্রেরি রয়েছে, যেগুলো ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে প্রযুক্তি-নির্ভরতাই হয়ে উঠবে বইয়ের সাথী।
টিপস: "Storyweaver", "Epic!", "Oxford Owl" ইত্যাদি অ্যাপ শিশুদের বই পড়ার উৎসাহ জাগাতে সাহায্য করে।
৭. পুরস্কার বা স্বীকৃতির মাধ্যমে বই পড়ার আগ্রহ তৈরি করুন
বই পড়ে কাউকে পুরস্কৃত করলে বা অন্যের সামনে তার কাজের স্বীকৃতি দিলে, সে আরো আগ্রহ পায়। শিশুরাও ব্যতিক্রম নয়। "বই পড়া শেষে গল্প বললে এক্সট্রা স্টিকার", বা "৫টি বই পড়ে ফেলার পর বিশেষ পুরস্কার"- এমন সহজ উপায়ে পাঠের প্রতি আকর্ষণ বাড়ানো সম্ভব।
টিপস: "Reading Chart" তৈরি করে সেখানে অগ্রগতি মার্ক করে রাখুন।
৮. প্রযুক্তিকে শত্রু নয়, সহযোগী বানান
প্রযুক্তিকে একেবারে বাদ দেওয়া যায় না। বরং বই সম্পর্কিত অ্যানিমেটেড ভিডিও, অডিওবুক, বা ইন্টারঅ্যাকটিভ গল্প বলার প্ল্যাটফর্ম (যেমনঃ YouTube Kids-এর নির্দিষ্ট চ্যানেল) ব্যবহার করলে শিশুরা ধীরে ধীরে বইয়ের ধারায় ফিরবে।
একটা প্রজন্ম যদি বই বিমুখ হয়, সেটি শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং জাতীয় মেধার ভাণ্ডারেই বিপর্যয়। প্রযুক্তিকে সরিয়ে রাখা সম্ভব নয়, তবে বইয়ের প্রতি ভালোবাসা ফিরিয়ে আনা অবশ্যই সম্ভব। এখন সময় সচেতনতার, সময় বইয়ের কাছে ফেরার। "বইয়ের পাতা না ওলটালে, চিন্তার জানালা খুলবে না" - এ কথাটি নতুন করে ভাবার সময় এখনই।
আপনার প্রতিক্রিয়া জানান
মন্তব্যসমূহ
এই সংবাদের জন্য এখনো কোনো মন্তব্য নেই।